খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা
বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে যেমন কিছু সূচকে উন্নতি দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে নানা ধরনের সংকট সেই অগ্রগতিকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এই ধারা বৈশ্বিক বাজারকে অস্থির করে তুলছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে । মূলত কয়েকটি বড় শক্তি মিলে এই অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।
বৈশ্বিক খাদ্য বাজারের অস্থিরতার প্রধান কারণসমূহ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য বাজারের এই চরম অস্থিরতার জন্য প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন :
· জলবায়ু পরিবর্তন: খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সরবরাম শৃঙ্খলে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং দাম বেড়ে যাচ্ছে । পাশাপাশি, বিভিন্ন দেশের অনিয়মিত ও অনিশ্চিত জলবায়ু নীতিও খাদ্যের দামে অস্থিরতা তৈরি করার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে ২০১৫ সালের পর থেকে এই প্রভাব আরও প্রকট ।
· ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও দ্বন্দ্ব: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এর একটি বড় উদাহরণ। এই দুটি দেশ গম ও সূর্যমুখী তেলের মতো পণ্যের বড় সরবরাহকারী হওয়ায় যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে দাম আকাশচুম্বী হয় এবং যোগান ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয় । ইন্ডিয়ার মতো দেশ চাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ নীতি বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে ।
· অর্থনৈতিক কারণ: কোভিড-১৯ মহামারীর সময় বিভিন্ন দেশে উদ্দীপনা প্যাকেজ দেওয়ার ফলে চাহিদা বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। পরবর্তীতে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানি তেল ও সারের দাম বেড়ে যায়, যা কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয় ।
এছাড়াও, খাদ্যপণ্যের “আর্থিকীকরণ” নামে আরেকটি নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দার সময় বড় বড় বিনিয়োগকারীরা মুনাফার জন্য খাদ্যশস্যকে পণ্য না ভেবে আর্থিক সম্পদ হিসেবে দেখে শেয়ারবাজারে কেনাবেচা করে। এর ফলে যোগান-চাহিদার সঙ্গে সম্পর্ক না রেখেই দাম কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার সময় এর প্রভাব স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল ।
মানুষের জীবনে প্রভাব ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
এই অস্থিরতার প্রাণভোমরা হল সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অনেকে বাধ্য হয়ে কম পুষ্টিকর খাবার খান, খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেন, এমনকি অনেক সময় নারী ও শিশুরা খাদ্য বঞ্চনার শিকার হন । খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ বেড়ে গেলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩.৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে ।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের পরামর্শ দিচ্ছেন :
· দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা।
· খাদ্য রপ্তানিতে বাধা ও সংকট সৃষ্টি করে এমন নীতি এড়িয়ে চলা।
· কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে জলবায়ু-সহনশীল ফসল ও উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করা ।
· আন্তর্জাতিক বাজারে স্বচ্ছতা ও সমন্বয় বাড়ানো।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমে ৬৭.৩ কোটি হয়েছে। তবে আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার মতো অঞ্চলে এখনও এই সংখ্যা বাড়ছে । গমের বাজারে অস্থিরতা এখনও রয়েছে এবং মজুতও অনেক কম । অর্থাৎ, ভবিষ্যতে আবারও বড় ধাক্কা আসার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সংক্ষেপে, বর্তমান বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা একটি ভঙ্গুর ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক কারণগুলোর জটিল মিশ্রণ আগামী দিনেও খাদ্য বাজারকে অস্থির রাখতে পারে। এই বাস্তবতা মোকাবিলায় সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে একটি টেকসই ও সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয় এমন খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়।