×
×
Friday, 24 July, 2026, 10:28 pm


জামায়াতের ৬ এমপিকে ঘিরে বিতর্ক: সরকারের ৫ মাসে নানা অযাচিত ঘটনা

প্রতিষ্ঠিত ৬৮ আসনের বিরোধী দলটির পাঁচ সদস্যের কর্মকাণ্ডে বিব্রত জামায়াত নেতৃত্ব,

গত ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি এককভাবে ৬৮টি আসন জিতে এবং তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মিলে মোট ৭৭টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে প্রবেশ করে। তবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় দলীয় অন্তত ছয় সংসদ সদস্যের (এমপি) বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

বেফাঁস মন্তব্য থেকে ভাইরাল ভিডিও: নানা ঘটনায় জর্জরিত পাঁচ মাস

সংসদের ভেতরে-বাইরে দলীয় এমপিদের বিতর্কিত মন্তব্য, ব্যক্তিগত সহকারীদের (পিএস) অনিয়ম এবং সর্বশেষ এক এমপির ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ভাইরালের ঘটনায় দলটির জনইমেজে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

এসব ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াত জোটের সংসদীয় সমন্বয়কারী ও দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, “ছয়টি নয়, এরকম দুই-তিনটি ঘটনা আছে। তবে কেউ অন্যায় করলে আমরা ছাড় দেব না। কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রশ্রয় দেব না।”

‘নাস্তিক’ বিতর্ক: আমির হামজার মামলার জটিলতা

গত ২৭ মার্চ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় মসজিদে জুমার খুতবার আগে এক আলোচনায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ বলে মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

এ ঘটনায় সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির কর্নেল এবং সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ভিপি শামীম খান পৃথক মানহানির মামলা দায়ের করেন। নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির না হওয়ায় ২১ এপ্রিল আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পরে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়ে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে ১৪ জুন স্থায়ী জামিন পান তিনি।

এ বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “বক্তব্য কারও পক্ষে কিংবা কারও বিপক্ষে যেতে পারে, এটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখি আমরা। গত ১৭ বছর আমাদের কথা বলা স্বাধীনতা ছিল না। এখন আমরা কথা বলার সুযোগ পেয়েছি।”

বাজেট বক্তব্যে জটিলতা: আমির হামজার ‘ছয় হাজার কোটি’ কাণ্ড

বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিন ৭ জুন সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আমির হামজা বলেন, বাজেট ২০০ কোটি টাকা হওয়া উচিত। আবারও তিনি বলেন, বাজেট ছয় হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত। অথচ এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। পরে তিনি জানান, তিনি ছয় লাখ কোটি টাকা বলতে চেয়েছিলেন, মুখ ফসকে ছয় হাজার কোটি বলে ফেলেছেন। এই বক্তব্যেও অস্বস্তিতে পড়ে জামায়াত নেতৃত্ব।

পর্দা-ওয়াশিং মেশিন দাবি: মিজানুর রহমানের অস্বস্তিকর বক্তৃতা

গত ১৭ জুন সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তৃতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য মু. মিজানুর রহমান এমপিদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা চেয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। তিনি বলেন, “আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে জানালা-দরজার পর্দাগুলো এখনও ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম, এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়া হবে।”

এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ টিপ্পনী কাটেন, “আমি জামায়াত এমপিকে ওভেন দিতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে ওয়াশিং মেশিন দেওয়া হলে সংসার সাজিয়ে দেওয়া হবে।”

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক: আব্দুল মুনতাকিমের ভুল বক্তব্য

গত ১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াত ইসলামীর এমপি আব্দুল মুনতাকিম বাজেট আলোচনায় দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা-চাচা) সাত ভাই; চারজনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন; ১১ জনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা।”

পরে জানা যায়, এমপি মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে এবং তাঁর বাবা জীবিত। এই বক্তব্যের কারণে সংসদের ভেতরে-বাইরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। এমপি পরে ভুল স্বীকার করে বক্তব্য সংশোধনের জন্য স্পিকারকে চিঠি দেন।

মেয়ের নাম অনুদান তালিকায়: আতাউর রহমানের পিএস বরখাস্ত

নড়াইল-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের (বাচ্চু) ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অনুদান প্রদানের অনুমোদিত তালিকার দুই জায়গায় তার এক মেয়ের নাম পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সচিবালয়ের একটি চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই সমালোচনা শুরু হয়। চিঠিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্যের ঐচ্ছিক তহবিলের ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দের তালিকায় সংসদ সদস্যের নিজ মেয়ের নাম থাকায় দেশজুড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

এমপিকে গুলির হুমকি: শাহজাহান চৌধুরীকে নিয়ে অডিও ফাঁস

গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে লক্ষ্য করে ‘পায়ে গুলি করার’ পরিকল্পনার অডিও ফাঁস হয়। এতে তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আরমান উদ্দিনের কণ্ঠ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়।

ফাঁস হওয়া অডিওতে আরমান উদ্দিন ও বিএনপির যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মো. তারেকুল হকের মধ্যে কথোপকথনে এমপির ওপর সহিংস হামলার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তারেকুল হক লোহাগাড়া এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড়ের মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের ঘনিষ্ঠ হতে পারেন।

গাজী নজরুলের ভাইরাল ভিডিও: দ্বিতীয় বিবাহ দাবি ও বিতর্ক

সর্বশেষ গত সোমবার রাতে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিস শূরার সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। এতে এক তরুণীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে।

পরদিন মঙ্গলবার দল থেকে বিবৃতিতে বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার ভিডিও বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। দল আরও খোঁজখবর নিয়ে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে বলে জানায়।

গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তিনি প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন তাকে বিয়ে করেছেন। তবে সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণীর জীবনবৃত্তান্ত ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন নজরুল ইসলাম তারিখ ২২ জুন ২০২৬। সেখানে তরুণীটির বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে।

উল্লেখ্য, ভাইরাল হওয়া জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী তরুণীটি ২০০৮ সালের ২২ মে জন্মগ্রহণ করেছেন। নজরুল ইসলামের বয়স ৭৭ বছর। তাঁর দাবি অনুযায়ী ১৭ জুন বিয়ে হলে ওই দিন তরুণীটির বয়স ছিল ১৮ বছর ২৬ দিন।

এ বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “ব্যক্তিগত ইস্যুকে কেন্দ্র করে একজন সংসদ সদস্যকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে সম্মানহানি করা হচ্ছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তার পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য ‘সেটিসফাইড’ হলে ওকে। বিষয়টি নিয়ে আর কোনো কথা বলার দরকার মনে করছি না।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের দায়িত্ব অনেক বেশি। সংসদীয় শিষ্টাচার ও জনপ্রতিনিধির আচরণবিধি মেনে চলা তাদের জন্য অপরিহার্য। একাধিক বিতর্কিত ঘটনা দলটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে এবং ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে বলে তারা মনে করেন।

তবে জামায়াত নেতৃত্ব বলছে, তারা এসব ঘটনা গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে।

আরও