ভারতের সাম্প্রতিক সহিংসতা: কোন পথে এগোচ্ছে দেশ?
ধর্মীয় উত্তেজনা থেকে যুববিক্ষোভ বহুমুখী সংকটে নজিরবিহীন অস্থিরতা ভারতের
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজপথে উত্তাপ ছড়িয়েছে একাধিক ঘটনায়। কর্নাটকের নারেগাল গ্রামে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ থেকে শুরু করে রাজধানী দিল্লির যুব আন্দোলন বিভিন্ন ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বিচারকের প্রাণনাশের হুমকি, আর শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির প্রতিবাদ মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার হয়ে গেছে চিত্র। এই প্রতিবেদনে ভারতের চলমান অস্থিরতার কারণ ও প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
কর্ণাটকে ফের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ
গত ২৯শে জুন কর্ণাটকের হাভেরি জেলার নারেগাল গ্রামে পশুপালনের উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনায় উভয় সম্প্রদায়ের ৫২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় পক্ষের ২৬ জন করে আসামি রয়েছে এই মামলায় ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উৎসবের সময় একটি মসজিদের কাছে আতশবাজি ফাটানো নিয়ে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। তা ধীরে ধীরে সংঘর্ষে রূপ নেয়। ঘটনায় অন্তত আটজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজনকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি করা হয় ।
কর্ণাটক বিজেপি সভাপতি বি ওয়াই বিজয়েন্দ্র এই ঘটনাকে ‘হিন্দু-বিরোধী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ কংগ্রেস সরকারের ‘পুতুল’ হয়ে কাজ করছে এবং নিরীহ হিন্দু যুবকদের বিরুদ্ধে মামলা করছে । অন্যদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, উভয় পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে পৃথক মামলা করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
যুব আন্দোলনের আগুন: ‘তেলাপোকা’ থেকে ‘বিপ্লব’
রাজধানী দিল্লির যুব আন্দোলন আরেকটি উদ্বেগের কারণ। ‘ককক্রোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির প্রতিবাদে। মেডিকেলের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে হাজার হাজার যুবক জড়ো হয়েছিলেন সংসদ ভবনের সামনে ।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৮০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়েছে । ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়ায় পুলিশি brutality-র ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করেছে ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আন্দোলন মোদি সরকারের জন্য একটি ‘বড় চ্যালেঞ্জ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করছে আন্দোলনকারীরা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন ।
বিচারকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষ
মধ্যপ্রদেশের বিচারক তাবাসসুম খান সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। তিনি ১৪ জন ‘গো-রক্ষক’-কে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন । ২০২২ সালে নাজির আহমদ নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করেছিল তারা ।
কিন্তু এই রায়ের পরেই বিচারক খান সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক হুমকি ও গালিগালাজের শিকার হন। তাঁকে ‘মুসলিম’ পরিচয়ে আক্রমণ করা হয় যা বিচার ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক মার্কণ্ডেয় কাটজু বলেছেন, “বিচারকের ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে রায়ের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, যা খুবই বিপজ্জনক” ।
স্বাধীনতার হুমকি: আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ‘ব্যবস্থাগত সহিংসতা’ বাড়ছে। গত জানুয়ারিতে ওড়িশায় এক খ্রিস্টান পাদ্রীকে গোবর খেতে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছে। মহারাষ্ট্রে চারটি খ্রিস্টান পরিবারের বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ছত্তিশগড়ে আধা ডজন মুসলিম বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ।
সংস্থাটি ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ (কান্ট্রি অফ পার্টিকুলার কনসার্ন) হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করেছে । এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে এক কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনায় ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি’ এর ভূমিকা সন্দেহ করছেন ।
সাম্প্রতিক সহিংসতা ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা এবং তরুণদের বৈধ দাবি মেটানো এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সবার আগে আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায়, এই অস্থিরতা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।