আন্তর্জাতিক
দুর্গাপূজা উৎসবের রাতে শোকের ছায়া: হাসপাতালে মুখ্যমন্ত্রী
অষ্টমীর আগে বাংলার উৎসবমুখর আবহ মুহূর্তে বদলে গেল কান্নায়। নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আটক ১২, ঘোষিত হয়েছে ২৫ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ।
সপ্তমীর রাতে কলকাতার সবচেয়ে কালো অধ্যায়
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের সপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে ঘটে গেল এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও প্রায় ২৫ জন। শনিবার সন্ধ্যার এই ঘটনায় শহরজুড়ে আলোর রোশনাই আর জনস্রোতের উচ্ছ্বাস নিমেষে বদলে গেছে আর্তনাদ আর শোকে।
প্রশাসনিক সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ১৪ জন নারী। চারজন নাবালকের মধ্যে একজন শিশু। শনিবার রাত থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা কয়েক দফায় বদলেছে। প্রথমে ১৭ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল। পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ১৯ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেন। এই সংখ্যা আরও বদলাতে পারে, কারণ হাসপাতালে ভর্তি কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বাংলার দুর্গোৎসবের ইতিহাসে এমন প্রাণহানি আগে কখনও ঘটেনি বলে মনে করা হচ্ছে। শারদোৎসবের আনন্দের মাঝে এই বিপর্যয় শুধু একটি পরিবার বা একটি পাড়ার নয়, গোটা রাজ্যের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
সেদিন সন্ধ্যায় ঠিক কী ঘটেছিল
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রাণে বেঁচে ফেরা দর্শনার্থীদের বয়ান থেকে ঘটনার একটি মোটামুটি চিত্র উঠে এসেছে। সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানের মণ্ডপে ছিল উপচে পড়া ভিড়। মণ্ডপে ঢোকার প্রবেশপথটি ছিল সংকীর্ণ। সেই পথ দিয়ে একটানা দর্শনার্থী ঢুকতে থাকায় ভেতরে চাপ বাড়ছিল।
ঠিক তখনই নামে প্রবল বৃষ্টি। ভেজা থেকে বাঁচতে লাইনে দাঁড়ানো মানুষ মরিয়া হয়ে মণ্ডপের দিকে ছুটতে শুরু করেন। অভিযোগ, এই সময়ে পূজা উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে মাইকে একটি ঘোষণা করা হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা বাঁশি বাজিয়ে ভেতরে ঢোকার সংকেত দেন বলেও দাবি করেছেন অনেকে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও জানিয়েছেন, দুটি শোকার্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, ভিড়ের মধ্যে পূজা কমিটির ঘোষণার পরেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
মণ্ডপের ভেতরে আলো ছিল কম। অন্ধকারে মানুষ দিশা হারিয়ে বিভিন্ন অংশ টপকে নিরাপদ জায়গার খোঁজ করতে থাকেন। এর মধ্যেই ঠেলাঠেলি ও পায়ের চাপে ভেঙে পড়ে প্যান্ডেলের কৃত্রিম মেঝে। অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান। প্রাণ বাঁচাতে একে অপরকে ঠেলে সরানোর চেষ্টায় অন্যের পায়ের নিচে চাপা পড়েন অনেকেই। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়।
প্রথম উদ্ধারকাজ শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। পরে পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছান। রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় মোট ৩৫ জনকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ১৮ জনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল ছড়ানো জুতো, ব্যাগ আর প্যান্ডেলের ছেঁড়া কাপড়, যা সেই মুহূর্তের আতঙ্কের নীরব সাক্ষী।
হাসপাতালে মুখ্যমন্ত্রী, ইমার্জেন্সির সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনী
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাত ন’টার দিকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী। হাসপাতালের বাইরে স্বজনহারা মানুষের কান্না আর খোঁজখবরের আকুলতায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা রাত ন’টা থেকে হাসপাতালে রয়েছেন। প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাও উপস্থিত। তাঁর কথায়, দুর্ঘটনা কেন ঘটল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং যথাযথ তদন্ত হবে। তিনি জানান, ১২টি পরিবারের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। মৃতদের মধ্যে একটি পরিবার কলকাতার বাইরের বলেও জানা গেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত তথ্য জানার জন্য একটি টোল ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। নম্বরটি ১৮০০ ৩৪৫ ৫৬৭৮। স্বজনদের খোঁজ পেতে বা আহতদের তথ্য জানতে এই নম্বরে ফোন করা যাবে।
