শিল্পে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের বড় পরিকল্পনা, বাড়ছে এলএনজি সরবরাহ
২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খননের উদ্যোগ, সমুদ্রের ২৬ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান; নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা।
শিল্প খাতে গ্যাসের সাময়িক সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশীয় উৎসে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কূপ খনন, স্থল ও সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং এলএনজি আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব পরিকল্পনার কথা জানান।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খননের লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২ডি ও ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এসব জরিপের মাধ্যমে ভূগর্ভে তেল ও গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত শনাক্ত করে ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
সমুদ্রের ২৬ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান
দেশের সমুদ্রাঞ্চলেও জ্বালানি অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে।
সরকারের প্রত্যাশা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে অনুসন্ধান কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারিত হবে এবং ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাসের উৎস আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস
বর্তমানে দেশে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গড়ে প্রতিদিন ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব বলে সংসদে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তবে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে ভবিষ্যতের বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এলএনজি সরবরাহের অবকাঠামো আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কুতুবজোম ও মাতারবাড়ীতে নতুন টার্মিনাল
ভবিষ্যৎ গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের নতুন টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে।
এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে এবং শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাসের চাহিদা পূরণে সরকারের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও এলএনজি টার্মিনালের সম্ভাবনা
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সেখানে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে এনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পাওয়া গ্যাসকে বৃহত্তর শিল্পাঞ্চলে কাজে লাগানোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও উপকৃত হতে পারে।
পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার
সরকার জানিয়েছে, গ্যাসের প্রাপ্যতা অনুযায়ী পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলগুলোকে সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আওতাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্পের জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ
সরকারের নেওয়া এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো একদিকে দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, অন্যদিকে আমদানিকৃত এলএনজির অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়বে। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বৃদ্ধির সমন্বিত পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন, গ্যাসের উৎপাদন ও আমদানি সক্ষমতা এবং শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর।