×
×
Saturday, 12 September, 2026, 8:14 am


বেতন বাড়ছে বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতনভোগী প্রধানমন্ত্রীর

১৫ বছর পর সিঙ্গাপুরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন; বাড়তি অর্থ দাতব্য কাজে দেওয়ার ঘোষণা লরেন্স ওংয়ের।

সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের বার্ষিক বেতন এক লাফে প্রায় ৬৪ শতাংশ বাড়ছে। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে তার বার্ষিক বেতন প্যাকেজ দাঁড়াবে ৩৬ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ২৮ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। বর্তমানে তার বার্ষিক বেতন প্যাকেজ প্রায় ২২ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার বা ১৭ লাখ মার্কিন ডলার।

অর্থাৎ বেতন প্যাকেজে যোগ হচ্ছে প্রায় ১৪ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার, যা প্রায় ১১ লাখ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। নতুন কাঠামো আগামী ১৫ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।

স্বাধীন কমিটির সুপারিশে বেতন পুনর্নির্ধারণ

সিঙ্গাপুর সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক পদধারীদের বেতন কাঠামো পর্যালোচনার জন্য গঠিত একটি স্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রায় ১৫ বছর পর দেশটির রাজনৈতিক বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের সংশোধন করা হলো।

সরকারের যুক্তি, সময়ের সঙ্গে বেসরকারি খাত, সরকারি প্রশাসন ও অন্যান্য পেশায় বেতন বেড়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক পদধারীদের বেতন দীর্ঘ সময় ধরে একই কাঠামোয় থাকায় তা বর্তমান বাস্তবতার তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে।

সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক বেতন কাঠামোয় মন্ত্রীদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ উপার্জনকারী ১ হাজার নাগরিকের মধ্যম আয়ের একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চমার্ক ব্যবহার করা হয়। জনসেবার স্বাতন্ত্র্য বিবেচনায় সেই বেঞ্চমার্কে ৪০ শতাংশ ছাড়ও রাখা হয়।

নতুন কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রীর বেতন ৩৬ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার

নতুন ব্যবস্থায় একজন MR4 গ্রেডের মন্ত্রীর বার্ষিক বেঞ্চমার্ক বেতন ১১ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার থেকে বেড়ে ১৮ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার করার সুপারিশ গ্রহণ করেছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর বেতন কাঠামো MR4 বেঞ্চমার্কের দ্বিগুণ। ফলে নতুন বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর বার্ষিক বেতন প্যাকেজ হবে ৩৬ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার। সরকারি হিসাবে এই প্যাকেজের মধ্যে ১৩তম মাসের বেতন, বার্ষিক পরিবর্তনশীল অংশ এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত হলে জাতীয় বোনাসও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর হিসাব অনুযায়ী, নতুন প্যাকেজের মূল্য প্রায় ২৮ লাখ মার্কিন ডলার। এর ফলে লরেন্স ওং বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের তালিকায় শীর্ষস্থান আরও দৃঢ় করছেন।

কেন এত বেশি বেতন?

সিঙ্গাপুর সরকার বহু বছর ধরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বেতনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। সরকারের যুক্তি হলো, রাজনীতিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে হলে তাদের বেসরকারি খাতের সঙ্গে তুলনাযোগ্য একটি উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে।

লরেন্স ওংও পার্লামেন্টে বলেছেন, বিষয়টি শুধু বর্তমান মন্ত্রীদের বেতন বাড়ানোর প্রশ্ন নয়; বরং ভবিষ্যতে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্য ও দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি ও ধরে রাখার সক্ষমতার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত।

সরকারের আরেকটি যুক্তি হলো, উচ্চ বেতন রাজনৈতিক পদে দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই যুক্তি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে, বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক নেতাদের আয় সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় অনেক বেশি।

সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় বিশাল ব্যবধান

সিঙ্গাপুরে রাজনৈতিক নেতাদের বেতন দীর্ঘদিন ধরেই জনআলোচনার বিষয়। প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং নিজেও স্বীকার করেছেন, সাধারণ নাগরিকদের আয়ের তুলনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারিশ্রমিক অনেক বেশি হওয়ায় জনগণের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরের মধ্যম মাসিক আয় ছিল ৫,৭৭৫ সিঙ্গাপুর ডলার। এর বিপরীতে নতুন কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রীর বার্ষিক প্যাকেজ হবে ৩৬ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার। এই বিশাল ব্যবধানই বেতন বৃদ্ধিকে দেশটিতে একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করেছে।

ওং পার্লামেন্টে বলেন, রাজনৈতিক বেতন একটি কঠিন ও আবেগপূর্ণ বিষয়। তবে তার মতে, শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হওয়া উচিত—সিঙ্গাপুরের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় মানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশটি ধরে রাখতে পারবে কি না।

পুরো বেতন বৃদ্ধি দান করবেন লরেন্স ওং

বেতন বৃদ্ধির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

তিনি জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছর তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকলে বেতন বৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত অর্থ তিনি পাবেন, তার পুরোটা উপযুক্ত জনকল্যাণমূলক কাজে দান করবেন।

সরকার তাকে নতুন কাঠামো অনুযায়ী পূর্ণ বেতন দেবে; এরপর তিনি বর্ধিত অংশটি দাতব্য ও জনকল্যাণমূলক কাজে দান করবেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং অন্য রাজনৈতিক পদধারীদের একই কাজ করতে তিনি প্রত্যাশা করছেন না।

মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে পুরো বেতন একবারে বাড়ছে না

প্রধানমন্ত্রীর বেতন কাঠামো সরাসরি নতুন বেঞ্চমার্কে নেওয়া হলেও বর্তমান মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না।

সিঙ্গাপুর সরকার জানিয়েছে, বর্তমান রাজনৈতিক পদধারীরা আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, কর্মদক্ষতা এবং সর্বশেষ বেতন সমন্বয়ের সময় বিবেচনায় নিয়ে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত এককালীন বেতন সমন্বয় পাবেন।

উদাহরণ হিসেবে সরকার জানিয়েছে, বর্তমানে ১১ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার বেঞ্চমার্ক বেতন পাওয়া MR4 গ্রেডের কোনো মন্ত্রী সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সমন্বয় পেলে তার বার্ষিক বেতন প্রায় ১২ লাখ সিঙ্গাপুর ডলারে উঠতে পারে।

এরপর নতুন ১৮ লাখ ডলারের বেঞ্চমার্কে একবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আর কোনো বিশেষ সমন্বয় করা হবে না। ভবিষ্যতের বেতন বৃদ্ধি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কর্মদক্ষতা ও দায়িত্বের পরিমাণের ওপর।

মন্ত্রীদের বেতন কাঠামোতেও পরিবর্তন

নতুন ব্যবস্থায় মন্ত্রীদের বেতন গ্রেডের কাঠামোও কিছুটা সরল করা হচ্ছে। MR2 ও MR3 গ্রেড একীভূত করে মোট মন্ত্রী পর্যায়ের গ্রেড চারটি থেকে কমিয়ে তিনটি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রতিটি গ্রেডে বেতনের পরিসর আরও বিস্তৃত করা হবে। এর ফলে দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে একই গ্রেডের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেতনের পার্থক্য রাখার সুযোগ বাড়বে।

সরকারের প্রত্যাশা, বর্তমান মেয়াদ শেষে MR4 গ্রেডে থাকা অধিকাংশ মন্ত্রী নতুন বেতনসীমার নিম্ন প্রান্তে থাকবেন, যার পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার। বিশেষভাবে ভালো কর্মদক্ষতা দেখানো বা বেশি দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রীরা একই গ্রেডে উচ্চতর বেতন পেতে পারেন অথবা উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হতে পারেন।

এমপিদের ভাতাও বাড়ছে

শুধু প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বেতন নয়, সিঙ্গাপুরের সংসদ সদস্যদের মাসিক ভাতাও বাড়ানো হচ্ছে।

১৫ অক্টোবর থেকে সাধারণ সংসদ সদস্যদের মাসিক ভাতা ১৩,৭৫০ সিঙ্গাপুর ডলার থেকে বেড়ে ১৮,৫০০ সিঙ্গাপুর ডলার হবে। নন-constituency MPs এবং Nominated MPs-এর ভাতাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি, পার্লামেন্টের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বেতনও সংশোধিত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করা হবে।

১৫ বছর পর কেন এখন এই পরিবর্তন?

সিঙ্গাপুরের বর্তমান রাজনৈতিক বেতন কাঠামো মূলত ২০১২ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়। ২০১৭ সালে স্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি বেতন কাঠামোতে সমন্বয়ের সুপারিশ করলেও তখন সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। ২০২৩ সালে আরেকটি পর্যালোচনার কথা থাকলেও সেটিও পিছিয়ে যায়।

ফলে প্রায় ১৫ বছর ধরে রাজনৈতিক পদধারীদের বেতন কাঠামোর মূল বেঞ্চমার্ক অপরিবর্তিত ছিল। এ সময় বেসরকারি খাত ও অন্যান্য সরকারি পেশায় পারিশ্রমিক বাড়লেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেতন একই কাঠামোয় ছিল।

এবার সরকার সেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে ‘উচ্চ বেতন বনাম ভালো শাসন’

সিঙ্গাপুরের নতুন বেতন কাঠামো আবারও একটি পুরোনো বিতর্ক সামনে নিয়ে এসেছে যোগ্য ও দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে কি বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বেতন প্রয়োজন?

সরকারের অবস্থান স্পষ্ট: প্রতিযোগিতামূলক বেতন প্রতিভাবান মানুষকে রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভালো প্রশাসন ও শাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের আয় যখন রাজনৈতিক নেতাদের তুলনায় অনেক কম, তখন এত বড় বেতন ব্যবধান সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য।

এই বিতর্কের মধ্যেই সিঙ্গাপুর তার রাজনৈতিক বেতন কাঠামো নতুন করে সাজিয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যালোচনার …

আরও