×
×
Saturday, 7 November, 2026, 10:27 am

ধর্ম ও জীবন
কোরআনের আয়নায় প্রকৃত মুমিনের পরিচয়

ভূমিকা: একটি আয়াত, একটি আত্মজিজ্ঞাসা

পবিত্র কোরআনের কিছু আয়াত পড়লে মনে হয়, সেগুলো যেন আজকের মানুষকেই উদ্দেশ করে নাজিল হয়েছে। সূরা আল-বাকারার অষ্টম আয়াত তেমনই একটি। আল্লাহ তাআলা বলছেন, মানুষের মধ্যে কিছু আছে যারা বলে, “আমরা আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছি”, অথচ তারা মুমিন নয়।

আয়াতটি ছোট, কিন্তু এর ভেতরের প্রশ্নটি বিশাল। মুখে ঈমানের ঘোষণা দেওয়া আর অন্তরে সত্যিকার ঈমান থাকা কি একই বিষয়? কোরআন পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে, না, এক নয়। একজন মানুষ নিজেকে বিশ্বাসী বলে দাবি করতে পারে, সমাজেও বিশ্বাসী হিসেবে পরিচিত হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ঈমানের মাপকাঠি আলাদা।

এই প্রতিবেদনে আমরা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে বোঝার চেষ্টা করব, ঈমানের দাবি ও প্রকৃত ঈমানের মধ্যে ফারাক কোথায়, কোন আচরণ সেই ফারাক তৈরি করে, এবং সেই ফারাক ঘোচানোর পথ কী।

আয়াতের প্রেক্ষাপট: কাদের কথা বলা হচ্ছে?

সূরা আল-বাকারার শুরুতে প্রথম চার আয়াতে মুত্তাকিদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, সালাত কায়েম করে, আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে ব্যয় করে এবং নাজিল হওয়া সব কিতাবে ঈমান রাখে। এরপর পরবর্তী দুই আয়াতে সেই লোকদের কথা এসেছে, যারা সত্য জানার পরও অস্বীকার করেছে।

তারপর আসে তৃতীয় একটি দল, যাদের কথা ৮ নম্বর আয়াত থেকে শুরু হয়ে ২০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। তারা প্রকাশ্যে অস্বীকার করে না, আবার অন্তর দিয়ে মেনেও নেয় না। মুখে তারা ঈমানের কথা বলে, কিন্তু অন্তরে থাকে অন্য কিছু। কোরআন এদের চরিত্র এমন বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে, যাতে পরবর্তী যুগের মানুষ নিজেদের ভেতরেও এই লক্ষণগুলো খুঁজে দেখতে পারে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, আয়াতে তাদের ঘোষণার ভাষাটিও উদ্ধৃত হয়েছে। তারা বলে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছি। অর্থাৎ বিশ্বাসের দুই মৌলিক স্তম্ভের কথাই তারা মুখে স্বীকার করছে। তবু আল্লাহ বলছেন, তারা মুমিন নয়। এখান থেকেই বোঝা যায়, কেবল শব্দ উচ্চারণ ঈমানের প্রমাণ নয়।

আরো পড়ুনঃ

বিধানের মালিকানা এক মাত্র আল্লাহ

 

ঈমান কেবল মুখের কথা নয়

ঈমান শব্দের অর্থ বিশ্বাস ও আস্থা। কোরআন বারবার দেখিয়েছে, এই বিশ্বাস অন্তরে স্থির হতে হয়, আচরণে প্রকাশ পেতে হয় এবং জীবনের পরীক্ষায় টিকে থাকতে হয়।

সূরা আল-হুজুরাতে একটি চমৎকার ঘটনার উল্লেখ আছে। কিছু বেদুইন এসে বলল, “আমরা ঈমান এনেছি।” আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিলেন, তাদের বলে দিন, তোমরা ঈমান আনোনি, বরং বলো “আমরা আত্মসমর্পণ করেছি”, কারণ ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি (৪৯:১৪)। পরের আয়াতেই আল্লাহ প্রকৃত মুমিনের সংজ্ঞা দিলেন। মুমিন তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে, এরপর আর সন্দেহে পড়ে না, এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ (৪৯:১৫)।

এই আয়াত দুটি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা মেলে। বাহ্যিক আনুগত্য এক জিনিস, আর অন্তরে গেঁথে যাওয়া ঈমান আরেক জিনিস। ঈমান হলো সেই বিশ্বাস, যা সন্দেহমুক্ত এবং ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।

