এআই খাতে নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কায় বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধস, একদিনে কমল ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি খাতে সম্ভাব্য কঠোর নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কায় বিশ্ব শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ায় একদিনেই কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে শুরু হওয়া এই নেতিবাচক প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া ও ইউরোপের বাজারেও। এতে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির ৬ নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার নাসডাকের সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। এর ফলে একদিনেই নাসডাকের বাজারমূল্য থেকে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান শেয়ারসূচকেও উল্লেখযোগ্য পতন ঘটে।
বাজারের এই অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। অ্যাপল, এনভিডিয়া, টেসলাসহ ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ নামে পরিচিত সাতটি বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি কমে যায়। এর মধ্যে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম ৯ শতাংশের বেশি পড়ে।
এদিকে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন টেসলা ও স্পেসএক্সের শেয়ারমূল্যেও বড় পতন দেখা যায়। টেসলার শেয়ার প্রায় ১১ শতাংশ এবং স্পেসএক্সের শেয়ার প্রায় ৮ শতাংশ কমে যায়। এতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্যেও কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এই দরপতনের প্রভাব শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এশিয়ার শেয়ারবাজারেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাপানের নিক্কেই সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে লেনদেন শেষ করে। দেশটির মেমোরি চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়া এবং প্রযুক্তি সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক টোকিও ইলেকট্রনের শেয়ারেও বড় দরপতন দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ১০ শতাংশের বেশি কমে যায়। দেশটির প্রধান শেয়ারসূচক কসপিও উল্লেখযোগ্য পতনের মুখে পড়ে।
ইউরোপের শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুক্রবার লেনদেনের শুরুতে যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং জার্মানির ড্যাক্স সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়। তবে প্রযুক্তি খাতের ওপর তুলনামূলক কম নির্ভরশীল হওয়ায় ইউরোপের বাজারে পতনের মাত্রা যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার তুলনায় কিছুটা কম ছিল।
এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর চিপ এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা কখন আসবে, কিংবা আদৌ সেই পরিমাণ মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে কি না—তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পর এআই প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ নির্বাচনী প্রচারণায় এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছিল।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এজ বেলের গবেষণা বিভাগের প্রধান ড্যান কোটসওয়ার্থের মতে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি কমে যেতে পারে এবং এআই খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে এমন আশঙ্কাও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি মনে করেন, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারমূল্য ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। এখন সেই অগ্রগতির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এআই খাতে বিনিয়োগের প্রকৃত মুনাফা, সরকারি নীতিমালা এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।