নারীর মর্যাদা ও ইসলামঃ
মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারীর মর্যাদা সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। চতুর্দশ শতাব্দী আগে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নারীকে সম্পদ ও ভোগ্যের পণ্য হিসেবে গণ্য করা হতো, তখন কোরআন নারীকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে ঘোষণা দেয়। নারী ও পুরুষের মাঝে মর্যাদার কোনো পার্থক্য না রেখে কোরআন কেবল তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নির্ধারণ করে।
১. সৃষ্টিগত মর্যাদা ও আত্মিক সাম্য
কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, নারী ও পুরুষ একই উৎস থেকে সৃষ্ট। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন; আর তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন।” (সূরা নিসা: ৪:১)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নারীর সৃষ্টিগত কোনো হীনতা নেই। বরং নারী ও পুরুষ উভয়েই সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ সত্তা। কোরআন আরও বলে:
“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” (সূরা বনী ইসরাইল: ১৭:৭০)
এই মর্যাদা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
২. আর্থিক ও সম্পদের অধিকার
প্রাক-ইসলামি যুগে নারীর কোনো সম্পদের মালিকানা ছিল না। কোরআন প্রথমবারের মতো নারীকে স্বতন্ত্র মালিকানা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রদান করে। আল্লাহ বলেন:
“তোমরা যা অর্জন কর, তা থেকে পুরুষদের অংশ রয়েছে এবং তারা যা অর্জন করে তা থেকে নারীদেরও অংশ রয়েছে।” (সূরা নিসা: ৪:৩২)
এছাড়া নারীদের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে কোরআন বলে:
“পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ রয়েছে এবং পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ রয়েছে।” (সূরা নিসা: ৪:৭)
৩. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক: ভালোবাসা ও সমতার বন্ধন
কোরআন দাম্পত্য সম্পর্ককে অত্যন্ত সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা করে। স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের জন্য “পোশাক” বলে অভিহিত করা হয়েছে:
“তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ।” (সূরা বাকারা: ২:১৮৭)
পোশাক যেমন শরীরকে আবৃত করে, রক্ষা করে ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য সুরক্ষা, সান্ত্বনা ও শোভা বর্ধনকারী। আরও একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন:
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে হলো যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকতে পার এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা রুম: ৩০:২১)
৪. চারিত্রিক ও নৈতিক মর্যাদা
কোরআন নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই পবিত্রতা ও সচ্চরিত্র রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। পর্দার বিধান সম্পর্কে বলতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এটা তাদেরকে চেনার সহজ উপায়, ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না।” (সূরা আহযাব: ৩৩:৫৯)
এটি নারীর শালীনতা রক্ষা এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি নির্দেশনা, যা তাদের সম্মান বৃদ্ধি করে।
৫. পুরুষের দায়িত্ব ও নারীর প্রতি নির্দেশনা
কোরআনে পুরুষদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নারীদের সাথে সদয় ব্যবহার করতে:
“তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর।” (সূরা নিসা: ৪:১৯)
একইসঙ্গে, নারী-পুরুষ উভয়েরই পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও ইনসাফের কথা বলা হয়েছে। নারীদের অধিকার যেমন আছে, তেমনি তাদের কর্তব্যও আছে এবং এ ব্যাপারে কোরআন সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
৬. ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা
ধর্মীয় ইবাদত ও আধ্যাত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেন:
“নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী পুরুষ ও হেফাজতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও স্মরণকারী নারী — তাদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” (সূরা আহযাব: ৩৩:৩৫)
পবিত্র কোরআন নারীকে কখনোই পুরুষের অধীনস্থ বা নিকৃষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করেনি; বরং তাকে একজন সম্মানিত, স্বাধীন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নারী ও পুরুষ উভয়েই মানবতার দুই চিরন্তন স্তম্ভ, যারা পরস্পরের পরিপূরক। কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করলেই নারীর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।