দ্বীন ইসলাম
সূর্য নির্দিষ্ট পথে ছুটে চলা আল্লাহর এক অসীম ক্ষমতার বার্তা!
সূর্য, চন্দ্র, দিন ও রাতের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে পবিত্র কোরআন মানুষকে সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানিয়েছে। সূরা ইয়াসিনের ৩৮ নম্বর আয়াত সেই ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে।
সূর্যের গতিপথে আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থা
প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠে, পৃথিবী আলোয় ভরে যায়। দিনের ব্যস্ততা শেষে সূর্য অস্ত যায়, নেমে আসে রাতের অন্ধকার। এই পরিচিত দৃশ্য মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রতিদিনের এই স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার মধ্যেও রয়েছে গভীর চিন্তার বিষয়। সূর্য কি নিজের ইচ্ছায় চলেছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে সুনির্ধারিত কোনো ব্যবস্থা? পবিত্র কোরআন এ বিষয়ে মানুষকে সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করে।
সূরা ইয়াসিনের ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
আরবি:
وَالشَّمْسُ تَجْرِيْ لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا ۚ ذٰلِكَ تَقْدِيْرُ الْعَزِيْزِ الْعَلِيْمِ
বাংলা অর্থ: আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট পথে, এটা মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ।
এই আয়াতের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত হলেও এর মধ্যে রয়েছে সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা, আল্লাহর ক্ষমতা এবং তাঁর সর্বজ্ঞতার প্রতি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের শিক্ষা। এখানে সূর্যের চলার কথা বলা হয়েছে এবং সেই চলার ব্যবস্থাকে আল্লাহর নির্ধারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়াতটির শেষাংশে আল্লাহর দুটি গুণ বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি মহাপরাক্রমশালী এবং সর্বজ্ঞ। অর্থাৎ তাঁর ক্ষমতা অসীম, আর তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে। সূর্যের নির্ধারিত গতিপথের প্রসঙ্গের সঙ্গে এই দুটি গুণের উল্লেখ মানুষকে সৃষ্টির শৃঙ্খলা এবং স্রষ্টার মহিমা নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানায়।
সূর্যের চলার কথা কেন উল্লেখ করেছে কোরআন?
পবিত্র কোরআনে প্রকৃতির বিভিন্ন নিদর্শনের কথা বারবার এসেছে। আকাশ, পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র, রাত ও দিন মানুষের সামনে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরে, যেগুলো নিয়ে চিন্তা করলে সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা উপলব্ধি করা যায়।
সূরা ইয়াসিনের ৩৭ নম্বর আয়াতে রাতকে একটি নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ রাত থেকে দিনকে সরিয়ে নেন, তখন মানুষ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। এর পরের আয়াত, অর্থাৎ ৩৮ নম্বর আয়াতে সূর্যের নির্ধারিত পথে চলার কথা বলা হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে দিন ও রাতের পরিবর্তনের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে, তারপর সূর্যের চলার কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী ৩৯ নম্বর আয়াতে চন্দ্রের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা এবং ৪০ নম্বর আয়াতে সূর্য, চন্দ্র, রাত ও দিনের পারস্পরিক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এভাবে পরপর কয়েকটি আয়াতে সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন নিদর্শন তুলে ধরে কোরআন মানুষের চিন্তাকে একটি বৃহত্তর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। মানুষের চোখে প্রতিদিন দেখা ঘটনাগুলোও যে গভীর তাৎপর্য বহন করে, এই আয়াতগুলো সেই বিষয়টি সামনে আনে।
‘নির্দিষ্ট পথে’ চলার অর্থ কী?