সূরা আনফালে মুমিনদের পরিচয় আরও সুন্দরভাবে এসেছে। মুমিন তারা, আল্লাহর নাম উচ্চারিত হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে, তাঁর আয়াত শুনলে যাদের ঈমান বেড়ে যায়, যারা কেবল তাদের রবের ওপর ভরসা করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে ব্যয় করে। আল্লাহ বলেন, তারাই প্রকৃত মুমিন (৮:২-৪)। এখানে ঈমানের মাপকাঠি অনুভূতি, আচরণ ও আর্থিক ত্যাগ, তিনটিই।

প্রতারণার ফাঁদে নিজেই আটকে পড়া

সূরা আল-বাকারার ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানাচ্ছেন, এই লোকেরা আল্লাহ ও মুমিনদের ধোঁকা দিতে চায়। অথচ তারা আসলে নিজেদেরকেই ধোঁকা দিচ্ছে, আর তারা তা বুঝতেও পারে না।

এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য। যে মানুষ মুখে একরকম আর অন্তরে অন্যরকম থাকে, সে প্রথমে অন্যকে ঠকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে নিজের কাছেই নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলে। সে ভাবতে শুরু করে, সে তো ঠিকই আছে, আসলে ঠিকঠাকই চলছে। আত্মপ্রবঞ্চনার এই স্তরে পৌঁছালে নিজের ভুল চোখে পড়ার সুযোগ কমে যায়।

পরের আয়াতে বলা হয়েছে, তাদের অন্তরে রোগ আছে, আর আল্লাহ সেই রোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন (২:১০)। এখানে রোগ বলতে সংশয়, কপটতা ও হিংসার মতো অন্তরের ব্যাধিকে বোঝানো হয়েছে। শারীরিক রোগ যেমন চিকিৎসা না করালে বাড়ে, অন্তরের রোগও অবহেলায় বাড়তে থাকে।

এরপর কোরআন তাদের আরেকটি আচরণ তুলে ধরে। যখন তাদের বলা হয়, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না, তারা জবাব দেয়, “আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।” আল্লাহ বলেন, সাবধান, তারাই আসল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা বোঝে না (২:১১-১২)। নিজের ক্ষতিকর কাজকে কল্যাণের মোড়কে উপস্থাপন করা এই চরিত্রের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

দুই মুখ, দুই রূপ: পরিবেশ বুঝে পাল্টে যাওয়া

সূরা আল-বাকারার ১৪ নম্বর আয়াত এই দ্বিমুখিতার একটি স্পষ্ট চিত্র আঁকে। তারা যখন মুমিনদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে, “আমরা ঈমান এনেছি।” আর যখন নিজেদের শয়তানতুল্য নেতাদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, “আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি, আমরা কেবল উপহাস করছি।”

অর্থাৎ পরিবেশ বদলালে তাদের অবস্থানও বদলে যায়। ধার্মিকদের মাঝে তারা ধার্মিক, আর অন্য মহলে গেলে সেই ধার্মিকতাকেই ঠাট্টার বিষয় বানায়। এই আচরণ কেবল একটি যুগের সমস্যা নয়। যেখানেই স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসের সংঘাত ঘটে, সেখানেই এর ঝুঁকি থাকে।

সূরা মুনাফিকুনের শুরুতে আরও একটি দিক এসেছে। মুনাফিকরা রাসূলের কাছে এসে বলে, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল।” আল্লাহ জানেন, তিনি সত্যিই তাঁর রাসূল। কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী (৬৩:১)। কথাটি সত্য হলেও যিনি তা বলছেন তাঁর অন্তরে সেই সত্যের স্বীকৃতি নেই। তাই আল্লাহ সেই সাক্ষ্যকে মিথ্যা বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

কোরআন আরও বলে, তাদের বাহ্যিক চেহারা ও সুন্দর কথা তোমাকে মুগ্ধ করতে পারে, কিন্তু তারা যেন দেয়ালে ঠেকিয়ে রাখা কাঠের মতো, ভেতরে সারশূন্য (৬৩:৪)। বাইরের চাকচিক্য দেখে ঈমানের গভীরতা মাপা যায় না।

ইবাদতে লোকদেখানো ভাব ও কৃপণতা

ঈমানের দাবির সঙ্গে ইবাদতের মনোভাবও জড়িত। সূরা আন-নিসায় মুনাফিকদের সালাতের বর্ণনা এসেছে। তারা যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন আলস্যভরে দাঁড়ায়, মানুষকে দেখানোর জন্য দাঁড়ায়, আর আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে (৪:১৪২)।

লক্ষ করার বিষয়, এখানে সালাত পড়ার কথাই বলা হয়েছে, ছেড়ে দেওয়ার কথা নয়। সমস্যা হলো মনোভাবে। আন্তরিকতা না থাকলে বাহ্যিক ইবাদতও মূল্য হারায়। সূরা আল-মাউনে আল্লাহ বলেছেন, ধ্বংস সেই মুসল্লিদের জন্য, যারা নিজেদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য কাজ করে, আর প্রয়োজনীয় ছোটখাটো সাহায্য দিতেও বিরত থাকে (১০৭:৪-৭)।

সূরা আত-তাওবায় মুনাফিক নারী-পুরুষের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য এসেছে। তারা অসৎ কাজের আদেশ দেয়, সৎ কাজে বাধা দেয় এবং নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখে, অর্থাৎ আল্লাহর পথে ব্যয়ে কৃপণতা করে (৯:৬৭)। ইবাদতের বাহ্যিক রূপ ধরে রেখে যদি মানুষের অধিকার ও সমাজের কল্যাণের প্রশ্নে অনীহা থাকে, তাহলে সেই ইবাদত প্রশ্নের মুখে পড়ে।

কথা ও কাজের অমিল

কোরআন সরাসরি প্রশ্ন করেছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা যা করো না, তা কেন বলো? আল্লাহর কাছে এটি অত্যন্ত অসন্তোষজনক যে, তোমরা এমন কথা বলো যা নিজেরা করো না” (৬১:২-৩)।

সূরা আল-বাকারায় আহলে কিতাবদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের আদেশ দাও আর নিজেদের কথা ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করো? তবুও কি তোমরা বুঝবে না (২:৪৪)? উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজে সেই উপদেশ মানা কঠিন। এই কঠিন কাজটিই ঈমানের প্রকৃত পরীক্ষা।

সূরা আন-নূরে আল্লাহ বলছেন, কিছু লোক বলে, “আমরা আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ঈমান এনেছি এবং আনুগত্য করেছি।” অথচ এরপর তাদের একটি দল মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল্লাহ বলেন, এরা মুমিন নয় (২৪:৪৭)। পরের আয়াতগুলোতে প্রকৃত মুমিনের আচরণ বলা হয়েছে। মুমিনদের কথা কেবল এটুকুই, যখন আল্লাহ ও রাসূলের দিকে তাদের ডাকা হয়, তখন তারা বলে, “আমরা শুনলাম ও মানলাম” (২৪:৫১)।

মূল কথা হলো, আনুগত্য কেবল সুবিধার সময়ের বিষয় নয়। যে ডাক নিজের পছন্দের সঙ্গে মেলে না, সেই ডাকেও সাড়া দেওয়ার সামর্থ্যই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়।

শিরকমিশ্রিত বিশ্বাস: সূরা ইউসুফের সতর্কবার্তা

আপনার দেওয়া সূত্রে উল্লিখিত ১২:১০৬ নম্বর আয়াতটি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সূরা ইউসুফে আল্লাহ বলেন, “তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, কিন্তু তাঁর সঙ্গে শরিকও করে।”

এই আয়াতটি ঈমানের আরেকটি সূক্ষ্ম দিক তুলে ধরে। একজন মানুষ আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে পারে, তাঁকে সৃষ্টিকর্তা বলে মানতে পারে, তবু তার অন্তর বা আচরণে অন্য কিছুর স্থান থাকতে পারে। কখনো তা সম্পদের প্রতি অন্ধ নির্ভরতা, কখনো ক্ষমতাবানদের ভয়, কখনো নিজের খেয়ালখুশিকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড বানিয়ে নেওয়া।

কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ সতর্ক করেছেন, তুমি কি তাকে দেখেছ, যে নিজের প্রবৃত্তিকে নিজের উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে (২৫:৪৩)? তাওহিদের দাবির সঙ্গে জীবনের সিদ্ধান্তগুলো মিলিয়ে দেখা তাই জরুরি। বিশ্বাস কেবল মুখে স্বীকার করার বিষয় নয়, সিদ্ধান্তের মুহূর্তে সেই বিশ্বাসের পরীক্ষা হয়।

আংশিক ঈমান: কিছু মানা, কিছু ছেড়ে দেওয়া

সূরা আল-বাকারায় বনি ইসরাইলকে উদ্দেশ করে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ মানো আর কিছু অংশ অস্বীকার করো (২:৮৫)? যেটুকু নিজের সুবিধার সঙ্গে মেলে, সেটুকু গ্রহণ করা আর যেটুকু কঠিন মনে হয়, সেটুকু এড়িয়ে যাওয়া ঈমানের পূর্ণতা নয়।

একই সূরায় ঈমানদারদের সরাসরি আহ্বান করা হয়েছে, তোমরা ইসলামে পূর্ণভাবে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (২:২০৮)।

পূর্ণ প্রবেশের অর্থ হলো জীবনের সব ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশকে মান্য করা। ইবাদতে, লেনদেনে, পারিবারিক সম্পর্কে, কথাবার্তায় এবং সমাজজীবনে। যে ঈমান কেবল মসজিদের চৌহদ্দিতে আটকে থাকে আর বাজারে, অফিসে বা ঘরে পৌঁছায় না, সেই ঈমান অসম্পূর্ণ।

পরীক্ষা ছাড়া ঈমানের স্বীকৃতি নেই

সূরা আল-আনকাবুতের শুরুতেই আল্লাহ একটি মৌলিক নীতি ঘোষণা করেছেন। মানুষ কি মনে করে, “আমরা ঈমান এনেছি” বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর পরীক্ষা করা হবে না? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি। অতএব আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী (২৯:২-৩)।

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পরীক্ষা ঈমানের স্বাভাবিক অংশ। সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, ক্ষমতা-অসহায়ত্ব, প্রতিটি অবস্থাই বিশ্বাসের যাচাইয়ের সুযোগ। কঠিন সময়ে যে মানুষ আল্লাহর ওপর আস্থা হারায় না এবং সহজ সময়ে যে মানুষ অহংকারে ডুবে যায় না, সেই প্রকৃত বিশ্বাসী।

সূরা আলে ইমরানে বলা হয়েছে, আল্লাহ মুমিনদের সেই অবস্থায় রাখবেন না, যে অবস্থায় তোমরা এখন আছ, যতক্ষণ না তিনি অপবিত্রকে পবিত্র থেকে আলাদা করে দেন (৩:১৭৯)। অর্থাৎ পরীক্ষার একটি উদ্দেশ্য হলো খাঁটি ও মেকির পার্থক্য স্পষ্ট করা।

আজকের সমাজে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন

কোরআনের এই আয়াতগুলো পড়ে সহজেই মনে হতে পারে, এগুলো অন্য কারও কথা বলছে। কিন্তু প্রকৃত পাঠ তখনই হয়, যখন পাঠক নিজেকে প্রশ্ন করে।

আজকের যুগে ঈমানের দাবি করা সহজ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ধর্মীয় বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায় এক ক্লিকে। কিন্তু সেই বার্তার সঙ্গে নিজের জীবনের মিল আছে কি না, সেই প্রশ্ন অনেক সময় অনুচ্চারিত থেকে যায়। কেউ নামাজের ছবি দেয়, অথচ কর্মক্ষেত্রে ঘুষ নেয়। কেউ উপদেশে সিদ্ধহস্ত, কিন্তু ঘরের মানুষের সঙ্গে আচরণে রূঢ়। কেউ সত্যের কথা বলে, কিন্তু স্বার্থের প্রশ্নে মিথ্যার আশ্রয় নেয়।

কোরআন এই ধরনের বৈপরীত্যকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা বলে এড়িয়ে যায়নি। সে এটিকে বিশ্বাসের গুরুতর সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এই চিহ্নিতকরণের উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়, বরং সতর্ক করা, যাতে মানুষ ফিরে আসার সুযোগ পায়।

এখানে একটি সতর্কতাও জরুরি। কারও অন্তরের অবস্থা জানেন একমাত্র আল্লাহ। কোরআনের এই আয়াতগুলো অন্যের ঈমানের ওপর রায় দেওয়ার হাতিয়ার নয়, বরং নিজের অন্তরকে যাচাই করার আয়না। অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকানোই এই আয়াতগুলোর মূল শিক্ষা।

প্রকৃত মুমিনের ছবি

নিফাকের বর্ণনার পাশাপাশি কোরআন প্রকৃত মুমিনের একটি স্পষ্ট ছবিও এঁকেছে। সূরা আল-মুমিনুনের শুরুতেই আল্লাহ বলেছেন, মুমিনরা সফল হয়েছে। তারা সেই লোক, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়ী ও একাগ্র, যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকে, যারা যাকাত আদায়ে সক্রিয়, যারা নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে, যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং যারা নিজেদের সালাতের প্রতি যত্নবান (২৩:১-১১)।

