×
×
Tuesday, 28 July, 2026, 3:13 pm


মুক্তিযোদ্ধা ভাতায় জালিয়াতি: ভুয়া হিসাবে ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ, তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

বরগুনার আমতলী উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে একাধিক ভুয়া ও অননুমোদিত ব্যাংক হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে, যার বড় অংশ ইতোমধ্যেই তুলে নেওয়া হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৯০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা বিভিন্ন সন্দেহজনক হিসাবে জমা হয়। বিষয়টি ধরা পড়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রায় ২৪ লাখ ১১ হাজার টাকার লেনদেন স্থগিত করতে সক্ষম হলেও তার আগেই প্রায় ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সোনালী ব্যাংকের একাধিক শাখা—আমতলী, বরগুনা কোর্ট বিল্ডিং, বরিশালের চকবাজার ও কলেজ রোড শাখা—ব্যবহার করে এসব লেনদেন সম্পন্ন হয়। অভিযোগ রয়েছে, আমতলী উপজেলার এক ব্যক্তি নিজের নামে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ভুয়া হিসাব খুলে এই অর্থ আত্মসাৎ করেন।

নিয়ম অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বিতরণের ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার যাচাই ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বিতরণ কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অর্থ লেনদেন হয়েছে।

নথিপত্র বিশ্লেষণে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের নামে একাধিক হিসাবের পাশাপাশি স্ত্রীর ও বোনের নামেও হিসাব খুলে সেখানে ভাতার অর্থ জমা করেছেন। এমনকি একজন অমুক্তিযোদ্ধার হিসাবেও ভাতা জমার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত হওয়ার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়। পরবর্তীতে প্রধান কার্যালয় থেকে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয় এবং প্রাথমিক তদন্তেই জালিয়াতির সত্যতা পাওয়া যায়। তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তি লিখিত বক্তব্যে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানা গেছে।

তদন্তে আরও উঠে আসে, ৪০ জনের নামে ভাতা উত্তোলন করা হলেও তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৪ জন ভুয়া। এসব নামে খোলা প্রায় ২০টি হিসাবে অর্থ লেনদেন হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রোফাইলের বিপরীতে প্রায় ২৪ লাখ টাকার ঋণ বিতরণের ঘটনাও ধরা পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ভাতার অর্থও অন্যদের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এতে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন নিয়ম মেনে ভাতা পেলেও হঠাৎ করে কীভাবে সেই অর্থ অন্যের হিসাবে চলে গেল, তা বোধগম্য নয়।

এ ঘটনায় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে জেলা প্রশাসনও তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

এই ঘটনা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

আরও