ফাসাদ করেও যারা নিজেদের সংশোধনকারী দাবি করেঃ কোরআনের সতর্কবার্তা
বাহ্যিকভাবে সংশোধনের কথা, অথচ পৃথিবীতে অশান্তি কোরআন এমন দ্বিমুখী অবস্থানকে কীভাবে তুলে ধরে?
মানুষের মুখের কথা আর তার বাস্তব কর্মকাণ্ড সবসময় এক হয় না। কেউ নিজের কর্মকাণ্ডকে কল্যাণ, সংশোধন ও উন্নয়নের নামে উপস্থাপন করতে পারে; কিন্তু সেই কাজের ফল যদি পৃথিবীতে অশান্তি, বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাহলে কোরআন সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ এমন এক শ্রেণির মানুষের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, যাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাদের সতর্ক করা হলে তারা নিজেদের ‘সংশোধনকারী’ হিসেবে দাবি করে।
আল্লাহ বলেন,
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা যমীনে ফাসাদ করো না’, তারা বলে, ‘আমরা তো কেবল সংশোধনকারী’।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১১
এই আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে তাদের নিজেদের পরিচয় ও তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বলা হচ্ছে, “যমীনে ফাসাদ করো না”; অথচ জবাবে তারা বলছে, “আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।”
অর্থাৎ, তারা নিজেদের কাজকে ফাসাদ হিসেবে স্বীকার করছে না; বরং নিজেদের কর্মকাণ্ডকে সংশোধনের নামে উপস্থাপন করছে।
‘সংশোধনকারী’ দাবি করলেই কি সংশোধনকারী হওয়া যায়?
কোরআনের এই বক্তব্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেকে সংশোধনকারী দাবি করলেই কি তার কর্মকাণ্ড সংশোধনমূলক হয়ে যায়?
আয়াতটি অন্তত এটুকু স্পষ্ট করে যে, নিজের পরিচয় বা দাবি দিয়ে বাস্তব কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি পরিবর্তন করা যায় না।
কেউ যদি তার কাজকে ভালো বা সংশোধনমূলক বলে দাবি করে, কিন্তু তাকে বলা হয় “তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ করো না”, তাহলে তার নিজের দাবি এবং তার কর্মকাণ্ডের মধ্যে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কোরআন পরবর্তী আয়াতে তাদের সম্পর্কে আরও কঠোর বক্তব্য দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন,
“সাবধান! তারাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১২
এখানে কোরআন তাদের দাবির বিপরীতে সরাসরি বাস্তব অবস্থাটি তুলে ধরেছে। তারা নিজেদের সংশোধনকারী বললেও কোরআনের বক্তব্য হলো “তারাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী।”
ফাসাদ কী কোরআন কী দেখায়?
কোরআনে ‘ফাসাদ’ শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে এসেছে। তাই কোনো একটি কাজকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে কোরআনের সামগ্রিক বক্তব্যের আলোকে বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
সূরা আল-বাকারা ২:১১-১২-তে বিশেষভাবে এমন মানুষের কথা এসেছে, যারা নিজেদের সংশোধনকারী দাবি করে, অথচ তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন যে তারা ফাসাদ সৃষ্টি করে।
অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
“আর আল্লাহ ফাসাদ পছন্দ করেন না।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:২০৫
এখানে কোরআন একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট করেছে ফাসাদ আল্লাহর পছন্দনীয় নয়।
মানুষের দাবি নয়, আল্লাহর মাপকাঠিই চূড়ান্ত
কোরআনের এই আলোচনায় একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। মানুষ নিজের কাজের জন্য নানা নাম দিতে পারে। কোনো কাজকে সে উন্নয়ন বলতে পারে, সংশোধন বলতে পারে কিংবা কল্যাণের উদ্যোগ বলে দাবি করতে পারে। কিন্তু কোরআনের দৃষ্টিতে শুধু দাবি যথেষ্ট নয়।
সূরা আল-বাকারা ২:১১-১২-এ দেখা যায়, তাদের বলা হয়েছিল ফাসাদ না করতে। তারা জবাব দিয়েছিল “আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।” কিন্তু আল্লাহ তাদের সেই দাবিকে গ্রহণ করেননি।
এরপরই এসেছে সুস্পষ্ট ঘোষণা
“সাবধান! তারাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী।”
অতএব, কোরআনের আলোকে কোনো কাজের প্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানুষের আত্মঘোষিত পরিচয়ের চেয়ে আল্লাহর নির্দেশ ও সত্যের মাপকাঠিই গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবীতে ফাসাদ না করার নির্দেশ
কোরআন শুধু ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের কথা উল্লেখ করেনি; বরং পৃথিবীতে বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
আল্লাহ বলেন,
“আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:৬০
আর সূরা আল-আ‘রাফে বলা হয়েছে,
“আর পৃথিবীতে সংশোধনের পর তাতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না।”
— সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৫৬
এখানে কোরআন মানুষের সামনে একটি স্পষ্ট নীতি স্থাপন করে সংশোধনের পরিবর্তে ফাসাদ সৃষ্টি করা যাবে না।
সংশোধনের দাবি নয়, কাজের সত্যতা গুরুত্বপূর্ণ
সূরা আল-বাকারা ২:১১-এর শিক্ষা শুধু অতীতের কোনো একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আয়াতটি মানুষের একটি প্রবণতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের ভুল বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডকে ভালো নাম দিয়ে উপস্থাপন করা।
কেউ যখন ফাসাদ সৃষ্টি করার অভিযোগে সতর্ক হয়েও বলে, “আমরা তো সংশোধনকারী”, তখন তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হয়।
কোরআন সেই আত্মপ্রবঞ্চনার দিকটিও তুলে ধরে। কারণ ২:১২ আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে,
“কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।”
অর্থাৎ, মানুষ কখনো নিজের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত পরিণতি উপলব্ধি না করেও নিজেকে সঠিক মনে করতে পারে।
কোরআনের শিক্ষা
সূরা আল-বাকারা ২:১১-১২ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রেখে যায় শুধু নিজেকে সংশোধনকারী দাবি করলেই সংশোধনকারী হওয়া যায় না।
নিজের বক্তব্যের চেয়ে নিজের কাজকে আল্লাহর নির্দেশের সামনে দাঁড় করানো জরুরি। কারণ মানুষ নিজের কাজের জন্য যে নামই ব্যবহার করুক না কেন, আল্লাহর কাছে তার প্রকৃত অবস্থাই গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআনের ভাষায়, যারা ফাসাদ সৃষ্টি করে অথচ নিজেদের সংশোধনকারী বলে দাবি করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহর ঘোষণা অত্যন্ত স্পষ্ট,
“সাবধান! তারাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।”
তাই কোরআনের আলোকে একজন মানুষের জন্য প্রশ্ন হওয়া উচিত আমি নিজেকে কী নামে পরিচয় দিচ্ছি, তা নয়; বরং আমার কাজ কি সত্যিই আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই আত্মজিজ্ঞাসাই হতে পারে ফাসাদ থেকে দূরে থাকা এবং প্রকৃত সংশোধনের পথে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।