×
×
Saturday, 12 September, 2026, 6:38 am


পাঁচবার দরপত্র ব্যর্থ, সাত মাসেও এলপিজি আনতে পারেনি বিপিসি

সাত মাসেও এক টন এলপিজি আমদানি করতে পারেনি বিপিসি, সরাসরি ক্রয়ে ৫ হাজার টনের উদ্যোগ

বেসরকারি খাতনির্ভর বাজারে সরকারি উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগে বারবার দরপত্র ব্যর্থ; প্রায় ৪৫ কোটি টাকার এলপিজি কিনতে যাচ্ছে বিপিসি

দেশের এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) বাজারের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতনির্ভর। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাজারে সরকারের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে এই নির্ভরতা কমানো এবং সংকটের সময়ে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে চলতি বছরের শুরুতে প্রথমবারের মতো সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

তবে উদ্যোগ নেওয়ার সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এক টন এলপিজিও দেশে আনতে পারেনি রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান। সরবরাহকারী খুঁজতে পাঁচ দফা দরপত্র আহ্বান করেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পায়নি বিপিসি। শেষ পর্যন্ত নিয়মিত দরপত্রের বাইরে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরাসরি ক্রয়ে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার এলপিজি

বিপিসির সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪৫ কোটি টাকা মূল্যের পাঁচ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের কাজ পেয়েছে স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি প্রয়োজনীয় কার্যসম্পাদন জামানত জমা দিয়েছে। এখন বিপিসির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর এলসি খোলাসহ পরবর্তী আমদানি কার্যক্রম শুরু হবে।

তবে আমদানি করা এলপিজি ঠিক কবে দেশে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেনি বিপিসি।

বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জামানত জমা দেওয়ার পর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হবে। এরপর এলপিজি আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খুলতে হবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে চালান দেশে পৌঁছাতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে।

পাঁচবার দরপত্র, তবু মেলেনি সরবরাহকারী

গত ২০ জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ তিনটি শর্তে বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেয়। এর আগে ১০ জানুয়ারি নীতিগত অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল বিপিসি।

অনুমোদন পাওয়ার পর ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে মোট পাঁচ দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে দুইবার এবং জুলাইয়ে তিনবার দরপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো দরপত্রেই গ্রহণযোগ্য সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি।

বিপিসির কর্মকর্তাদের মতে, দরপত্রে সরবরাহকারী না পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্রিমিয়াম বা অতিরিক্ত মূল্য। একটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্যের সঙ্গে প্রতি টন এলপিজির জন্য ২৭০ মার্কিন ডলার প্রিমিয়াম দাবি করেছিল। বিপিসির বিবেচনায় এই মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি এবং বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক। ফলে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়নি।

স্পিড মার্কেটিংয়ের প্রস্তাবে নতুন করে আশা

পাঁচ দফা দরপত্র ব্যর্থ হওয়ার পর গত ৪ আগস্ট স্পিড মার্কেটিং করপোরেশন নিজ উদ্যোগে এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রস্তাব দেয়।

প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী না হলেও পরবর্তী সময়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে তাদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

স্পিড মার্কেটিং সৌদি আরামকোর আগস্টের চুক্তিমূল্যের তুলনায় প্রতি টনে ৯৭ মার্কিন ডলার প্রিমিয়ামে এলপিজি সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। বিপিসির মূল্যায়ন কমিটি ওই দরেই পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার সুপারিশ করে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, পাঁচ হাজার টন এলপিজি কিনতে মোট ব্যয় হবে প্রায় ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। মোট ক্রয়মূল্যের ৫ শতাংশ কার্যসম্পাদন জামানত দেওয়ার বিষয়েও সম্মত হয়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি।

আরও একটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব

এদিকে ব্রাদার্স এলপিজি নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও বিপিসিকে এলপিজি সরবরাহে আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ প্রস্তাব বিপিসির বোর্ডে অনুমোদন পেয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, একদিকে স্পিড মার্কেটিংয়ের সঙ্গে চুক্তি ও এলসি খোলার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবেও আরেকটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

এলপিজি বাজারে বেসরকারি খাতের একচেটিয়া প্রভাব

দেশে আবাসিক পর্যায়ে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করা হয় ২০১৫ সালে। এরপর রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০০ শতাংশ। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ১২৩ শতাংশে পৌঁছায়।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন এলপিজি সরবরাহ করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই চাহিদা বেড়ে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।

বাজারের এই ব্যাপক সম্প্রসারণের বিপরীতে সরকারি সরবরাহের সক্ষমতা এখনো অত্যন্ত সীমিত। বিপিসির হিসাবে, সরকার বর্তমানে সরাসরি কোনো এলপিজি আমদানি করে না। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবে কিছু এলপিজি পাওয়া যায়।

অন্যদিকে দেশে ব্যবহৃত এলপিজির বড় অংশ আমদানি করে বেসরকারি খাতের প্রায় ১৫ থেকে ২০টি প্রতিষ্ঠান।

রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর বড় নির্ভরতা

দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই জ্বালানির সরবরাহ ও দামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার।

২০২০ সালে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৯০০ টাকা। ২০২১ সালের মে মাস থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ওই বছরের মে মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ৮৪২ টাকা।

তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার প্রভাব পড়ে দেশের এলপিজি বাজারেও। সময়ের সঙ্গে দাম বাড়তে থাকে এবং সরবরাহ সংকট তৈরি হলে কোনো কোনো এলাকায় সিলিন্ডারপ্রতি দাম তিন হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।

এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বাজারে সংকটের সময় দ্রুত সরবরাহ বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

সরকারের অনুমোদনের শর্ত ছিল বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমে বাজারজাত

বিপিসিকে এলপিজি আমদানির অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল সরকারি উদ্যোগে আমদানি করা এলপিজি অনুমোদিত বেসরকারি অপারেটরদের দেওয়া হবে। পরে ওই অপারেটররাই তা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বাজারজাত করবে।

এ বিষয়ে লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, বেসরকারি অপারেটররা সরকারি উদ্যোগকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে এ ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক শর্তসহ সংশ্লিষ্ট সব নিয়ম ও শর্ত উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে হবে।

চট্টগ্রাম ও মোংলায় প্ল্যান্ট তৈরির পরিকল্পনা

বিপিসি চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধান জানিয়েছেন, এলপিজি আমদানির প্রক্রিয়া বর্তমানে এগিয়ে চলছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং শিগগিরই আমদানি শুরু করার আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু আমদানি নয়, ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম ও মোংলায় এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনেরও চেষ্টা চলছে। এসব অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হলে দেশে এলপিজি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়বে এবং এর সুফল ভোক্তারাও পাবেন।

শুধু একবার আমদানি নয়, দরকার স্থায়ী সরকারি সক্ষমতা

বিশ্লেষকদের মতে, একবার এলপিজি আমদানি করলেই বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং নিয়মিত আমদানি, সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, বিপিসির বর্তমান উদ্যোগ দ্রুত শেষ করা দরকার। একই সঙ্গে বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তার মতে, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত এলপিজি আমদানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিজস্ব আমদানি, সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর। তাই বাজারে সরকারের কার্যকর উপস্থিতি বাড়ানো জরুরি। বিপিসি নিয়মিত এলপিজি আমদানি করলে বাজারে একটি বিকল্প সরবরাহ উৎস তৈরি হবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ সরবরাহ, অবকাঠামো ও বাজার নিয়ন্ত্রণ

দেশে এলপিজির চাহিদা গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারি আমদানি ও সংরক্ষণ সক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বা সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

বিপিসির বর্তমান উদ্যোগ সফল হলে অন্তত সরকারি পর্যায়ে একটি বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে নিয়মিত আমদানি, পর্যাপ্ত মজুত, আধুনিক সংরক্ষণাগার, বোতলজাতকরণ সুবিধা এবং শক্তিশালী বিতরণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সাত মাসে পাঁচ দফা দরপত্র ব্যর্থ হওয়ার পর সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে পাঁচ হাজার টন এলপিজি কেনার উদ্যোগ তাই কেবল একটি চালান আমদানির বিষয় নয়; বরং দেশের দ্রুত সম্প্রসারিত এলপিজি বাজারে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি কতটা কার্যকর হবে, সেটিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

আরও