বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের দাপট কি কমছে?
১. সূচনালগ্ন: মার্কিন ঋণের বর্তমান চিত্র ও বৈশ্বিক প্রভাব
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ঋণের পাহাড় কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকট নয়, বরং এটি একটি গভীর পদ্ধতিগত ঝুঁকি (Systemic Risk) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৪০ ট্রিলিয়ন বা ৪০ লাখ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এই অংকের বিশালত্ব অনুধাবনের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতির সাথে এর তুলনা করা যেতে পারে এই বিপুল অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান আকারের অন্তত ৫২৩ বছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা সম্ভব।
এর গাণিতিক ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা সুদের বোঝার দিকে তাকাই। ২০২৬ সাল নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল এই ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ বছরে প্রায় ১.০৪ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে। অর্থাৎ, প্রতিদিন সুদের পেছনে ব্যয় হবে প্রায় ২৮৫ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় বার্ষিক সুদের এই পরিমাণ প্রায় ১২.৭৬ লাখ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের মোট বাজেটের প্রায় দেড় গুণ। এর কৌশলগত তাৎপর্য হলো, যখন একটি বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি ইস্যুকারী দেশ এই মাত্রায় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন তার মুদ্রার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি কেবল ডলার-নির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খলকে অস্থিতিশীল করে না, বরং পুরো বিশ্বের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। এই ঋণের বোঝাই মূলত ডলারের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানের ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে।
২. ডলারের আধিপত্যের উৎস: ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ ও মাত্রাতিরিক্ত বিশেষ সুবিধা
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার কেন একটি অভিন্ন ভাষা বা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ হিসেবে স্বীকৃত, তার মূলে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তন। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ‘নিক্সন শক’ পর্যন্ত সময়কাল ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের ভিত তৈরি করেছে। ১৯৭১ সালে যখন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারকে স্বর্ণে রূপান্তরের ব্যবস্থা স্থগিত করেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জন কনালি দম্ভভরে বলেছিলেন, “ডলার আমাদের কারেন্সি, কিন্তু সমস্যা আপনাদের।”
এই বিশেষ অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘মাত্রাতিরিক্ত বিশেষ সুবিধা’ বা Exorbitant Privilege প্রদান করে। বর্তমানে বিশ্বের ঘোষিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৫৭.১৩ শতাংশই মার্কিন ডলারে সংরক্ষিত। আরও বিস্ময়কর হলো, বিশ্বে প্রতিদিন যে গড়ে ৯.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হয়, তার প্রায় ৮৯ শতাংশই সম্পাদিত হয় ডলারে। এই বিপুল চাহিদার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে তার আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করতে পারছে এবং অত্যন্ত কম সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারছে। এটি অনেকটা অসীম সীমার এক বৈশ্বিক ক্রেডিট কার্ডের মতো, যা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য ঘাটতি বজায় রাখার সুযোগ দেয়। তবে ডলারের এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, তখন থেকেই এর আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে থাকে।
৩. ডলারের রাজনৈতিক ব্যবহার: ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র ও তার প্রতিক্রিয়া
সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে তার পররাষ্ট্রনীতির একটি অন্যতম প্রধান কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বৈশ্বিক আর্থিক অবকাঠামো, বিশেষ করে সুইফট (SWIFT) পেমেন্ট সিস্টেম থেকে কোনো দেশকে বিচ্ছিন্ন করা এখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরান এবং রাশিয়ার ওপর আরোপিত ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এর কৌশলগত ফলাফল হিসেবে বৈশ্বিক আস্থায় ফাটল ধরেছে। ডলারকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের ফলে চীন ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তিগুলো এখন এই আশঙ্কায় রয়েছে যে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ালে তাদেরও বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে অর্থনৈতিকভাবে নতজানু করা হতে পারে। বাস্তবিকভাবে এর অর্থ দাঁড়ায়, দেশগুলো এখন কেবল অর্থনৈতিক কারণে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ডলারের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে চাইছে। এই ভূ-রাজনৈতিক ভীতিই মূলত বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম এবং রিজার্ভ মুদ্রা তৈরির তাগিদকে ত্বরান্বিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডলারের একক আধিপত্যের জন্য বড় হুমকি।
