আইন আদালত
অবহেলা (Negligence) সম্পর্কিত ধারণার বিশ্লেষণ
এলএলবি প্রথম বর্ষ
আইনশাস্ত্রে অবহেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ধারণা। কোনো ব্যক্তি আইনগতভাবে যে দায়িত্ব পালনে বাধ্য, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করা এবং এর ফলে অন্য কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে সাধারণভাবে অবহেলা বলা হয়। চিকিৎসাক্ষেত্রে একজন ডাক্তার রোগীর জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যদি যুক্তিসংগত সতর্কতা ও পেশাগত দক্ষতা প্রয়োগে ব্যর্থ হন এবং এর ফলে রোগীর শারীরিক, মানসিক বা আর্থিক ক্ষতি হয়, তাহলে তা চিকিৎসাগত অবহেলা (Medical Negligence) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
১. অবহেলার সংজ্ঞা ও ধারণা
অবহেলা (Negligence) বলতে বোঝায়, কোনো ব্যক্তি এমন একটি কাজ করতে ব্যর্থ হওয়া, যা একজন যুক্তিসংগত ও সতর্ক ব্যক্তি একই পরিস্থিতিতে করতেন; অথবা এমন কোনো কাজ করা, যা একজন সতর্ক ব্যক্তি করতেন না।
আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে অবহেলা হলো এমন একটি দেওয়ানি অন্যায় (Civil Wrong), যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি উপযুক্ত ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন।
অবহেলার মূল বৈশিষ্ট্য:
1\. দায়িত্বের অস্তিত্ব (Duty of Care): অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর অন্য ব্যক্তির প্রতি আইনগত দায়িত্ব থাকতে হবে।
2\. দায়িত্ব লঙ্ঘন (Breach of Duty): দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অসতর্কতা থাকতে হবে।
3\. কার্যকারণ সম্পর্ক (Causation): দায়িত্ব লঙ্ঘনের সঙ্গে ক্ষতির প্রত্যক্ষ বা আইনগতভাবে স্বীকৃত সম্পর্ক থাকতে হবে।
4\. ক্ষতি (Damage): অবহেলার কারণে বাস্তব ক্ষতি সংঘটিত হতে হবে।
এই চারটি উপাদান চিকিৎসাগত অবহেলা প্রমাণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২. চিকিৎসাগত অবহেলা (Medical Negligence) কী?
চিকিৎসাগত অবহেলা বলতে বোঝায়, একজন চিকিৎসক তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, সতর্কতা ও যুক্তিসংগত চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করতে ব্যর্থ হওয়া, যার ফলে রোগীর ক্ষতি হয়।
তবে চিকিৎসার পরও রোগী সুস্থ না হলে কিংবা অস্ত্রোপচার ব্যর্থ হলেই চিকিৎসকের অবহেলা প্রমাণিত হয় না। চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর দায়িত্ব লঙ্ঘন এবং সেই লঙ্ঘনের সঙ্গে রোগীর ক্ষতির সম্পর্ক প্রমাণ করতে হয়।
৩. একজন ডাক্তারের রোগীর প্রতি আইনগত দায়িত্ব
একজন চিকিৎসকের রোগীর প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। যথা—
1\. সঠিক রোগ নির্ণয়: রোগীর শারীরিক অবস্থা, উপসর্গ ও চিকিৎসার ইতিহাস যথাযথভাবে পরীক্ষা করা।
2\. যথাযথ চিকিৎসা প্রদান: নিজের পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রচলিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের গ্রহণযোগ্য মান অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া।
3\. রোগীকে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান: রোগের অবস্থা, চিকিৎসাপদ্ধতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বিকল্প চিকিৎসা সম্পর্কে রোগীকে অবহিত করা।
4\. সম্মতি গ্রহণ: অস্ত্রোপচার বা ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসার আগে রোগীর অবগত সম্মতি (Informed Consent) গ্রহণ করা; জরুরি অবস্থায় আইনসম্মত ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
5\. গোপনীয়তা রক্ষা: রোগীর ব্যক্তিগত ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখা।
6\. জরুরি চিকিৎসা প্রদান: জরুরি অবস্থায় রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া অথবা উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
7\. রেফার করার দায়িত্ব: নিজের দক্ষতা বা চিকিৎসাসুবিধার বাইরে কোনো রোগের ক্ষেত্রে যথাযথ বিশেষজ্ঞের কাছে রোগীকে পাঠানো।
৪. চিকিৎসকের অবহেলার কয়েকটি উদাহরণ
নিম্নলিখিত কাজগুলো পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে চিকিৎসাগত অবহেলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—
* রোগীর গুরুতর উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না করা।
* ভুল রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত সতর্কতা অবলম্বন না করা।
* ভুল ওষুধ বা ভুল মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ করা।
* অস্ত্রোপচারের আগে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও পরীক্ষা না করা।
* রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও যথাসময়ে ব্যবস্থা না নেওয়া।
* জরুরি অবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক অযৌক্তিকভাবে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করা।
* রোগীর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: চিকিৎসকের প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত বা চিকিৎসায় ব্যর্থতা আইনগত অবহেলা নয়। একজন যুক্তিসংগত দক্ষ চিকিৎসক একই পরিস্থিতিতে কী করতেন, সেটিই বিচার করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
