×
×
Friday, 6 November, 2026, 9:40 pm


শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা পূরণে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার ওপর গুরুত্ব

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার তাগিদ চট্টগ্রামে বিআইএমের অংশীজনদের মতবিনিময় সভায়

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিল্পায়নের বিস্তার এবং কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তবে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদ অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রার্থী কর্মবাজারের উপযোগী হয়ে উঠতে পারেন না। পরিবর্তিত কর্মপরিবেশে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, নেতৃত্বের সক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

তাঁরা মনে করেন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন এবং নিয়োগদাতারাও তাঁদের প্রতিষ্ঠানের উপযোগী জনবল খুঁজে পেতে সক্ষম হবেন।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) চট্টগ্রামে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) চট্টগ্রাম ক্যাম্পাসে আয়োজিত অংশীজনদের এক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। সভায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের পরিবর্তিত চাহিদা, দক্ষ জনবল তৈরির প্রয়োজনীয়তা, ব্যবস্থাপনা শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. সলিম উল্লাহ। সভায় সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করেন বিআইএমের পিজিডি কোর্সের এস এম আরিফুল ইসলাম। এ সময় বিআইএম চট্টগ্রাম ক্যাম্পাসের উপপরিচালক লামিয়া ফারহাও উপস্থিত ছিলেন।

কর্মবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় জরুরি

বর্তমান বিশ্বে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, উৎপাদনব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক পরিবেশের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের তুলনায় ভিন্ন ধরনের দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজছে। একসময় কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই চাকরির ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু এখন শুধু সনদনির্ভর যোগ্যতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে এমন কর্মীর প্রয়োজন বাড়ছে, যাঁরা নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন। প্রতিষ্ঠানের সমস্যা চিহ্নিত করা, তথ্য বিশ্লেষণ, কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দল পরিচালনা এবং প্রযুক্তির সাহায্যে কাজের গতি ও মান বাড়ানোর সক্ষমতা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যবস্থাপনা শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যবই বা শ্রেণিকক্ষের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। তাঁদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, উৎপাদন প্রক্রিয়া, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পরিকল্পনা, বিপণন কৌশল এবং সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করতে হবে।

অংশীজনদের মতবিনিময় সভায়ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও চাহিদা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, সেগুলো প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুতে প্রতিফলিত হলে প্রশিক্ষণার্থীরা বাস্তব সমস্যার সমাধান সম্পর্কে ধারণা পাবেন। এতে প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের প্রস্তুতিও আরও শক্তিশালী হবে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা। অনেক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা শেখানো হয়, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তার প্রয়োগের সুযোগ বা চাহিদা ভিন্ন হতে পারে। ফলে শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরিতে প্রবেশের পর নতুন করে অনেক কিছু শিখতে হয়। এতে কর্মীর ব্যক্তিগত প্রস্তুতির পাশাপাশি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানেরও অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, কোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, ভবিষ্যতে কোন পেশার চাহিদা তৈরি হতে পারে এবং কর্মীদের কোন বিষয়ে অধিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সাজানো যেতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে উৎপাদন খাতের কথা বলা যায়। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির শুধু যন্ত্র পরিচালনার জ্ঞান থাকলেই চলবে না। তাঁকে উৎপাদনের মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ, সময় ব্যবস্থাপনা, দলগত কাজ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে। একইভাবে বিপণন খাতে কর্মরত ব্যক্তির জন্য পণ্য সম্পর্কে ধারণার পাশাপাশি বাজার বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা, যোগাযোগ এবং ডিজিটাল বিপণন সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

সেবা খাতেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটন ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মীর চাহিদা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীদের দায়িত্ব পালনের ধরনেও পরিবর্তন আসছে।

তাই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থির করে না রেখে নিয়মিত পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা প্রয়োজন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা এবং প্রশিক্ষণ শেষে কর্মীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা যাচাই করা যেতে পারে।

নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব

একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু তার আর্থিক সক্ষমতা বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে, কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর এবং নেতৃত্ব কতটা দূরদর্শী, তার ওপরও প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি নির্ভর করে।

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশে নেতৃত্বের ধারণাও বিস্তৃত হয়েছে। নেতৃত্ব মানে শুধু অধীনস্থ কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া নয়। বরং একটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য নির্ধারণ, কর্মীদের সক্ষমতা চিহ্নিত করা, দায়িত্ব বণ্টন, মতামত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামগ্রিক যোগ্যতাই আধুনিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মতবিনিময় সভায় কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্বের দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ধরনের দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতিভিত্তিক অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং দলগত কাজ, কেস স্টাডি, সমস্যা বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলন তাঁদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

একজন ব্যবস্থাপককে অনেক সময় সীমিত সময় ও সম্পদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখনো কর্মীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, কখনো উৎপাদন বা সেবা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হয়, আবার কখনো বাজারের পরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা সংশোধন করতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে বিচক্ষণতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়।

