×
×
Saturday, 12 September, 2026, 1:07 am

মিড-ডে মিল: শিশুদের পাতে পুষ্টি পৌঁছাতে চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাবারের মান নিয়ে আপস নয়

আগামী বছর থেকে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হতে যাচ্ছে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া এই উদ্যোগকে অনেকেই বলছেন সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে পাইলট আকারে চলমান এই কর্মসূচিতে বারবার উঠে আসা খাবারের মান ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। দেশজুড়ে পুরোদমে কার্যক্রম চালুর আগে তাই একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক কাঠামো দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

নিরক্ষরতা ও ঝরে পড়ার পেছনে দারিদ্র্যই মূল কারণ

রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। দেশে এখনো ২২ শতাংশের বেশি মানুষ নিরক্ষর, অর্থাৎ একটি বড় জনগোষ্ঠী অর্থনীতির মূলধারায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম শিক্ষা ও দক্ষতা থেকে বঞ্চিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যালয়ে না যাওয়া কিংবা মাঝপথে ঝরে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য।

করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বৈশ্বিক অভিঘাত এবং সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছিল, তার ছায়া পড়েছে শিক্ষা খাতেও। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের বার্ষিক বিদ্যালয় শুমারি অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার বেড়েছে ৩ শতাংশ। তুলনামূলক দরিদ্র ও দুর্গম জনপদেই এই হার সবচেয়ে বেশি।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিবিষয়ক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্যই নেই। এমন প্রেক্ষাপটে সুযোগবঞ্চিত শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করা, ঝরে পড়া রোধ এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হয়ে উঠতে পারে।

কত ব্যয়ে, কত শিক্ষার্থী পাবেন এই সুবিধা

দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭টি, যেখানে পড়ালেখা করছে প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থী। এখন পর্যন্ত ১৫০টি উপজেলায় মিড-ডে মিল কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। কর্মসূচিটি দেশের সব উপজেলায় সম্প্রসারিত হলে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা যা এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব বোঝাতে যথেষ্ট।

খাবারের মান নিয়ে বারবার প্রশ্ন

বর্তমানে মিড-ডে মিলের আওতায় শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় বানরুটি, সেদ্ধ ডিম, কলা, ইউএইচটি দুধ ও ফর্টিফায়েড বিস্কুট। কিন্তু এসব খাবারের গুণগত মান নিয়ে নানা সময়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের কাছ থেকে অভিযোগ এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় পচা বা কাঁচা কলা, দুর্গন্ধযুক্ত কিংবা নষ্ট সেদ্ধ ডিম এবং নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ রুটি সরবরাহের খবরও উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে।

এই বাস্তবতায় খাদ্যতালিকা পুনর্বিবেচনা এবং তদারকি প্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের, বিশেষত শিক্ষার্থীদের মায়েদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, পুষ্টিমান অক্ষুণ্ণ রেখে বিকল্প খাদ্যতালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে।

শিশুদের খাবারের মান ও পুষ্টি নিয়ে কোনো ধরনের আপস কাম্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে, পুরোদমে কার্যক্রম চালুর আগেই খাদ্যতালিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।

সরবরাহ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

বর্তমানে চালু থাকা প্রকল্পে খাবার সরবরাহ করছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। তবে মূল সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করে আরও বহু সহযোগী প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ উঠেছে, এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সারা দেশে কর্মসূচি সম্প্রসারণের আগে নিয়মিত তদারকি ও কঠোর জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

শেষ কথা

মিড-ডে মিল কর্মসূচি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিতকরণ ও শিক্ষা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করছে খাবারের মান বজায় রাখা, স্বচ্ছ সরবরাহ প্রক্রিয়া এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার ওপর। দেশব্যাপী কর্মসূচি চালুর আগে এসব দিক নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও