ঢাকা–বেইজিং সম্পর্কের নতুন অধ্যায়: প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা
বাংলাদেশে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে আগামী জুনের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীন সফরে আমন্ত্রণ জানাতে আগ্রহী বেইজিং। প্রস্তাবিত এই সফর দুই দিনের বেশি সময়ব্যাপী হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সফরটি এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি চূড়ান্ত হয়নি। তবে প্রাথমিক আলোচনায় উঠে এসেছে, বেইজিং পৌঁছানোর দিনই প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে তার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, চীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার এবং সুবিধাজনক সময়ে প্রধানমন্ত্রী দেশটি সফর করবেন।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যে বিষয়গুলো
সম্ভাব্য এই সফরে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে পারে
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
চীনা শিল্পকারখানা স্থানান্তর
অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর করা
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন
মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন
গুয়াংজু-চট্টগ্রাম ও সাংহাই-চট্টগ্রাম সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালু
চীনের বৈশ্বিক উদ্যোগ ও বাংলাদেশের অবস্থান
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব বাড়াতে চারটি বড় বৈশ্বিক উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (GDI), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (GSI), গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (GCI) এবং গ্লোবাল গভার্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ (GGI)। এসব উদ্যোগ চীনের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে GDI ও GSI উদ্যোগে বাংলাদেশকে যুক্ত করার জন্য গত কয়েক বছর ধরে চীন সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আসন্ন সফরে এ বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
আঞ্চলিক জোট নিয়ে নতুন কৌশল
চীন শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যেও বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ত্রিদেশীয় উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চললেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তীতে চার দেশীয় একটি আঞ্চলিক ফোরামের প্রস্তাব সামনে আসে, যেখানে বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান ও মিয়ানমারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এলেও এর পেছনে চীনের ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে সে সময় অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়।
ঢাকার কৌশলগত বিবেচনা
বর্তমান সরকার আঞ্চলিক জোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কোনো নতুন জোটে যুক্ত হওয়ার আগে কৌশলগত বিশ্লেষণ জরুরি।
বাংলাদেশ যখন সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন নতুন কোনো আঞ্চলিক কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় নেওয়াই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা।
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক মন্তব্য করেছেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের প্রভাব বৈশ্বিক সম্পর্কের ওপর পড়ছে। ফলে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে সেই দেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সমাপনী পর্যবেক্ষণ
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই সফর দেশের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করার একটি উল্লেখযোগ্য সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।