গাফিলতির অভিযোগ: আটক আয়োজক, নিরাপত্তারক্ষী ও কর্মীরা
ঘটনার পরেই পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১২ জনকে আটক করেছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন পূজার আয়োজক, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী এবং দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। প্রথম দিকে আটকের সংখ্যা কম বলে জানানো হলেও পরে তা বেড়ে ১২ হয়। লালবাজারের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ১৯ জনের মৃত্যু ও অন্তত ২৪ জন আহত হওয়ার প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে:
– পূজার দায়িত্ব ছিল অনভিজ্ঞ লোকজনের হাতে।
– যে বেসরকারি সংস্থা নিরাপত্তারক্ষী সরবরাহ করেছিল, সেটিও নতুন ও অভিজ্ঞতাহীন বলে অভিযোগ।
– উদ্বোধনের পর থেকেই ভিড় উপচে পড়লেও থানার তরফে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী চাওয়া হয়নি।
– মণ্ডপের ভেতরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ছিল না।
– সংকীর্ণ প্রবেশপথ দিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে লোক ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল।
পুলিশ ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, পূজা কমিটি সবকিছু গুরুত্ব দিয়ে দেখলে এই বিপদ এড়ানো যেত। আলো কম থাকাও দুর্ঘটনার একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, প্রতিটি পূজা কমিটিকে মনে রাখতে হবে, থিমের চেয়ে মানুষের জীবনের দাম অনেক বেশি।
তদন্তে সিট, হাইকোর্টকে চিঠি
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হবে। সেখানে এসটিএফ ও সিআইডি-সহ অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধি থাকবেন। পাশাপাশি তথ্যানুসন্ধানের জন্য কর্মরত কোনও বিচারপতিকে নিয়োগ করতে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখবেন। সরকারের দাবি, গাফিলতিতে জড়িত কেউই রেহাই পাবেন না।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দায় কার? আয়োজক কমিটির, নিরাপত্তা সংস্থার, স্থানীয় থানার, নাকি ভিড় নিয়ন্ত্রণের গোটা ব্যবস্থার? তদন্তের ফল বেরোলে তবেই এর স্পষ্ট উত্তর মিলবে। তবে প্রাথমিক তথ্যে যে সমন্বয়ের অভাব ও পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতির ছবি ফুটে উঠেছে, তা উপেক্ষা করার মতো নয়।
ক্ষতিপূরণ ও সরকারি সহায়তার ঘোষণা
হতাহতদের দেখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, রাজ্য সরকার প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ২৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেবে। পাশাপাশি প্রত্যেক পরিবারের একজন সদস্যকে দেওয়া হবে গ্রুপ ডি পর্যায়ের সরকারি চাকরি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে নিহতদের নিকটাত্মীয়দের জন্য দুই লাখ টাকা এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তার কথা জানানো হয়েছে।
কেন্দ্র থেকে বিরোধী শিবির, শোকপ্রকাশ সর্বস্তরে
ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সামাজিক মাধ্যমে জানান, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে প্রশাসন। শনিবারই তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। রবিবার রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল, কিন্তু এই বিপর্যয়ের পর সেসব বাতিল করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রবিবার হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করবেন। রাজ্যের মন্ত্রীদের সব কর্মসূচিও বাতিল করা হয়েছে।
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেন। তিনি প্রশাসনকে দ্রুত সব পদক্ষেপ নেওয়া ও আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার আর্জি জানান এবং ঘটনার তদন্তের দাবি তোলেন। কংগ্রেস কর্মীদের তিনি অসহায় মানুষের পাশে থাকতে বলেছেন।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর মর্মাহত হওয়ার কথা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, উৎসবে বেরিয়ে সাধারণ মানুষকে কেন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে। তাঁর বক্তব্য, মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনও অগ্রাধিকার হতে পারে না এবং যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী ঘটনাটিকে লজ্জা ও শোকের বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের নজর যেখানে মানুষের নিরাপত্তায় থাকার কথা ছিল, সেখানে অন্য বিষয়ে ব্যস্ত থাকার ছবিই দেখা গেছে।
