×
×
Saturday, 12 September, 2026, 10:22 am


বাজারে অর্ধেকই ৫০০-১০০০ টাকার নোট, সবচেয়ে দুর্লভ ২০০ টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এলো নোট বাজারের চিত্র, সংকটে ছোট মূল্যমানের নোট

দেশের অর্থনীতিতে হাতে হাতে ঘুরতে থাকা কাগুজে নোটের প্রায় অর্ধেকটাই এখন দুটি বড় মূল্যমানের—৫০০ ও ১০০০ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন থেকে এই চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ব্যাংক ও সাধারণ মানুষের হাতে থাকা মোট নোটের ৪৯ শতাংশই এই দুই মূল্যমানের। অন্যদিকে বাজারে সবচেয়ে কম প্রচলিত নোট হলো ২০০ টাকার।

মোট কত নোট আছে বাজারে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুন মাসের শেষে বিভিন্ন মূল্যমানের মোট ৯৬৬ কোটি ৫৪ লাখ ৮২ হাজার ৪১৮টি কাগুজে নোট দেশের অর্থনীতিতে সচল ছিল। পণ্য কেনাবেচা থেকে শুরু করে সেবা গ্রহণ প্রতিটি লেনদেনেই এসব নোট হাতবদল হয়। বাজারমূল্যের হিসাবে এই বিপুল সংখ্যক নোটের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট, যা আর্থিক মূল্যের হিসাবে প্রায় অর্ধেক।

সংখ্যা ও মূল্যে শীর্ষে কোন নোট

নোটের সংখ্যার দিক থেকে বাজারে সবচেয়ে বেশি চলছে ৫০০ টাকার নোট। বর্তমানে বাজারে এই মূল্যমানের নোটের সংখ্যা প্রায় ২৭০ কোটি, যার সম্মিলিত আর্থিক মূল্য ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।

তবে আর্থিক মূল্যের বিচারে সবার ওপরে রয়েছে ১০০০ টাকার নোট। জুন মাস শেষে বাজারে থাকা এই নোটের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০৩ কোটি ৭৮ লাখ ৮৫ হাজার, যার মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

দুর্লভ ২০০ টাকা, তুলনামূলক বেশি ১০০ টাকা

বাজারে প্রচলিত নোটের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে কম ২০০ টাকার মূল্যমানের নোট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, জুনের হিসাবে বাজারে এই নোটের সংখ্যা ছিল ৫২ কোটি ৮৯ লাখ ২ হাজার ৩৪৯টি, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা।

এর তুলনায় ১০০ টাকার নোট সংখ্যায় প্রায় দ্বিগুণ। বাজারে এই নোটের সংখ্যা প্রায় ১১৭ কোটি ১৮ লাখ ৮৬ হাজার, যার মোট আর্থিক মূল্যমান ১১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাজারে বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের আধিক্য বা স্বল্পতা নির্ধারিত হয় মূলত জনগণের দৈনন্দিন চাহিদা, নোটের হাতবদলের গতি, স্থায়িত্ব এবং ছাপার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। প্রয়োজন অনুযায়ী কোন মূল্যমানের নোট কত পরিমাণে ছাপাতে হবে, তা নিজস্ব জরিপ ও হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে ঠিক করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

“বর্তমানে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের তুলনায় ছোট মূল্যমানের নোট সংখ্যায় কম। ছোট নোটের মধ্যে ২০ ও ১০০ টাকার নোট কাগজের অভাবে ঠিক সময়ে চাহিদা অনুসারে ছাপানো যায়নি।”
আরিফ হোসেন খান, মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বড় মূল্যমানের নোটের চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় দৈনন্দিন কেনাকাটাতেই এখন ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বেশি প্রয়োজন হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, এক কেজির বেশি ওজনের ব্রয়লার মুরগি কিনতেই এখন ২০০ টাকার বেশি খরচ হয়। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথে সাধারণত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটই সরবরাহ করা হয়, এবং বড় অঙ্কের লেনদেনেও এই দুই নোটের ব্যবহার বেশি।

১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটের হালচাল

১, ২ ও ৫ টাকার কাগুজে নোট এখন বাজারে প্রায় নেই বললেই চলে। এসবের ধাতব মুদ্রাও মানুষ সাধারণত পকেটে রাখতে চান না। ফলে বাস্তবে বাজারে প্রথম কার্যকর কাগুজে নোট বলা যায় ১০ টাকাকেই। রিকশাভাড়া, চা-নাশতার দোকান কিংবা বাসভাড়ার মতো ছোট লেনদেনে সবচেয়ে বেশি হাতবদল হয় এই নোটের।

দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনাকাটাতেও ২০ ও ৫০ টাকার নোটের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য, যদিও আর্থিক মূল্যমানে এদের অবদান তুলনামূলক কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বাজারে থাকা মোট ৯৬৬ কোটি ৫৪ লাখের বেশি নোটের মধ্যে প্রায় ৩২৩ কোটি নোট ১০, ২০ ও ৫০ টাকা মূল্যমানের। তবে আর্থিক মূল্যে এই তিন ধরনের নোট মিলিয়ে মোট মূল্য মাত্র ৭ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা।

বিস্তারিত হিসাবে, বাজারে ১০ টাকার নোটের সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি, ২০ টাকার নোট প্রায় ৯৪ কোটি এবং ৫০ টাকার নোট ৭৯ কোটির বেশি।

পুরোনো, ছেঁড়া নোটে ভোগান্তি

বাজারে চলমান নোটের একটি বড় অংশ এখন যথেষ্ট পুরোনো হয়ে পড়েছে। যথাসময়ে পুরোনো নোট প্রত্যাহার করে নতুন নোট সরবরাহ করতে না পারায় ছেঁড়া, ফাটা ও জীর্ণ নোট নিয়ে লেনদেনে প্রায়ই ভোগান্তির মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের ভাষ্যে, ছোট মূল্যমানের নোট, বিশেষ করে ২০ ও ১০০ টাকার নোট কাগজের সরবরাহ-সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী ঠিক সময়ে ছাপানো সম্ভব হয়নি। এদিকে ১০ টাকার নোট এত বেশি হাতবদল হয় যে দ্রুত ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে পড়ে, অথচ নতুন নোট বাজারে আসতে খানিকটা সময় লেগে যায়। এসব কারণ মিলিয়েই ছোট মূল্যমানের নোটের সংখ্যা তুলনামূলক কমে গেছে বলে জানান তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কাঁচামালের দাম, পরিবহন খরচ ও ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক নোট ছাপানোর খরচও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নগদ লেনদেনের পরিবর্তে মানুষ যেন ডিজিটাল লেনদেনে বেশি অভ্যস্ত হন, সেটিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছে বাংলা কিউআর কোড ব্যবস্থা। তাঁর ভাষ্যে, ডিজিটাল লেনদেনের প্রবণতা বাড়লে নোট ছাপানোর খরচও ধীরে ধীরে কমে আসবে।

নোটের বিপরীতে জামানত কীভাবে রাখা হয়

কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলেই ইচ্ছেমতো নতুন নোট ছাপিয়ে বাজারে ছাড়তে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২-এর ৩০ ধারা অনুযায়ী, বাজারে যে পরিমাণ নোট ছাড়া হয়, তার সমমূল্যের ভৌত ও আর্থিক সম্পদ জামানত হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব সংরক্ষণে রাখতে হয়।

বর্তমানে বাজারে থাকা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার নোটের বিপরীতে সমপরিমাণ মূল্যবান সম্পদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সংরক্ষিত আছে। এই সম্পদের মধ্যে রয়েছে সোনা, রুপা, বৈদেশিক মুদ্রা, সরকারি সিকিউরিটিজ এবং ধাতব মুদ্রা।

এই জামানতের সবচেয়ে বড় অংশ অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা, যার পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা মোট জামানতের প্রায় ৮১ শতাংশ।

জামানতের দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশ সরকারের ইস্যু করা ট্রেজারি বিল ও বন্ড, যার পরিমাণ ৪৫ হাজার ৯৯৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। সরকারকে দেওয়া ঋণের বিপরীতে এসব সিকিউরিটিজ গ্যারান্টি সম্পদ হিসেবে জমা রাখা হয়।

কাগুজে নোটের বিপরীতে সোনা রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অন্যতম পুরোনো ও বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক পদ্ধতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বর্তমানে ২১ হাজার ৭৩৪ কোটি ১১ লাখ টাকা মূল্যের সোনা এবং ১২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যের রুপা রয়েছে, যা মোট জামানতের প্রায় ৬ শতাংশ।

এ ছাড়া বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক বা সরকারি সংস্থাকে দেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ ও অগ্রিম সুবিধার একটি অংশও জামানতের ব্যাকআপ হিসেবে গণ্য হয়, যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। বাজারে থাকা ১, ২ ও ৫ টাকার ধাতব মুদ্রার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সংরক্ষিত অংশও নোটের ব্যাকআপ হিসেবে হিসাব করা হয়, যার পরিমাণ ৪৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট, দেশের নগদ অর্থনীতিতে বড় মূল্যমানের নোটের আধিপত্য ক্রমেই বাড়ছে যার পেছনে মূল্যস্ফীতি ও লেনদেনের ধরন পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। একই সঙ্গে ছোট নোটের সরবরাহ-সংকট ও পুরোনো নোট প্রতিস্থাপনে বিলম্ব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আরও