কথারও আছে হিসাব: কুরআনে একজন মুমিনের কথা বলার আদব ও নীতিমালা
সত্য, কোমলতা, সম্মান ও কল্যাণ কুরআন যেভাবে মানুষের কথাকে সুন্দর করতে শেখায়
মানুষের পরিচয় শুধু তার কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না; তার কথাবার্তাও তার চরিত্র, চিন্তা ও মানসিকতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। একটি সুন্দর কথা মানুষের হৃদয়ে শান্তি সৃষ্টি করতে পারে, আবার একটি কটু বাক্য দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও ফাটল ধরাতে পারে। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে কী বলা উচিত, কীভাবে বলা উচিত এবং কোন ধরনের কথা থেকে বিরত থাকা উচিত কুরআনুল কারিমে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে।
কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, কথা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সত্য, দায়িত্ববোধ, ন্যায়, শালীনতা ও মানুষের প্রতি সম্মান। এমনকি মানুষের সঙ্গে কথা বলার ধরনও একজন মুমিনের নৈতিকতার অংশ।
মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলার নির্দেশ
কুরআন মানুষের সঙ্গে উত্তম ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়েছে।
সূরা আল-বাকারা, ২:৮৩
> *وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا*
বাংলা অর্থ: “আর তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলবে।”
এখানে নির্দেশটি শুধু মুসলিমদের সঙ্গে ভালো কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বলা হয়েছে মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলতে। অর্থাৎ মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক জীবন ও পারস্পরিক আচরণে সুন্দর ভাষা গুরুত্বপূর্ণ।
আবার আল্লাহ বলেন,
সূরা আল-ইসরা, ১৭:৫৩
বাংলা অর্থ: “আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন এমন কথা বলে যা সর্বোত্তম। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।”
অর্থাৎ কথার ক্ষেত্রে শুধু ভালো কথা যথেষ্ট নয়; সম্ভব হলে সর্বোত্তম কথাটি বেছে নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। কারণ অসতর্ক ও কটু কথা মানুষের মধ্যে বিরোধ ও বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে।
কঠিন পরিস্থিতিতেও কোমল ভাষা
কথার আদবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো কোমল ভাষা। এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গেও কোমলভাবে কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যে ছিল চরম ক্ষমতাবান ও অবাধ্য শাসক।
*সূরা ত্বা-হা, ২০:৪৪*
বাংলা অর্থ: “তোমরা তার সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বল, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।”
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, সত্য কথা বলার অর্থ রূঢ় বা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করা নয়। সত্যের সঙ্গে কোমলতা যুক্ত হতে পারে। বরং কঠিন পরিস্থিতিতেও সুন্দর ভাষা মানুষের বিবেককে স্পর্শ করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
সত্য ও সোজা কথা বলা
কুরআন একজন মুমিনের কথাকে সত্য, সঠিক ও দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭০-৭১
অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলো সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন।”
কথার ক্ষেত্রে তাই মিথ্যা, অসত্য, বিকৃতি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি কুরআনিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সত্য কথা বলা শুধু সামাজিক গুণ নয়, এটি আল্লাহভীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বাবা-মায়ের সঙ্গে কেমন কথা বলতে হবে
কুরআনে পিতা-মাতার সঙ্গে কথাবার্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।
সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩
বাংলা অর্থ: “তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বল।”
অর্থাৎ বাবা-মায়ের সঙ্গে বিরক্তি প্রকাশের সামান্যতম শব্দও ব্যবহার না করার নির্দেশ রয়েছে। শুধু গালাগাল বা অপমান নয় বিরক্তির ক্ষুদ্র প্রকাশ থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
পরের আয়াতে বলা হয়েছে,
সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৪
বাংলা অর্থ: “আর তাদের প্রতি দয়ার সঙ্গে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’”
এখানে কথার সঙ্গে বিনয় ও দয়ার সম্পর্কও স্পষ্ট করা হয়েছে।
অজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে বিতর্ক নয়, শান্তিপূর্ণ আচরণ
কুরআন এমন মানুষের আচরণ সম্পর্কেও শিক্ষা দিয়েছে, যারা অজ্ঞতাবশত উত্তেজনাকর বা অনভিপ্রেত কথা বলে।
সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩
বাংলা অর্থ: “আর পরম দয়াময়ের বান্দারা তারা, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’।”
অর্থাৎ প্রত্যেক কথার জবাব একই মাত্রার উত্তেজনা দিয়ে দিতে হবে এমন শিক্ষা কুরআনে নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম আচরণ।
বিদ্রূপ, অপমান ও মন্দ নামে ডাকা নিষিদ্ধ
কথার মাধ্যমে মানুষের সম্মান নষ্ট করা কুরআনে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১১
বাংলা অর্থ: “হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারী যেন অন্য নারীকে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না।”
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও আয়াতটির শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কাউকে নিয়ে ঠাট্টা, অপমানজনক মন্তব্য, কটূক্তি কিংবা অবমাননাকর নামে ডাকা—এসব শুধু সামাজিকভাবে ক্ষতিকর নয়, কুরআনের নৈতিক শিক্ষারও পরিপন্থী।
গীবত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ
কুরআন মানুষের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা থেকেও নিষেধ করেছে, যা সে অপছন্দ করবে।
সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২
বাংলা অর্থ: “তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা করবে।”
কুরআন এখানে গীবতের ভয়াবহতা বোঝাতে অত্যন্ত শক্তিশালী উপমা ব্যবহার করেছে। ফলে কারও অনুপস্থিতিকে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা একজন মুমিনের কথার আদর্শ হতে পারে না।
যাচাই না করে কোনো সংবাদ প্রচার নয়
বর্তমান ডিজিটাল যুগে কুরআনের এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু তথ্যটি সত্য কি না, তা যাচাই না করেই প্রচার করা গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৬
বাংলা অর্থ: “হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।”
এ কারণে কুরআনিক নীতিতে শোনা, যাচাই করা এবং তারপর কথা বলা বা প্রচার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া আল্লাহ বলেন,
সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬
বাংলা অর্থ: “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয় এসবের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”
অনর্থক কথা থেকে দূরে থাকা
কুরআন মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে অনর্থক বিষয় থেকে বিমুখ থাকার কথা উল্লেখ করেছে।
সূরা আল-মু’মিনূন, ২৩:৩
বাংলা অর্থ: “যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিমুখ থাকে।”
অন্যদিকে বলা হয়েছে,
সূরা আল-কাসাস, ২৮:৫৫
বাংলা অর্থ: “আর যখন তারা অনর্থক কথা শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, ‘আমাদের কাজ আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজ তোমাদের জন্য। তোমাদের প্রতি শান্তি। আমরা অজ্ঞদের কামনা করি না।’”
অর্থাৎ একজন মানুষের পরিপক্বতার পরিচয় শুধু সে কী বলে, তা নয়; কখন কথা না বলেও সরে যেতে হয় সেটিও জানা।
গোপন পরামর্শেও কল্যাণের কথা
ব্যক্তিগত আলোচনা, গোপন পরামর্শ কিংবা বন্ধুমহলের কথাবার্তাও কুরআনের নৈতিকতার বাইরে নয়।
সূরা আন-নিসা, ৪:১১৪
বাংলা অর্থ: “তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই; তবে যে ব্যক্তি সদকা, সৎকাজ বা মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়, তার কথা ব্যতীত।”
অর্থাৎ ব্যক্তিগত আলোচনা যদি কল্যাণ, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যায়, তা প্রশংসনীয়।
কুরআনে কথার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন
কুরআনে বিভিন্ন স্থানে কথার গুণ ও ধরন বোঝাতে বিশেষ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো একজন মুমিনের যোগাযোগের নৈতিক কাঠামোকে আরও স্পষ্ট করে।
**قَوْلًا سَدِيدًا — কওলান সাদীদা
সঠিক ও দৃঢ় কথা সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭০
*قَوْلًا مَعْرُوفًا — কওলান মারুফা*
শালীন ও প্রচলিত ন্যায়সংগত কথা — *সূরা আল-বাকারা, ২:২৩৫; আন-নিসা, ৪:৫, ৪:৮; আল-আহযাব, ৩৩:৩২*
*قَوْلًا كَرِيمًا — কওলান কারীমা*
সম্মানজনক কথা — সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩
قَوْلًا لَيِّنًا — কওলান লায়্যিনা**
কোমল কথা — সূরা ত্বা-হা, ২০:৪৪
قَوْلًا مَيْسُورًا — কওলান মাইসুরা
সহজ ও সান্ত্বনাদায়ক কথা — সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৮
*قَوْلًا بَلِيغًا — কওলান বালীঘা*
প্রভাবশালী ও হৃদয়গ্রাহী কথা — সূরা আন-নিসা, ৪:৬৩
সুন্দর কথা শুধু সৌজন্য নয়, এটি কুরআনিক আদর্শ
কুরআন উত্তম কথাকে একটি সুন্দর উপমার সঙ্গে তুলনা করেছে।
সূরা ইবরাহীম, ১৪:২৪
বাংলা অর্থ: “তুমি কি লক্ষ্য করনি, আল্লাহ কীভাবে উত্তম কথার উপমা দিয়েছেন? তা একটি উত্তম বৃক্ষের মতো যার মূল সুদৃঢ় এবং যার শাখা আকাশে।”
আর আল্লাহর দিকে আহ্বান, সৎকাজ এবং নিজের আনুগত্যের ঘোষণা এসবকেও উত্তম কথার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৩
বাংলা অর্থ: “তার কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’”
শেষ কথা: কথা বলার আগে কুরআনের কয়েকটি প্রশ্ন
কুরআনের আলোকে একজন মুমিন কথা বলার আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারে, আমি যা বলছি, তা কি সত্য? এটি কি প্রয়োজনীয়? এটি কি শালীন? এতে কি কারও অযথা ক্ষতি হবে? আমি কি বিষয়টি যাচাই করেছি? আমার কথায় কি শান্তি সৃষ্টি হবে, নাকি বিভেদ?
কারণ মানুষের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি কথাই দায়িত্বহীন বিষয় নয়। আল্লাহ বলেন—
সূরা কাফ, ৫০:১৮
বাংলা অর্থ: “সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”
সুতরাং কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী আদর্শ কথা হলো সত্য কথা, সঠিক কথা, কোমল কথা, সম্মানজনক কথা, কল্যাণকর কথা এবং যাচাই করা কথা। আর মিথ্যা, গীবত, বিদ্রূপ, অপমান, কটূক্তি, অজ্ঞতাপ্রসূত প্রচার ও অনর্থক কথাবার্তা থেকে নিজেকে সংযত রাখা।
কথার সৌন্দর্য শুধু ভাষার সৌন্দর্য নয়; বরং একজন মানুষের ঈমানি চরিত্র, বিবেক ও নৈতিকতারও প্রতিফলন। কুরআনের ভাষায়, তাই একজন মুমিনের কথা হওয়া উচিত এমন যা সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে, মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে এবং সমাজে বিভেদ নয়, কল্যাণ ও শান্তির পথ তৈরি করে।