উৎসবের আলোয় ছায়া, অন্য মণ্ডপেও সতর্কতা
পদপিষ্টের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শহরের বিভিন্ন ভিড়প্রবণ পূজামণ্ডপ রাতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শনিবারের জন্য আলিপুর সর্বজনীনের মণ্ডপ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। চোরবাগানের মণ্ডপ আপাতত পুরোপুরি বন্ধ।
যে শহর বছরভর এই কয়েকটি দিনের জন্য অপেক্ষা করে, সেই শহরের রাস্তায় এখন নেমে এসেছে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। অনেক পরিবার উৎসবের পরিকল্পনা বাতিল করেছে। যাঁরা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন, তাঁরা ফিরেছেন ভারী মনে।
নৈঃশব্দ্যের থিম, নীরব হয়ে গেল আনন্দ
এবারের চোরবাগান পূজা শুরু থেকেই আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। কমিটির হাতবদলের কারণে দ্বিতীয়বার খুঁটিপুজো করতে হয়েছিল। মণ্ডপসজ্জার দায়িত্ব পেয়েছিলেন শিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল। এবারের থিমের নাম ছিল ‘অ-রব’, যার অর্থ নৈঃশব্দ্য।
নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই থিমের মণ্ডপেই সপ্তমীর সন্ধ্যায় উঠল কান্নার রোল। যে নৈঃশব্দ্যকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার কথা ছিল, তা এখন বাস্তবে নেমে এসেছে শোকের অন্ধকারে।
বাংলার পূজার ইতিহাসে নজিরবিহীন
বাংলার দুর্গাপূজা ২০২১ সালে ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। কলকাতার পূজা এখন শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বিশ্বের অন্যতম বড় শিল্প ও সংস্কৃতির মেলা। প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ প্যান্ডেল ঘুরে দেখেন। নজরকাড়া থিম, আলোকসজ্জা আর শিল্পীদের কারুকাজ দেখতে ভিড় বাড়ে বছরের পর বছর।
বর্তমান ঘটনাটি প্রাণহানির বিচারে কলকাতার ইতিহাসে ভিড়-সংক্রান্ত অন্যতম বড় দুর্ঘটনা। ১৯৮০ সালের ১৬ আগস্ট ইডেন গার্ডেন্সে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের ডার্বি ম্যাচে দর্শকদের সংঘর্ষ ও ছোটাছুটিতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। চোরবাগানের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা তা ছাড়িয়ে গেছে।
ভারতের অন্য জায়গাতেও ধর্মীয় সমাবেশ ও বড় জমায়েতে পদপিষ্টের ঘটনা নতুন নয়। ২০১৭ সালে গঙ্গাসাগর মেলা থেকে ফেরার পথে জেটিতে ছয়জন বয়স্ক নারীর মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৬ সালে বারাণসীতে একটি ধর্মীয় সমাবেশে সেতুতে পদপিষ্ট হয়ে ২৪ জনের মৃত্যু হয়। সংবাদ সংস্থাগুলির বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে একই কথা: সংকীর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থানপথ, অতিরিক্ত ভিড় এবং আগাম নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থার অভাব এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।
ভিড় ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন: শিক্ষা নেওয়া হবে কি?
ভিড় ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় জমায়েতে বিপদ তৈরি হয় তিনটি জায়গায়: প্রবেশ, ভেতরের চলাচল ও বের হওয়ার পথ। কোনও একটিতে গোলমাল হলে অল্প সময়েই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। ঘন ভিড়ের মধ্যে একবার কেউ পড়ে গেলে পেছন থেকে আসা চাপে বাকিরাও টাল সামলাতে পারেন না। এমন ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রধান কারণ হয় শ্বাসরোধ ও বুকে চাপ। ভারতের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষও বড় জমায়েতের জন্য ভিড় ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকা তৈরি করেছে।
চোরবাগানের ঘটনা বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে:
– প্রতিটি বড় পূজামণ্ডপে ভিড়ের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে কি?
– প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য আলাদা, প্রশস্ত পথ রাখা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয় কি?
– মাইকে ঘোষণা ও নিরাপত্তারক্ষীদের সংকেত দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও প্রশিক্ষিত পদ্ধতি আছে কি?
– বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা নিয়োগের আগে তাদের অভিজ্ঞতা যাচাই হয় কি?
– বৃষ্টির মতো আকস্মিক পরিস্থিতিতে ভিড় সামলানোর বিকল্প পরিকল্পনা কি তৈরি থাকে?
– মণ্ডপের কাঠামো, মেঝে ও আলোর নিরাপত্তা কি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা হয়?
গত বছরের সেপ্টেম্বরেও কলকাতার পূজা ভিজেছিল দুর্যোগে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মেঘভাঙা বৃষ্টিতে শহরে প্রাণহানি ঘটেছিল এবং বহু বিখ্যাত পূজামণ্ডপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, বৃষ্টি ও ভিড়ের মতো পরিস্থিতির জন্য পূজা কমিটিগুলির প্রস্তুতি কতটা। এবার সেই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ফিরে এসেছে।
শোকের মধ্যে মানবিকতার ছবি
এই বিপর্যয়ের মধ্যেও কিছু ছবি সান্ত্বনা দেয়। দুর্ঘটনার পর সবার আগে ছুটে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ-প্রশাসনের পৌঁছানোর আগেই তাঁরা আহতদের বের করে আনার কাজ শুরু করেন। হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সারারাত কাজ করেছেন। শহরের বহু মানুষ হাসপাতালের সামনে স্বজনদের খবর জানাতে, জল ও খাবার পৌঁছে দিতে এগিয়ে এসেছেন।
প্রশাসন, আয়োজক ও দর্শনার্থী, তিন পক্ষের দায়
প্রশাসনের দায়িত্ব বড় জমায়েতের আগে ঝুঁকির মূল্যায়ন করা, পর্যাপ্ত পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী মোতায়েন করা এবং শর্ত না মানলে মণ্ডপ খোলার অনুমতি আটকে দেওয়া। আয়োজকদের দায়িত্ব মণ্ডপের নকশা থেকে শুরু করে প্রবেশ ও প্রস্থানপথ, আলো, অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা পর্যন্ত নিশ্চিত করা। দর্শনার্থীদেরও সচেতন থাকতে হবে। ভিড় বাড়ছে বুঝলে সরে আসা, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে অতিরিক্ত ভিড়ের সময় না যাওয়া এবং প্রস্থানপথ আগেই দেখে নেওয়া জরুরি।
তবে সবচেয়ে বড় দায় আগেভাগে ঝুঁকি চিহ্নিত করার ক্ষমতা যাঁদের হাতে ছিল, তাঁদের। উদ্বোধনের পর থেকেই ভিড় বাড়ছিল, এ কথা সবার জানা ছিল। তারপরও কেন বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এই প্রশ্নের উত্তর তদন্তকেই দিতে হবে।
শেষ কথা: শোক নয়, শিক্ষাও চাই
দুর্গাপূজা মানে মিলন, আনন্দ ও নতুন করে বেঁচে ওঠার উৎসব। সেই উৎসবে ঘর থেকে বেরিয়ে যাঁরা আর ফিরলেন না, তাঁদের হারানোর ক্ষতি কোনও ক্ষতিপূরণে পূরণ হওয়ার নয়। ২৫ লাখ টাকা ও সরকারি চাকরির ঘোষণা সাময়িক আর্থিক ভরসা দিতে পারে, কিন্তু একজন মা, ভাই বা সন্তানের শূন্যতা ঢাকতে পারে না।
এখন প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। যাঁদের গাফিলতিতে এই প্রাণহানি, তাঁদের আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে বড় জমায়েতের জন্য একটি কঠোর ও বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা-নির্দেশিকা তৈরি এবং তা মানা হচ্ছে কি না তা নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। কোনও থিম, কোনও আলোকসজ্জা বা কোনও প্রতিযোগিতা মানুষের জীবনের চেয়ে বড় নয়।
সপ্তমীর সেই রাতের স্মৃতি বাংলা সহজে ভুলবে না। এই শোক যদি ভবিষ্যতের উৎসবকে আরও নিরাপদ করার শিক্ষা হয়ে ওঠে, তবেই হয়তো নিহতদের প্রতি কিছুটা শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে।