জীবনের গল্প
কলমেঃ দরিফ আব্দুল্লাহ
শহরের এক নির্জন প্রান্তে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল দুজন মানুষ।
দুজনের পোশাক, চেহারা কিংবা বয়সের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। কিন্তু তাদের চোখের ভেতরের পৃথিবী ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
একজনের নাম জীবন।
অন্যজনের নাম অভিজ্ঞতা।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা একই জায়গায় এসে দাঁড়াত। মাঝখানে পড়ে থাকত একটি দীর্ঘ দড়ি গোল হয়ে পেঁচানো। দেখতে মনে হতো, যেন জীবনের একটি চক্র; যার শুরু আছে, কিন্তু শেষ কোথায় কেউ জানে না।
একদিন জীবন দড়িটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমরা প্রতিদিন এখানে আসি। কিন্তু কেন?”
অভিজ্ঞতা মৃদু হেসে বলল,
“কারণ তুমি জীবনকে দেখতে চাও, আর আমি জীবনকে বুঝতে চাই।”
জীবন বলল,
“জীবন কি এত কঠিন?”
“জীবন কঠিন নয়,” অভিজ্ঞতা বলল, “আমরাই তাকে কঠিন করে তুলি।”
জীবন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“তাহলে জীবন কী?”
অভিজ্ঞতা দড়িটির এক প্রান্ত হাতে তুলে নিয়ে বলল,
“এই দড়িটাকে দেখো। তুমি যদি শুধু এর এক প্রান্ত দেখো, মনে হবে এটাই সব। কিন্তু পুরো দড়িটা দেখলে বুঝবে—একটি প্রান্ত অন্য প্রান্তের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।”
জীবন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
অভিজ্ঞতা আবার বলল,
“শৈশব হলো দড়ির শুরু। যৌবন হলো তার দীর্ঘ পথ। বার্ধক্য হলো অন্য প্রান্ত। আর মাঝখানের প্রতিটি পাক হলো আমাদের সিদ্ধান্ত, ভুল, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, সাফল্য আর ব্যর্থতা।”
জীবন বলল,
“তাহলে মানুষ এত দৌড়ায় কেন?”
অভিজ্ঞতা বলল,
“কারণ মানুষ ভাবে, গন্তব্যে পৌঁছালেই সে সুখী হবে।”
“কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছালে?”
“তখন সে বুঝতে পারে, যে পথটাকে সে তুচ্ছ করেছিল, আসলে সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ।”
জীবন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তার মনে পড়ল তার নিজের জীবনের কথা।
ছোটবেলায় সে ভাবত, বড় হলেই সুখী হবে।
বড় হয়ে ভাবল, টাকা হলেই সুখী হবে।
টাকা পাওয়ার পর ভাবল, সম্মান পেলেই শান্তি আসবে।
সম্মান পাওয়ার পর ভাবল, আরও কিছু অর্জন করতে হবে।
এভাবেই একদিন তার চুল সাদা হয়ে গেল।
কিন্তু তার ভেতরের মানুষটি তখনও সেই ছোট্ট শিশুটির মতোই কিছু খুঁজছিল।
একদিন সে নিজের পুরোনো বাক্স খুলে দেখল সেখানে পড়ে আছে শৈশবের একটি ছবি।
ছবিতে সে হাসছে।
তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা।
বাবার হাতে ছিল তার ছোট্ট হাত।
জীবন ছবিটির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ কাঁদল।
সে বুঝতে পারল, তার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনগুলোতে তার কাছে টাকা ছিল না, বড় বাড়ি ছিল না, কোনো পদ-পদবি ছিল না।
ছিল শুধু কিছু মানুষ।
ছিল মায়ের ডাক।
ছিল বাবার হাত।
ছিল বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলের আড্ডা।
ছিল বৃষ্টিতে ভেজা।
ছিল নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা।
ছিল কোনো কারণ ছাড়াই হাসতে পারা।
কিন্তু সেসব মুহূর্ত চলে গেছে।
ফিরে আসেনি।
পরদিন জীবন আবার অভিজ্ঞতার কাছে গেল।
বলল,
“আমি এতদিন জীবনকে বাঁচিনি। আমি শুধু জীবনকে ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রেখেছি।”
অভিজ্ঞতা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই উপলব্ধিটাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।”
জীবন বলল,
“তাহলে এখন কী করব?”
অভিজ্ঞতা বলল,
“এখন থেকে Live করো।”
“শুধু বেঁচে থাকব?”
“না। বেঁচে থাকার সঙ্গে জীবনকে অনুভব করো।”
জীবন জিজ্ঞেস করল,
“দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী?”
অভিজ্ঞতা বলল,
“শ্বাস নেওয়া মানে বেঁচে থাকা।
কিন্তু কারও কষ্ট বুঝতে পারা—জীবন।
শুধু চোখে দেখা মানে বেঁচে থাকা।
কিন্তু সৌন্দর্য অনুভব করা—জীবন।
নিজের জন্য অর্জন করা মানে বেঁচে থাকা।
কাউকে কিছু দিয়ে আনন্দ পাওয়া—জীবন।
শুধু নিজের কথা ভাবা মানে বেঁচে থাকা।
অন্যের জন্য হৃদয় খুলে দেওয়া—জীবন।”
জীবন মাটিতে রাখা দড়িটির দিকে তাকাল।
দড়িটি তখনও গোল হয়ে পড়ে আছে।
সে বলল,
“আমাদের গল্পের শেষ কোথায়?”
অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে বলল,
“যেদিন তুমি শেষবার চোখ বন্ধ করবে, সেদিন তোমার গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হবে। কিন্তু তোমার গল্পের প্রভাব শেষ হবে না।”
“কীভাবে?”
“তুমি যাকে ভালোবাসা দিয়েছ, সে তোমার কথা মনে রাখবে। তুমি যাকে সাহায্য করেছ, সে তোমার উপকারের কথা বলবে। তুমি যে ভালো কাজ করেছ, তার প্রভাব অন্য কারও জীবনে বেঁচে থাকবে।”
জীবন কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“তাহলে মানুষ আসলে কতদিন বাঁচে?”
অভিজ্ঞতা আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নয়। মানুষ ততদিন বাঁচে, যতদিন তার ভালো কাজ, ভালোবাসা আর স্মৃতি অন্যের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।”
হঠাৎ সন্ধ্যার আলো নিভে এল।
দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
পেছনে পড়ে রইল সেই গোল হয়ে থাকা দড়িটি।
কিন্তু এবার জীবন দড়িটির অর্থ বুঝতে পেরেছে।
জীবন একটি সরল রেখা নয়।
জীবন একটি গল্প।
কখনো আনন্দের অধ্যায়, কখনো কান্নার।
কখনো প্রাপ্তি, কখনো হারানোর।
কখনো মানুষের ভিড়, কখনো একাকিত্ব।
কখনো আমরা কাউকে ধরে রাখি, কখনো কাউকে ছেড়ে দিতে হয়।
তবু গল্প চলতে থাকে।
আর এই গল্পের সবচেয়ে বড় ভুল হলো
আমরা অনেক সময় আগামী দিনের সুখের অপেক্ষায় আজকের জীবনটাকেই হারিয়ে ফেলি।
তাই জীবনকে শুধু Life হিসেবে বহন করো না।
তাকে Live করো।
কারণ একদিন তোমার জীবনও হয়ে যাবে একটি Life Story
আর তখন তুমি আর নতুন কোনো অধ্যায় লিখতে পারবে না।
আজ যে পৃষ্ঠাটি তোমার হাতে আছে, সেটিই হয়তো তোমার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা।
তাই আজ ভালোবাসো।
আজ ক্ষমা করো।
আজ হাসো।
আজ কাউকে সাহায্য করো।
আজ আপন মানুষটির হাতটা শক্ত করে ধরো।
কারণ জীবন অপেক্ষা করে না।
জীবন চলে যায় কিন্তু জীবনের গল্প থেকে যায়।