সূরা ইয়াসিনের ৩৮ নম্বর আয়াতে ব্যবহৃত ‘মুস্তাকার’ শব্দটি অনুবাদে নির্দিষ্ট অবস্থান, গন্তব্য বা নির্ধারিত স্থিতির অর্থে প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুবাদে শব্দটির ভাব প্রকাশে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তবে আয়াতটির মূল বক্তব্য হলো, সূর্যের চলার সঙ্গে একটি নির্ধারিত ব্যবস্থা যুক্ত রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোরআনের বক্তব্য বোঝার ক্ষেত্রে অনুবাদের শব্দ নির্বাচন এবং আয়াতের সামগ্রিক বক্তব্য উভয়ই বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো একটি বাংলা শব্দের ওপর নির্ভর করে আয়াতটির সম্ভাব্য সব অর্থকে একটিমাত্র ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়।
আয়াতটি সরাসরি জানায় যে সূর্য চলমান এবং তার চলার একটি নির্ধারিত ব্যবস্থা রয়েছে। এরপর এই ব্যবস্থাকে মহাপরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সূর্যের চলাকে কোরআন একটি অর্থপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করছে। মানুষ যেন শুধু সূর্যের আলো দেখে দৈনন্দিন কাজেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং এর চলার ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করে এবং সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলার প্রতি মনোযোগী হয়।
তবে এই আয়াতের ভিত্তিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা পরিমাপ দাবি করা উচিত নয়, যা আয়াতটিতে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। কোরআনের বক্তব্য যতটুকু স্পষ্টভাবে জানায়, ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও সেই সীমা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞানের পরিচয়
আয়াতটির শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘যালিকা তাকদিরুল আযীযিল আলীম’। এর অর্থ, এটি মহাপরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ।
এখানে ‘আল-আযীয’ অর্থ পরাক্রমশালী বা মহাশক্তিধর এবং ‘আল-আলীম’ অর্থ সর্বজ্ঞ। এই দুটি গুণ পাশাপাশি উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে আয়াতটি আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞানের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
মানুষের জ্ঞান সীমিত। মানুষ নিজের চারপাশের জগত পর্যবেক্ষণ করে, প্রশ্ন করে এবং বিভিন্ন বিষয় বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু সূরা ইয়াসিনের এই আয়াত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে সৃষ্টিজগতের নির্ধারিত ব্যবস্থার সঙ্গে আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্ক রয়েছে।
সূর্য প্রতিদিন মানুষের সামনে দৃশ্যমান হলেও এর চলার বিষয়টি কেবল দৈনন্দিন অভ্যাসের বিষয় নয়। কোরআনের দৃষ্টিতে এটি আল্লাহর নির্ধারণের একটি নিদর্শন। ফলে প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করাও এই আয়াত থেকে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
এখানে আল্লাহর ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে, কারণ তিনি মহাপরাক্রমশালী। একই সঙ্গে তাঁর সর্বজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে, কারণ সৃষ্টিজগতের ব্যবস্থাকে তাঁর জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই দুই গুণ মানুষের মনে স্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং সচেতনতা জাগিয়ে তোলে।
সূর্য, চন্দ্র ও রাত দিনের ব্যবস্থায় কোরআনের শিক্ষা
সূরা ইয়াসিনের ৩৮ নম্বর আয়াতকে যথাযথভাবে বুঝতে হলে এর আগের ও পরের আয়াতগুলোর বক্তব্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ এখানে সূর্যকে বিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং রাত, দিন, চন্দ্র এবং তাদের নির্ধারিত ব্যবস্থার সঙ্গে সূর্যের প্রসঙ্গ যুক্ত রয়েছে।
সূরা ইয়াসিনের ৩৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ চন্দ্রের জন্য বিভিন্ন পর্যায় নির্ধারণের কথা বলেছেন। আয়াতটিতে চাঁদের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। চাঁদ কখনো সরু, কখনো পূর্ণ এবং কখনো আবার ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় দেখা যায়। কোরআন এই পরিবর্তনকে নির্ধারিত পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছে।
এরপর ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সূর্যের পক্ষে চন্দ্রকে ধরে ফেলা সম্ভব নয় এবং রাতও দিনের আগে চলে যেতে পারে না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।
এই আয়াতগুলোর সম্মিলিত বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন উপাদানকে কোরআন একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সূর্য, চন্দ্র, রাত ও দিনের কথা একসঙ্গে উল্লেখ করার মাধ্যমে মানুষের সামনে সেই ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য শুধু প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর বর্ণনা দেওয়া নয়। বরং এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, সৃষ্টির শৃঙ্খলা নিয়ে চিন্তা করা এবং সেই শৃঙ্খলার পেছনে আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞানের নিদর্শন উপলব্ধি করা।
অন্য আয়াতেও সূর্য ও চন্দ্রের নির্ধারিত ব্যবস্থার উল্লেখ
সূর্য ও চন্দ্রের প্রসঙ্গ কেবল সূরা ইয়াসিনের ৩৮ নম্বর আয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। পবিত্র কোরআনের অন্যান্য স্থানেও এ বিষয়ে বক্তব্য এসেছে।
সূরা আল-আম্বিয়ার ২১ নম্বর সূরার ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।
এই আয়াতের বক্তব্য সূরা ইয়াসিনের ৩৮ থেকে ৪০ নম্বর আয়াতের আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উভয় স্থানেই সূর্য ও চন্দ্রের চলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং সৃষ্টিজগতের ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে।
আবার সূরা আর-রহমানের ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সূর্য ও চন্দ্র নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী চলছে।
এখানেও সূর্য ও চন্দ্রের ব্যবস্থার সঙ্গে নির্ধারিত হিসাবের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে একই ধরনের একটি মূল শিক্ষা পাওয়া যায়। সৃষ্টিজগতের চলমান ব্যবস্থা আল্লাহর নির্ধারণের বাইরে নয়।
সূরা ইবরাহিমের ১৪ নম্বর সূরার ৩৩ নম্বর আয়াতে সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মিত কার্যরত রাখার কথা এবং রাত ও দিনকে মানুষের উপকারে নিয়োজিত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই আয়াতগুলোর আলোকে উপলব্ধি করা যায়, সূর্য ও চন্দ্রের প্রসঙ্গ কোরআনে শুধু প্রকৃতির বর্ণনা হিসেবে আসেনি। এগুলো আল্লাহর সৃষ্টি, ক্ষমতা এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে সৃষ্টিজগতের সম্পর্ক বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
সূর্যের আলো মানুষের জন্য একটি নিদর্শন
মানুষের দৈনন্দিন জীবন সূর্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দিনের আলোতে মানুষ কাজ করে, চলাফেরা করে এবং জীবনের নানা প্রয়োজন পূরণ করে। সূর্য অস্ত গেলে পরিবেশে অন্ধকার নেমে আসে। রাত ও দিনের এই পরিচিত পরিবর্তন মানুষের সামনে প্রতিনিয়ত উপস্থিত থাকে।
কোরআন এই পরিচিত ঘটনাগুলোকে চিন্তার বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। সূরা ইয়াসিনের ৩৭ নম্বর আয়াতে রাতের প্রসঙ্গ, ৩৮ নম্বর আয়াতে সূর্যের চলা, ৩৯ নম্বর আয়াতে চন্দ্রের পর্যায় এবং ৪০ নম্বর আয়াতে তাদের পারস্পরিক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, কোরআন মানুষকে নিজের চারপাশের জগত সম্পর্কে সচেতন হতে উৎসাহিত করে। যে ঘটনাগুলো প্রতিদিন চোখের সামনে ঘটে, সেগুলোও মানুষের চিন্তা ও উপলব্ধির বিষয় হতে পারে।
এখানে একটি বাস্তব শিক্ষা রয়েছে। পরিচিত কোনো বিষয়কে শুধু অভ্যাসের কারণে অবহেলা করা উচিত নয়। বরং প্রকৃতির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে মানুষ সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে। কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই শৃঙ্খলা আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞানের নিদর্শন।
সূর্যের চলার প্রসঙ্গ তাই মানুষকে শুধু আকাশের দিকে তাকাতে বলে না, বরং সেই দৃশ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানায়।
কোরআনের আলোকে মানুষের করণীয় কী?
সূরা ইয়াসিনের ৩৮ নম্বর আয়াত থেকে মানুষের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা যায়।
প্রথমত, সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করা উচিত। সূর্য, চন্দ্র, রাত ও দিনের মতো পরিচিত ঘটনাগুলোকে কোরআন মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে এনেছে। এগুলো পর্যবেক্ষণ করে সৃষ্টির শৃঙ্খলা সম্পর্কে চিন্তা করা যায়।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। আয়াতটি সূর্যের চলার ব্যবস্থাকে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর নির্ধারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে সৃষ্টিজগতের নিদর্শন মানুষকে স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, আল্লাহর জ্ঞানের প্রতি বিশ্বাস রাখা এই আয়াতের আরেকটি শিক্ষা। আল্লাহকে এখানে সর্বজ্ঞ বলা হয়েছে। এই গুণ মানুষের মনে স্মরণ করিয়ে দেয় যে তাঁর জ্ঞান সীমাহীন।
চতুর্থত, কোরআনের বক্তব্য বুঝতে আয়াতের প্রসঙ্গ বিবেচনা করা প্রয়োজন। সূর্যের চলা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এর আগের ও পরের আয়াতগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি একই বিষয় সম্পর্কে কোরআনের অন্য আয়াতগুলো বিবেচনা করলে বক্তব্যটি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।
পঞ্চমত, কোরআনের নামে এমন বক্তব্য প্রচার করা উচিত নয়, যা আয়াতের মধ্যে সরাসরি নেই। কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা নির্দিষ্ট তত্ত্বের সঙ্গে আয়াতের সম্পর্ক তুলে ধরতে হলে প্রমাণ ও যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আয়াতের প্রকৃত বক্তব্য এবং মানুষের ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
এই শিক্ষাগুলো মানুষকে সৃষ্টিজগতের প্রতি মনোযোগী, চিন্তাশীল এবং আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করে।
উপসংহার: সূর্যের চলার মধ্যে সৃষ্টির শৃঙ্খলার বার্তা
সূরা ইয়াসিনের ৩৮ নম্বর আয়াত সূর্যের চলার কথা উল্লেখ করে একটি গভীর শিক্ষা সামনে আনে। সূর্য তার নির্ধারিত পথে চলে এবং এই ব্যবস্থাকে কোরআন মহাপরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ বলে ঘোষণা করেছে।
আয়াতটির গুরুত্ব শুধু সূর্যের চলার বর্ণনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে মানুষকে সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ করতে এবং সেই শৃঙ্খলার তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
সূরা ইয়াসিনের ৩৭ থেকে ৪০ নম্বর আয়াত এবং সূরা আল-আম্বিয়ার ৩৩ নম্বর আয়াতের আলোকে রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্রের প্রসঙ্গ একসঙ্গে বিবেচনা করলে এই শিক্ষা আরও স্পষ্ট হয়। কোরআন সৃষ্টিজগতের এসব নিদর্শনের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রতিদিন সূর্যের আলো দেখা মানুষের কাছে স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু কোরআনের আলোকে এই পরিচিত দৃশ্যও চিন্তা, উপলব্ধি এবং আত্মসমীক্ষার উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে। সূর্যের নির্ধারিত চলার কথা স্মরণ করে মানুষ সৃষ্টির শৃঙ্খলা সম্পর্কে ভাবতে পারে এবং মহাপরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর মহিমা উপলব্ধি করতে পারে।
মূল বার্তা: সূর্যের নির্ধারিত চলা কোরআনে আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞানের একটি নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই নিদর্শন মানুষকে সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করতে এবং স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করতে আহ্বান জানায়।
কোরআনিক সূত্র: সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৩৭ থেকে ৪০; সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩৩; সূরা আর-রহমান, ৫৫:৫; সূরা ইবরাহিম, ১৪:৩৩।