এই তালিকায় ইবাদত, চরিত্র, সমাজসেবা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা, সবকিছু একসঙ্গে এসেছে। ঈমান যে জীবনের সব ক্ষেত্রকে স্পর্শ করে, এখান থেকেই তা পরিষ্কার হয়।

সূরা আল-বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াতে সৎকর্মের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, প্রকৃত সৎকর্ম হলো আল্লাহ, শেষ দিন, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদের প্রতি ঈমান আনা। আর আল্লাহর ভালোবাসায় আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন, মুসাফির ও সাহায্যপ্রার্থীদের সম্পদ দেওয়া, দাসমুক্তি, সালাত কায়েম, যাকাত আদায়, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং অভাব, কষ্ট ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণ করা। আল্লাহ বলেন, এরাই সত্যবাদী এবং এরাই মুত্তাকি।

লক্ষ করার বিষয়, এখানে ঈমানের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি দায়িত্বের কথাও আছে। ঈমান যেন আল্লাহ ও মানুষ, উভয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার নাম।

ফিরে আসার পথ: তাওবা, সংশোধন ও আন্তরিকতা

কোরআন কেবল সমস্যার কথা বলে থেমে যায়নি, সমাধানের পথও দেখিয়েছে। মুনাফিকদের কঠিন পরিণতির কথা বলার পরই আল্লাহ একটি দরজা খুলে রেখেছেন। যারা তাওবা করে, নিজেদের সংশোধন করে, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং নিজেদের দ্বীনকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে, তারা মুমিনদের সঙ্গে থাকবে। আল্লাহ মুমিনদের অবশ্যই মহাপুরস্কার দেবেন (৪:১৪৬)।

এই আয়াতে চারটি ধাপ দেখা যায়। প্রথমত, তাওবা, অর্থাৎ ভুল স্বীকার করে ফিরে আসা। দ্বিতীয়ত, ইসলাহ, অর্থাৎ নিজের আচরণ শুধরে নেওয়া। তৃতীয়ত, আল্লাহকে আঁকড়ে ধরা, অর্থাৎ নির্ভরতা কেবল তাঁর ওপর রাখা। চতুর্থত, ইখলাস, অর্থাৎ নিয়তকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খাঁটি করা।

সূরা আল-হাদিদে আল্লাহ ঈমানদারদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেছেন, যারা ঈমান এনেছে, তাদের জন্য কি এখনো সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে ও তাঁর নাজিল করা সত্যের সামনে তাদের অন্তর বিগলিত হবে (৫৭:১৬)? এটি যেন অন্তরকে নরম করার এক মমতাময় আহ্বান।

সূরা আন-নিসার ১৩৬ নম্বর আয়াতে আবার ঈমানদারদেরই বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনো।” এর অর্থ ঈমান একবার ঘোষণা করে শেষ হয়ে যায় না। এটি প্রতিদিন নবায়ন করার বিষয়, ধাপে ধাপে গভীর করার বিষয়।

নিরাশ হওয়ারও কোনো কারণ নেই। সূরা আয-যুমারে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ডেকে বলেছেন, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন, তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (৩৯:৫৩)।

উপসংহার: দাবি নয়, প্রমাণই আসল

সূরা আল-বাকারার ৮ নম্বর আয়াত আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ঈমানের দাবি আর ঈমানের বাস্তবতা এক জিনিস নয়। মুখের ঘোষণা শুরু মাত্র। অন্তরের নিষ্ঠা, আচরণের সততা, কথা ও কাজের মিল, কঠিন সময়ে ধৈর্য এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, এসবই ঈমানের প্রমাণ।

কোরআন আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাছে মানুষের পরিচয় তার দাবির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় তার অন্তরের অবস্থা ও জীবনের বাস্তব আচরণে। তাই প্রতিটি মানুষের জন্য প্রশ্ন একটাই। আমি যা বলি, আমি কি তা বিশ্বাস করি? আমি যা বিশ্বাস করি, আমি কি তা জীবনে মানি?

এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খোঁজার সাহসই আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ। আর সেই পথে হাঁটার তাওফিক চাওয়া, ভুল হলে তাওবা করা এবং আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখাই কোরআনের দেখানো সঠিক পথ।

[atn_photocard]
আরও