৫. বাংলাদেশে চিকিৎসাগত অবহেলা সম্পর্কিত আইন ও বিধিবিধান
বাংলাদেশে চিকিৎসাগত অবহেলার জন্য পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ একটি একক আইন নেই। তবে বিভিন্ন প্রচলিত আইনের অধীনে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রধান আইনগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
ক. দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (The Penal Code, 1860)
চিকিৎসকের অবহেলার ফলে রোগীর মৃত্যু বা শারীরিক ক্ষতি হলে দণ্ডবিধির কয়েকটি ধারা প্রয়োগ করা যেতে পারে।
১. ধারা ৩০৪A — অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু (Causing Death by Negligence)
কোনো ব্যক্তি বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির মৃত্যু ঘটালে এবং তা অপরাধমূলক নরহত্যার পর্যায়ে না পড়লে এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
শাস্তি:
* সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড।
* অথবা অর্থদণ্ড।
* অথবা উভয় দণ্ড।
চিকিৎসকের গুরুতর অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু হলে প্রমাণ ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে এই ধারা প্রয়োগ করা যেতে পারে। 304A. Causing death by negligence
২. ধারা ৩৩৬ — জীবন বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন করা
কোনো ব্যক্তি বেপরোয়াভাবে বা অবহেলার সঙ্গে এমন কাজ করলে, যাতে অন্যের জীবন বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিপন্ন হয়, এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
শাস্তি:
* সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড।
* অথবা ২৫০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
* অথবা উভয় দণ্ড।
৩. ধারা ৩৩৭ — অবহেলার কারণে সাধারণ আঘাত
কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের কারণে অন্য কেউ আহত হলে এই ধারা প্রয়োগ করা যেতে পারে।
শাস্তি:
* সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড।
* অথবা ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
* অথবা উভয় দণ্ড।
৪. ধারা ৩৩৮ — অবহেলার কারণে গুরুতর আঘাত
অবহেলামূলক কাজের কারণে কারও গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হলে এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
শাস্তি:
* সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড।
* অথবা ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
* অথবা উভয় দণ্ড। Bangladesh Laws
খ. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯
এই আইন চিকিৎসাগত অবহেলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধারা ৫৩ — অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দ্বারা সেবা গ্রহণকারীর অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটানোর দণ্ড।
এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সেবা প্রদানকারী অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতার মাধ্যমে সেবা গ্রহণকারীর অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটালে তিনি—
* সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ডে;
* অথবা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে;
* অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
অতএব, অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট আইনগত শর্ত পূরণ করলে এই ধারার আওতায় আসতে পারেন। Bangladesh Laws
গ. বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০
এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) চিকিৎসকদের পেশাগত নিবন্ধন ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করে।
ধারা ২৩ — নিবন্ধন বাতিল ও রেজিস্টার থেকে নাম প্রত্যাহার।
এই ধারার অধীনে কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক আইন বা নির্ধারিত পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে কাউন্সিল তাঁর নিবন্ধন বাতিল করে রেজিস্টার থেকে নাম প্রত্যাহার করতে পারে।
অর্থাৎ, গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে পেশাগত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। Bangladesh Laws +1
ঘ. দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908)
চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর আর্থিক বা শারীরিক ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যেতে পারে।
* ধারা ৯ অনুযায়ী দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়ানি আদালতের রয়েছে, যদি আইন দ্বারা তা নিষিদ্ধ না হয়।
* দেওয়ানি মামলা দায়ের করে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যেতে পারে।
* রোগীর মৃত্যু হলে পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত নির্ভরশীল ব্যক্তিরাও প্রতিকার চাইতে পারেন। Bangladesh Laws +1
এক্ষেত্রে চিকিৎসকের দায়িত্ব লঙ্ঘন, ক্ষতি এবং উভয়ের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণ করতে হয়।
ঙ. চিকিৎসকের পেশাগত আচরণবিধি (Code of Medical Ethics)
বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের পেশাগত আচরণবিধি অনুযায়ী চিকিৎসকদের রোগীর প্রতি যথাযথ পেশাগত দায়িত্ব, সতর্কতা ও মানবিক আচরণ বজায় রাখতে হয়।
গুরুতর পেশাগত অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতা পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। cmc.gov.bd +1
৬. চিকিৎসকের অবহেলার বিরুদ্ধে রোগীর আইনগত প্রতিকার
কোনো রোগী চিকিৎসকের অবহেলার শিকার হলে তিনি কয়েকটি উপায়ে প্রতিকার চাইতে পারেন।
1\. BMDC-তে অভিযোগ: চিকিৎসকের পেশাগত অসদাচরণ বা দায়িত্বে গুরুতর অবহেলার বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলে অভিযোগ করা।
2\. জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিযোগ করা। এ আইনের ৬০ ধারা অনুযায়ী কারণ উদ্ভবের ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ করতে হয়।
3\. ফৌজদারি মামলা: অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যু বা শারীরিক ক্ষতি হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৩০৪A, ৩৩৬, ৩৩৭ ও ৩৩৮ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া।
4\. দেওয়ানি মামলা: রোগীর ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে মামলা করা।
5\. হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ: হাসপাতালের পরিচালনা কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৬৬ ধারা অনুযায়ী উপযুক্ত ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তা দেওয়ানি প্রতিকার চাইতে পারেন। আর্থিক মূল্যে নিরূপণযোগ্য ক্ষতির ক্ষেত্রে নিরূপিত ক্ষতির সর্বোচ্চ পাঁচগুণ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দাবির বিধান রয়েছে। Bangladesh Laws +1
৭. চিকিৎসাগত অবহেলা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ
চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেই তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হবেন না। অভিযোগকারীকে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
যেমন:
* চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন।
* হাসপাতালের ভর্তি ও ছাড়পত্র।
* রোগীর চিকিৎসার নথিপত্র।
* পরীক্ষাগারের রিপোর্ট।
* অস্ত্রোপচারের বিবরণ।
* চিকিৎসার বিল ও অর্থ পরিশোধের রসিদ।
* সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত।
* প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ।
এসব প্রমাণের মাধ্যমে চিকিৎসকের দায়িত্ব লঙ্ঘন এবং রোগীর ক্ষতির মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ।
৮. চিকিৎসাগত অবহেলা ও চিকিৎসার অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য
আইনগতভাবে এই দুটি বিষয় এক নয়।
চিকিৎসার অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল: একজন চিকিৎসক যথাযথ দক্ষতা, সতর্কতা ও নিয়ম অনুসরণ করে চিকিৎসা দেওয়ার পরও রোগীর মৃত্যু বা শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। এটি নিজে থেকেই অবহেলা প্রমাণ করে না।
চিকিৎসাগত অবহেলা: চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পেশাগত সতর্কতা ও দক্ষতা প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সেই ব্যর্থতার কারণে রোগীর ক্ষতি হয়েছে—এটি প্রমাণিত হলে চিকিৎসাগত অবহেলার দায় সৃষ্টি হতে পারে।
সুতরাং চিকিৎসার ফলাফল খারাপ হলেই চিকিৎসককে দায়ী করা যাবে না। বরং তাঁর দায়িত্ব পালনের মান ও অবহেলার সঙ্গে ক্ষতির সম্পর্ক বিচার করতে হবে।
৯. চিকিৎসাগত অবহেলা প্রতিরোধে করণীয়
চিকিৎসাগত অবহেলা প্রতিরোধে চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
* চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে।
* হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত করতে হবে।
* রোগীর অধিকার ও সম্মতি গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।
* চিকিৎসার সব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
* চিকিৎসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
* চিকিৎসাগত অবহেলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
* রোগীর অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
১০. উপসংহার
অবহেলা আইনশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও ব্যাপক। কারণ চিকিৎসকের সামান্য অসতর্কতা বা দায়িত্বহীনতা কখনো কখনো একজন মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে। একজন চিকিৎসক শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন না, তিনি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুদায়িত্বও বহন করেন।
তাই চিকিৎসকের অবহেলার কারণে রোগীর ক্ষতি হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও পেশাগত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের ন্যায়সংগত সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে চিকিৎসার স্বাভাবিক ঝুঁকি বা অনিবার্য ব্যর্থতার জন্য তাঁদের অন্যায়ভাবে দায়ী করা না হয়।
অতএব, রোগীর অধিকার সংরক্ষণ, চিকিৎসকের জবাবদিহি এবং উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য চিকিৎসাগত অবহেলার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।