সুতরাং ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য তরুণ কর্মীদের প্রস্তুত করাও সহজ হবে।

সমস্যা সমাধান ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ

প্রতিযোগিতামূলক কর্মবাজারে একজন কর্মীর মূল্যায়ন এখন শুধু তিনি কতটুকু কাজ করতে পারেন, তার ওপর সীমাবদ্ধ নয়। বরং তিনি কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে কীভাবে তা বিশ্লেষণ করেন এবং কার্যকর সমাধান বের করতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন আলাদা। ফলে সব সমস্যার সমাধান একই নিয়মে করা সম্ভব নয়। একজন দক্ষ কর্মীকে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা এবং ফলাফল মূল্যায়নের সক্ষমতা।

অন্যদিকে উদ্ভাবনী চিন্তা প্রতিষ্ঠানকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিতে পারে। প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে কাজের নতুন কৌশল উদ্ভাবন, উৎপাদন ব্যয় কমানো, গ্রাহকসেবার মান বাড়ানো এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সৃজনশীল চিন্তার ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত জনবল ও আর্থিক সম্পদ ব্যবহার করে কীভাবে বেশি উৎপাদনশীলতা অর্জন করা যায়, সে বিষয়ে কর্মীদের প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন।

এ কারণে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সমস্যা সমাধান ও উদ্ভাবনী চিন্তার অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। প্রশিক্ষণার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তাঁরা শুধু নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে দায়িত্বশীলভাবে সমস্যার সমাধানে অংশ নিতে পারেন।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা দক্ষতার বিকাশ

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি কর্মক্ষেত্রের প্রচলিত ব্যবস্থাপনাকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে। তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ, যোগাযোগ, হিসাবরক্ষণ, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত জ্ঞান আর অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি মৌলিক প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

একজন ব্যবস্থাপককে এখন শুধু প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন জানলেই চলে না। তাঁকে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয়। ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন, কর্মীদের কাজ পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করতে হয়।

এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রসার ব্যবস্থাপনা শিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব প্রযুক্তির কার্যকর ও দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।

তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়টিও প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া উচিত। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে গিয়ে যেন প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে কর্মীদের সচেতন করা জরুরি।

মতবিনিময় সভায় প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি আলোচনায় আসা বর্তমান কর্মবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে এসব বিষয় গুরুত্ব পেলে কর্মীরা আধুনিক কর্মপরিবেশে নিজেদের আরও দক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

বিআইএমের প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন কার্যক্রম

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট দেশের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মী ও পেশাজীবীদের ব্যবস্থাপনাগত জ্ঞান এবং দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।

বিআইএম পরিচালিত পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা বা পিজিডি কোর্স, পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কর্মজীবীদের জন্য এসব প্রশিক্ষণ নিজেদের পেশাগত জ্ঞান হালনাগাদ এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত কোর্সতথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ক্যাম্পাসে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহব্যবস্থাপনা বিষয়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্স রয়েছে। এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক সংস্থা এবং বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ।

তবে কর্মবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব কোর্সের পাঠ্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন, ডিজিটাল বিপণন, আর্থিক বিশ্লেষণ এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয়গুলো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন অনুসারে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও নিয়োগদাতারা সরাসরি জানেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কোন ধরনের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হলে কোর্সগুলো আরও বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রশিক্ষণকে সনদনির্ভর নয়, দক্ষতানির্ভর করার প্রয়োজন

প্রশিক্ষণের সাফল্য শুধু কতজন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিলেন বা কতজন সনদ পেলেন, তার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত নয়। বরং প্রশিক্ষণ শেষে একজন ব্যক্তি তাঁর কর্মক্ষেত্রে কতটা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন, সেটিই হওয়া উচিত কার্যকারিতা যাচাইয়ের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড।

একটি মানসম্মত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীর জ্ঞান, ব্যবহারিক দক্ষতা, আচরণগত সক্ষমতা এবং কর্মক্ষেত্রে সমস্যা মোকাবিলার যোগ্যতার উন্নতি ঘটানো সম্ভব। এ জন্য প্রশিক্ষণের আগে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতার ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের অর্জন মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ প্রদানকারীদেরও নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় আনা উচিত। প্রশিক্ষকের যোগ্যতা, পাঠ্যক্রমের মান, ব্যবহারিক অনুশীলনের সুযোগ, প্রশিক্ষণ উপকরণ এবং অংশগ্রহণকারীদের মতামত বিবেচনা করে প্রশিক্ষণের মান উন্নত করা যেতে পারে।

বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ ও কাজের ধরন সম্পর্কে প্রশিক্ষকদের বাস্তব ধারণা থাকা প্রয়োজন। এতে প্রশিক্ষণার্থীরা তাঁদের দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।

প্রশিক্ষণের পর কর্মীদের কর্মদক্ষতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে, প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে কতটা প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কোন কোন বিষয়ে আরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

[atn_photocard]
আরও