×
×
Saturday, 12 September, 2026, 8:55 am


‘প্রত্যেকেরই নিজের সীমার মধ্যে থাকা দরকার’: প্রধানমন্ত্রী

দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও কেউ যেন আইন ও গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলার সীমা অতিক্রম করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা না করে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “প্রত্যেকের প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।”

শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

অরাজকতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষ্য, সরকার দেশে বিদ্যমান সমস্যাগুলো অস্বীকার করছে না; বরং সেগুলো সমাধানে কাজ করছে। তবে সমস্যা থাকার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়, সেটি মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাই সরকার গণতান্ত্রিক ধারা ও রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে কেউ আইন ভঙ্গ করে অরাজকতা সৃষ্টি করলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য

প্রধানমন্ত্রীর ‘সীমার মধ্যে থাকা’ মন্তব্যটি মূলত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, আইন মেনে চলা এবং গণতান্ত্রিক আচরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়ার একটি বার্তা হিসেবে এসেছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন দলের মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলার আহ্বান হিসেবে বক্তব্যটি তাৎপর্যপূর্ণ।

গণতন্ত্রে বিরোধিতা ও সমালোচনা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু মতপ্রকাশের অধিকার ও রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা এবং অন্যের অধিকার রক্ষার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই ভারসাম্যের বিষয়টিই সামনে এসেছে।

‘সমস্যা আছে, সমাধানের চেষ্টা চলছে’

দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে নানা সমস্যা রয়েছে বলে স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার আগের সরকারের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যারও সমাধান করার চেষ্টা করছে।

এর মধ্যে জ্বালানি সংকটকে দেশের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যে চাপের মধ্যে রয়েছে, সে বিষয়েও তিনি কথা বলেন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় সরকার জনগণের ওপর চাপ কম রাখার চেষ্টা করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি

আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেন। নারীদের স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, ধর্মীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।

এ ছাড়া গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষি ও পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন এবং দলের নেতাকর্মীদের এ কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

রাজনীতিতে দায়িত্বশীলতার আহ্বান

রাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার, তেমনি তা বাস্তবায়নের পদ্ধতিও হতে হয় দায়িত্বশীল এমন একটি ধারণাই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশেষ করে একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতি রাজনৈতিক বিরোধিতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হলেও সেই বিরোধিতা যেন সহিংসতা, নৈরাজ্য কিংবা জনজীবনে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টির দিকে না যায় এমন প্রত্যাশা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বর্তমান সরকারের সামনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনীতি, জ্বালানি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের নীতি ও কার্যক্রম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রীর আজকের বক্তব্যে একদিকে যেমন অরাজকতা ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা রয়েছে, অন্যদিকে জনগণের দেওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের প্রত্যয়ও উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে “প্রত্যেকের প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার” প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে কেবল একটি রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং নাগরিক দায়িত্বের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তবে এই সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংবিধান, আইন, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমানভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি।

আরও