৪. প্রতিযোগী মুদ্রার উত্থান ও সীমাবদ্ধতা: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ঐতিহাসিকভাবে ডাচ গিল্ডার্স, স্পেন ও ইতালির নগররাষ্ট্রগুলোর মুদ্রা কিংবা ব্রিটিশ পাউন্ডের আধিপত্য যেমন চিরস্থায়ী হয়নি, ডলারের ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিকল্প মুদ্রাগুলোর নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ডলারের আয়ু বাড়িয়ে দিচ্ছে:
* ইউরো (Euro): এটি ডলারের প্রধান প্রতিযোগী হলেও ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ও আর্থিক ঐক্যের অভাব এবং ২০১০-এর দশকের ঋণ সংকট এর সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে।
* ইউয়ান (Yuan): চীনের অর্থনৈতিক শক্তি বাড়লেও পুঁজি নিয়ন্ত্রণ (Capital Control) এবং স্বচ্ছ আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর অভাবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো আস্থার সংকট প্রকট।
* জাপানি ইয়েন (Yen): আশির দশকে ইয়েন শক্তিশালী প্রতিযোগী হয়ে উঠলেও ১৯৮৫ সালের প্লাজা অ্যাকর্ড পরবর্তী বুদবুদ এবং ব্যাংকিং সংকট জাপানকে দুই দশকের স্থবিরতায় ঠেলে দেয়, যার ফলে ইয়েন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
* ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency): হার্ভার্ডের অধ্যাপক কেনেথ রোগফ-এর মতে, ক্রিপ্টো বর্তমানে ‘ছায়া অর্থনীতি’তে ডলারের চাহিদা কিছুটা কমিয়ে দিচ্ছে। তবে এর তীব্র অস্থিরতা এবং ঐতিহাসিক সত্য যে সরকারগুলো শেষ পর্যন্ত বেসরকারি মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেই এই ধারণা ক্রিপ্টোর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে রেখেছে।
বাস্তবতা হলো, ইউরো বা ইউয়ান এখনো ডলারের মতো গভীর ও উন্মুক্ত বাজার তৈরি করতে পারেনি। তবে ডলারের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি আসলে বাইরে নয়, বরং তার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।
৫. অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ঝুঁকি: রোমান সাম্রাজ্যের পতনের শিক্ষা
অধ্যাপক কেনেথ রোগফ বর্তমান মার্কিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাথে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের একটি তাত্ত্বিক তুলনা করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলো কেবল বাইরের শত্রুর আক্রমণে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণেই ধ্বংসের মুখে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ঝুঁকিগুলো হলো—অনিয়ন্ত্রিত বাজেট ঘাটতি, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক অনীহা। এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো মুদ্রার ওপর আস্থার অভাব তৈরি করে। যখন কোনো দেশ রাজনৈতিক স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ব্যবহার করে বা ঋণের সীমা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সেই মুদ্রাকে আর ‘নিরাপদ সম্পদ’ হিসেবে বিবেচনা করে না। এই আস্থার ঘাটতি কেবল ডলারের পতন ত্বরান্বিত করবে না, বরং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
৬. উপসংহার: বহু-মুদ্রাভিত্তিক বিশ্ব ও আগামী দশকের পূর্বাভাস
আগামী ১০ থেকে ২০ বছরে মার্কিন ডলারের কোনো আকস্মিক নাটকীয় পতন ঘটবে না, কারণ ডলারের সব ভূমিকা পালন করতে সক্ষম এমন কোনো একক বিকল্প এখনো নেই। তবে আমরা একটি ‘বহু-মুদ্রাভিত্তিক বিশ্ব’ (Multi-polar Currency System)-এর দিকে এগোচ্ছি। যেখানে ইউরো, ইউয়ান, স্বর্ণ এবং ডিজিটাল মুদ্রার একটি সহাবস্থান থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডলারের ওপর বিশ্বের ‘নিঃশর্ত আস্থার যুগ’ (Era of Unconditional Trust) শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন কেবল বাজার অর্থনীতির সিদ্ধান্তে নয়, বরং দেশগুলোর নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ঘটছে। পরিশেষে, ডলারের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর নির্ভরশীল। যদি যুক্তরাষ্ট্র তার মাত্রাতিরিক্ত ঋণ ও রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে আস্থার এই ফাটল মেরামত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিতিশীলতা আসন্ন, তার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য এনে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ, ডলারের সমস্যাটি যদি শেষ পর্যন্ত প্রকট হয়, তবে তা কেবল বিশ্বের জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যই সবচেয়ে বড় পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে।