আল্লাহর আয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মানবতার সবচেয়ে বড় জুলুম
“আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে, যাকে তার রবের আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দেওয়া হয়, তারপরও সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? নিশ্চয়ই আমি অপরাধীদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব।” সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত ২২
মানবজীবনের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং আখিরাতের জবাবদিহিতার প্রশ্নে পবিত্র কোরআন অত্যন্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সূরা আস-সাজদাহ-এর ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন এক গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছেন, যারা উপদেশ পাওয়ার পরও তা উপেক্ষা করে। এই আয়াত মানবজাতির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা বহন করে।
আয়াতটিতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি তার রবের আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে বড় যালিম আর কেউ হতে পারে না। এখানে “যুলুম” শব্দটি কেবল অন্যায় বা অত্যাচারের সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং এটি আত্মার উপর সবচেয়ে বড় অবিচারকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, সত্য জানার পরও তা অস্বীকার করা বা অবজ্ঞা করা মানবতার চরম বিপর্যয়।
“মুখ ফিরিয়ে নেওয়া” বলতে শুধু শারীরিকভাবে দূরে সরে যাওয়া বোঝায় না। বরং এর অর্থ হলো কোরআনের বাণী শোনার পরও তা হৃদয়ে ধারণ না করা, জীবনযাত্রায় প্রয়োগ না করা এবং অহংকার বা দুনিয়াবী স্বার্থের কারণে তা অগ্রাহ্য করা। এমন আচরণ ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে কঠিন করে তোলে এবং সত্য গ্রহণের পথ রুদ্ধ করে দেয়।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তিনি অপরাধীদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। এখানে “অপরাধী” বলতে তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে, যারা বারবার সতর্ক হওয়ার পরও নিজেদের সংশোধন করে না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। এই প্রতিশোধ দুনিয়াতেও বিভিন্ন বিপদ ও অশান্তির মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে, আর আখিরাতে এর শাস্তি হবে আরও কঠিন।
কোরআনের অন্যান্য আয়াতেও একই ধরনের বার্তা পুনরাবৃত্ত হয়েছে।
🔹 যারা সত্য জেনেও অস্বীকার করে, তাদের হৃদয় সীলমোহর করে দেওয়া হয়।সূরা আল-বাকারাহ (২:৬-৭)
🔹 সবচেয়ে বড় যালিম সে, যাকে তার রবের আয়াত স্মরণ করানো হয়, অথচ সে তা ভুলে যায়।
সূরা আল-কাহফ (১৮:৫৭)
👉 এই দুই আয়াত ৩২:২২-এর বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করে।
এই আয়াত বর্তমান সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ভোগবাদ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাধারার কারণে অনেকেই ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ কোরআন কেবল তিলাওয়াতের জন্য নয়; বরং তা মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের জন্য নাজিল হয়েছে।
এই আয়াত থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রত্যেক মানুষের উচিত কোরআনের বাণীকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা, তা বোঝার চেষ্টা করা এবং দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে অহংকার ও উদাসীনতা পরিহার করে আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব।
সবশেষে বলা যায়, সূরা আস-সাজদাহ (৩২:২২) আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে আমরা কি সেই মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছি, যারা সত্য জানার পরও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ? এই আত্মসমালোচনাই হতে পারে সঠিক পথের সূচনা।