পোশাক রফতানিতে নতুন মাইলফলক
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্ববাজারে এক নতুন সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই-আগস্টে পোশাক রফতানি থেকে মোট আয় হয়েছে ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.১২ শতাংশ বেশি।
শিল্পখাতটির এই উত্থান শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্যই নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা ও টেকসই সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দলিল বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
আগস্টে একক মাসে প্রবৃদ্ধি ১৩.৯২ শতাংশ
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে আরও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে যেখানে পোশাক রফতানি হয়েছিল ৩১৭ কোটি ডলার, সেখানে ২০২৬ সালের একই মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬১ কোটি ডলারে এটি বছরের তুলনায় ১৩.৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
এই ধারাবাহিক উত্থান মূলত দুই প্রধান উপখাত নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ধারাকে নির্দেশ করছে।
নিটওয়্যার ও ওভেন: দুই খাতেই ডাবল-ডিজিট প্রবৃদ্ধি
২০২৬ সালের আগস্ট মাসে নিটওয়্যার পোশাক খাত থেকে রফতানি হয়েছে ২০৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৪.৮৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, ওভেন পোশাক খাতেও প্রবৃদ্ধি ছিল ১২.৭০ শতাংশ, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৭ কোটি ডলারে।
উভয় উপখাতেই ডাবল-ডিজিট এই প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প শুধু পণ্যের বৈচিত্র্যেই নয়, বরং গুণমান, সময়মতো ডেলিভারি ও টেকসই উৎপাদন সক্ষমতায়ও বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান মজবুত করছে।
ক্রেতাদের আস্থার প্রতিফলন: খাতসংশ্লিষ্টদের মত
পোশাকশিল্পের এই সাফল্য সম্পর্কে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “নিট এবং ওভেন উভয় খাতেই এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ও এ খাতের টেকসই সক্ষমতার প্রতিফলন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির নানা চড়াই-উতরাই সত্ত্বেও বাংলাদেশের পোশাক খাত স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে, যা আগামী দিনে আরও বড় বাজারের সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করেন খাতের বিশ্লেষকরা।
সামনের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
তবে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শীর্ষ নেতাদের মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম, ডলার-সংকট, ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ-নির্দেশনা মেনে উৎপাদন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারে নতুন শুল্কনীতি ও ট্যারিফ ব্যবস্থার ওপরও নজর রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের অ্যাপারেল, টেকসই ফ্যাব্রিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে রফতানি আয় আরও ২০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
নতুন বাজারে পা বাড়ানোর সময়
এখন শুধু ঐতিহ্যবাহী ইউরোপ-আমেরিকা নয়, বরং নতুন সম্ভাবনাময় বাজার যেমন জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও বাংলাদেশি পোশাকের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এসব দেশে বাণিজ্য কূটনৈতিক কার্যক্রম জোরদার করা গেলে আগামী কয়েক বছরে পোশাক রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর স্বপ্নও বাস্তবায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন শুধু একটি রফতানি খাত নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রাণভোমরা। সময়োপযোগী নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমশক্তি এই ত্রিমুখী সমন্বয়ই পারে এই খাতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে।