×
×
Saturday, 7 November, 2026, 10:41 am


নানা পাটেকার আর নেই

নানা পাটেকরের প্রয়াণে ভারতীয় সিনেমায় শোকের ছায়া, ৭৫ বছরে থামল শক্তিমান অভিনেতার পথচলা

গোয়ার নিজ বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু, ৪৫ মিনিটের চেষ্টাতেও ফেরানো গেল না কিংবদন্তি অভিনেতাকে

ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিমান ও স্বতন্ত্র অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর সকালে গোয়ার ডোনা পাউলায় নিজ বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ভোরে নিজ বাসভবনে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় নানা পাটেকরকে। পরে দ্রুত তাঁকে গোয়ার মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআরসহ তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২০ মিনিটের দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

চিকিৎসকের বক্তব্য

মণিপাল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক ডা. শেখর সালকার সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানান, দীর্ঘ সময় ধরে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালানো হলেও নানা পাটেকরকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় একটি মেডিকো-লিগ্যাল কেস বা এমএলসি নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং মৃত্যুর বিষয়টি আরও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে হৃদ্‌রোগজনিত আকস্মিক মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক তথ্য পরবর্তীতে আরও প্রকাশিত হতে পারে।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নিজস্ব এক স্বাক্ষর

নানা পাটেকরের প্রকৃত নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা কয়েক দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে নিজের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করেন।

তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রের ভেতরের আবেগ, তীব্রতা এবং সংলাপ পরিবেশনের স্বতন্ত্র ধরন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি অনেক সময় সংলাপের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠত। নাট্যচর্চা দিয়ে অভিনয়জীবনের শুরু করে ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সিনেমায় প্রবেশ করেন তিনি।

‘পরিন্দা’ থেকে ‘ক্রান্তিবীর’, ‘ওয়েলকাম’ পর্যন্ত

নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারে অসংখ্য স্মরণীয় চলচ্চিত্র রয়েছে। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘অব তক ছাপ্পান’ এবং ‘ওয়েলকাম’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

গম্ভীর ও তীব্র চরিত্রের পাশাপাশি কমেডিতেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন তিনি। ‘ওয়েলকাম’ ছবির উদয় শেঠি চরিত্রটি তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। মারাঠি চলচ্চিত্র ‘নটসম্রাট’-এও তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

জাতীয় পুরস্কার ও পদ্মশ্রী

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে নানা পাটেকর তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর অভিনয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ধারায় বিশেষ মর্যাদা তৈরি করে।

২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি পরিচালক ও লেখক হিসেবেও কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে নির্মাতা হিসেবেও নিজের সক্ষমতার পরিচয় দেন।

শেষ হলো এক দীর্ঘ ও বর্ণময় অধ্যায়

চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা পাটেকর ভারতীয় সিনেমায় এমন এক অভিনয়ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা তাঁকে সমসাময়িক অনেক অভিনেতার থেকে আলাদা করে রেখেছিল। কখনো তীব্র ও প্রতিবাদী চরিত্রে, কখনো সংবেদনশীল ভূমিকায়, আবার কখনো হাস্যরসাত্মক চরিত্রে তিনি দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।

তাঁর মৃত্যু শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার বিদায় নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি স্বতন্ত্র অভিনয়-অধ্যায়েরও সমাপ্তি। নানা পাটেকরের অভিনীত চরিত্র ও চলচ্চিত্রগুলোই এখন তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনের স্মৃতি হয়ে দর্শকের কাছে থেকে যাবে।

[atn_photocard]
আরও