×
×
Saturday, 12 September, 2026, 2:12 am

মুক্ত বাণিজ্যের যুগ শেষ? ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি হাঁটছে জাতীয়তাবাদের পথে
বাণিজ্য থেমে নেই, তবে বদলে যাচ্ছে তার গতিপথ ও চরিত্র IMF-এর সতর্কবার্তা

বিশ্ব বাণিজ্য থমকে যায়নি। কিন্তু এর দিকনির্দেশনা, ধরন আর পরিচালিত হওয়ার নিয়মকানুন সবকিছুতেই আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন। বিশ্লেষকদের ভাষায়, উদারীকরণের যুগ থেকে বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমশ ঝুঁকছে সংরক্ষণবাদ ও বাণিজ্য-জাতীয়তাবাদের দিকে। ২০২৬ সালে এসে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রেকর্ড প্রবৃদ্ধির পর মন্থর গতি

২০২৫ সাল বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য ছিল একটি উল্লেখযোগ্য বছর। এই সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিমাণ পৌঁছে যায় রেকর্ড পর্যায়ে। তবে এই ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে ৫ শতাংশের ঘর থেকে নেমে যেতে পারে প্রায় তিন শতাংশের কাছাকাছি।

এই মন্থরতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে—শুল্কনীতির পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন দেশের সরবরাহ-শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টা। প্রসঙ্গত, চলতি বছরের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ পেয়েছে; শুল্কনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ প্রবাহের ভারসাম্যহীনতাকে বারবার ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মুক্ত বাণিজ্য থেকে সরে আসার প্রবণতা

গত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল উন্মুক্ত বাজার ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের ধারণা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধারণায় ভাটা পড়েছে। একের পর এক দেশ নিজেদের শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষার নামে শুল্ক বৃদ্ধি, স্থানীয় উৎপাদনে ভর্তুকি এবং বাণিজ্য বাধা আরোপের পথে হাঁটছে। এই প্রবণতাকেই অর্থনীতিবিদরা বলছেন ‘বাণিজ্য-জাতীয়তাবাদ’।

এর ফলে বিশ্ব সরবরাহ-শৃঙ্খলে দেখা দিচ্ছে পুনর্বিন্যাস। বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন কেন্দ্র একটি দেশ থেকে সরিয়ে একাধিক দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো একক দেশের নীতিগত পরিবর্তনে বড় ধাক্কা না লাগে। একে বলা হচ্ছে ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’ বা ‘নিয়ার-শোরিং’ অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও কাছাকাছি দেশগুলোতে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা।

প্রযুক্তি খাতের ভূমিকা

আশার দিক হলো, বাণিজ্যের সামগ্রিক মন্থরতার মধ্যেও প্রযুক্তি-সম্পর্কিত বাণিজ্য প্রবাহ তুলনামূলকভাবে সচল রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্রিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একধরনের গতি জোগাচ্ছে। বিশেষত উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বেশ কিছু অর্থনীতিতে প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, এই প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধি যদি প্রকৃত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাজারে বড় ধরনের সংশোধন বা ধাক্কা লাগার আশঙ্কা থেকে যায়।

ঝুঁকিতে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো

বাণিজ্য-জাতীয়তাবাদের এই ঢেউয়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে নিম্ন আয়ের ও পণ্য-আমদানিনির্ভর দেশগুলো। শুল্ক বৃদ্ধি ও বাণিজ্য বাধার কারণে এসব দেশের রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে, যা তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি তেলের মূল্য অস্থিরতাও এই দেশগুলোর জন্য বড় একটি ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামীর পথ কোন দিকে?

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সাল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি রূপান্তরের বছর। মুক্ত বাণিজ্যের পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন এক বাস্তবতার জন্ম হচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতা—এই বিষয়গুলো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনগুলোতে বাণিজ্যনীতি নির্ধারণে বাজার অর্থনীতির যুক্তির চেয়ে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য বৈচিত্র্যময় বাজার অনুসন্ধান, নতুন বাণিজ্য চুক্তি এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার প্রস্তুতি এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)

আরও