আইনবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি কি
আইনবিজ্ঞানের সংজ্ঞার ন্যায় আইনবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি নিয়েও আইনবিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। এর প্রকৃতি কি হবে তা নিয়ে যেমন ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে, তেমনি পরিধি কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে তা নিয়ে একাধিক মতবাদ রয়েছে। নিম্নে আইনবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি আলোচনা করা হলো।
আইনবিজ্ঞানের প্রকৃতিঃ
(১) সার্বজনীন বিদ্যাঃ আইনবিজ্ঞান আইনের মৌলিক নীতিসমূহ ব্যাখ্যা করে এবং বিভিন্ন আইনের বিবরণসহ তাদের মধ্যে যে ঐক্য বিদ্যমান সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।
(২) মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণঃ সমাজিক মূল্যবোধ সাধারণতঃ মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কারণ, নিষ্ঠাবান প্রতিটি মানুষ সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াকে সম্মানজনক মনে করেন। আইনবিজ্ঞান এই মৌলিক নীতি সম্পর্কে আলোচনা করে।
(৩) আইনগত পর্যালোচনাঃ আইনবিজ্ঞান আইন দ্বারা বিবেচিত আচার, আচরণ প্রভৃতি বিষয় পর্যালোচনাপূর্বক সামাজিক ব্যবস্থাসমূহকে আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করে।
(৪) আইনের দর্শনঃ আইনবিজ্ঞান নতুন কোন বিধি উদ্ঘাটন করে না। বরং পুরাতন বিধিসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করে। কাজেই আইনবিজ্ঞানকে আইনের দর্শনও বলা হয়।
(৫) আইনগত বিধির স্বরূপ উদ্ঘাটনঃ‘ আইনবিজ্ঞানে আইনগত বিধি-বিধানের প্রকৃতি, আইনগত ধারণাসমূহের অন্তর্নিহিত অর্থ ও আইন ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। আইনবিজ্ঞান দ্বারা আইনগত বিধির স্বরূপ এবং আইনের সাথে নৈতিকতা বা শিষ্টাচার ইত্যাদির পার্থক্য অনুসন্ধান করা হয়।
পরিশেষে বলতে হয়, প্রখ্যাত আইনবিজ্ঞানী অধ্যাপক প্যাটন আইনবিজ্ঞানের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন যে, ‘আইনবিজ্ঞান শুধু একটি দেশের আইন পর্যালোচনা করে না বরং বিশ্বের সমগ্র আইন ব্যবস্থার উপর আলোচনা করে।’ কাজেই আইনবিজ্ঞানকে সমাজ-দর্শনের প্রতিচ্ছবি বলা যেতে পারে।
আইনবিজ্ঞানের পরিধিঃ
আইনবিজ্ঞান সম্পর্কে বিভিন্ন আইনবিজ্ঞানীর ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিচার-বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা করলে আইনবিজ্ঞানের যে পরিধি বা বিষয়বস্তু পরিলক্ষিত হয় তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
(১) ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়তঃ আইনের প্রধান লক্ষ্য হলো ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন।’ অর্থাৎ সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা। আইনবিজ্ঞান বিচার প্রশাসন নিয়ে আলোচনা করে এর পরিধিকে ব্যাপকতর করেছে।
(২) স্যামন্ডের মতে আইনবিজ্ঞানের পরিধিঃ অধ্যাপক স্যামন্ডের মতে, আইনবিজ্ঞানের পরিধির মধ্যে আইনের তিন ধরণের ব্যাখ্যা রয়েছে- (ক) আইনের গবেষণামূলক বিশ্লেষণ, (খ) আইনের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, (গ) আইনের নৈতিক বা সার্শনিক বিশ্লেষণ।
(৩) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলোচনাঃ আইনবিজ্ঞান আইনগত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি ও ক্রমবিকাশ আলোচনাপূর্বক সমাজের সাথে এর সম্পর্ক কি তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে।
(৪) আইনের ভালো-মন্দ পর্যালোচনাঃ আইনের কোন কোন বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন দেশের জনগণের জন্য মঙ্গলজনক আর কোন কোন বৈশিষ্ট্য অমঙ্গলজনক তা পর্যালোচনার মাধ্যমে আইনবিজ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে।
(৫) মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণে সহায়তাঃ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই মূলত: সমাজে আইন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আইন মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। আইনবিজ্ঞান মানুষের সামাজিক স্বার্থ কিভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সেই সম্পর্কে আলোচনা করে এর পরিধিকে বিস্তৃত করেছে।
(৬) আইনের উপর প্রভাব বিস্তারঃ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্নভাবে যুগে যুগে আইনের উপর নানান প্রভাব বিস্তার করেছে। যেমন- রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক প্রভাব, অর্থনৈতিক প্রভাব ইত্যাদি। এই সকল প্রভাব ব্যাখ্যার ফলে আইনবিজ্ঞানের পরিধি ব্যাপকতর হয়েছে।
(৭) আইনগত ধারণার ব্যাখ্যা প্রদানঃ আইনবিজ্ঞান মানুষের অধিকার-কর্তব্য, অবহেলা, মালিকানা, দখল ইত্যাদি বিষয়ের সাধারণ অর্থ যেমন আলোচনা করে, তেমনি এর আইনগত অর্থও আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে। যারফলে এর পরিধি ব্যাপকতর হয়েছে।
(৮) ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানের সম্মেলনঃ আধুনিক ও সভ্য সমাজ বিনির্মাণে সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হয়। যেমন: রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, পৌরনীতি, ধর্মীয় দর্শন বা আদর্শ, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি। ভিন্ন ভিন্ন এই সকল জ্ঞানের সংমিশ্রণ ও সমাহার আইনবিজ্ঞানের পরিধিকে অধিক থেকে অধিকতর পরিব্যাপ্ত করেছে।
(৯) বিভিন্ন মতবাদ বিশ্লেষণ: আইনবিজ্ঞান বিভিন্ন মতবাদ বিশ্লেষণ করে থাকে। যেমন:
(i) ঐতিহাসিক মতবাদ
(ii) বিশ্লেষণাত্মক মতবাদ,
(iii) নৈতিক মতবাদ, সমাজতান্ত্রিক মতবাদ,
(v) দার্শনিক মতবাদ,
(vi) তুলনামূলক মতবাদ ইত্যাদি।
পরিশেষে বলা যায়, আইনবিজ্ঞান যেহেতু সকল আইনের উৎস, সেহেতু এই বিজ্ঞানের পরিধি নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিধি ব্যাপক।