ক্ষমতার গোলকধাঁধাঃ ডিপস্টেটের সন্ধানে
ধারণার উৎপত্তি ও সংজ্ঞা
“ডিপ স্টেট” শব্দটির উৎপত্তি তুরস্কে। তুর্কি শব্দ “দেরিন দেভলেত” (derin devlet) থেকে এটি এসেছে, যা ১৯৯০-এর দশকে সুসুরলুক কেলেংকারির পর ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে । সাধারণ সংজ্ঞা অনুযায়ী, ডিপস্টেট হলো সরকারি কর্মকর্তা (বিশেষ করে গোয়েন্দা, সামরিক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী), এবং বেসরকারি খাতের (অর্থ ও প্রতিরক্ষা শিল্প) কিছু শক্তিশালী ব্যক্তির একটি গোপন জোট, যারা নির্বাচিত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে নীতি নির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখে ।
মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধান অনুসারে, এটি একটি “অভিযোগকারী গোপন নেটওয়ার্ক” যা অবৈধভাবে সরকারি নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে । এই ধারণা অনুযায়ী, ডিপস্টেটের শক্তি আসে তার সদস্যদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, সম্পর্ক, বিশেষ দক্ষতা এবং ঐতিহ্য থেকে, যা তাদের একপ্রকার “অতি-সরকার”-এ পরিণত করে, যারা কারও কাছে জবাবদিহি করে না ।
ডিপস্টেটের মূল বৈশিষ্ট্য ও কাঠামো
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপস্টেটের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
· অনির্বাচিত ও জবাবদিহিহীন: এর সদস্যরা নির্বাচিত নন এবং ভোটারদের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করেন না। তাদের বাজেট ও কার্যকলাপ প্রায়ই গোপন রাখা হয় ।
· স্থায়ীত্ব: নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলেও ডিপস্টেটের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা এলেই গেলেন, কিন্তু আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা বহাল থাকেন ।
· বহুমাত্রিক নেটওয়ার্ক: এটি কেবল সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্তর্ভুক্ত হল :
· গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা: সিআইএ, এফবিআই-এর মতো সংস্থা।
· সামরিক ও কূটনৈতিক মহল: পেন্টাগন ও পররাষ্ট্র দপ্তরের উচ্চপদস্থ আমলা।
· আর্থিক ও কর্পোরেট খাত: ওয়াল স্ট্রিট, বড় ব্যাংক ও বহুজাতিক কর্পোরেশন।
· মিডিয়া ও থিঙ্ক ট্যাংক: প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ও নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
কাদেরকে ‘ডিপস্টেট’ বলা হয়?
ডিপস্টেটের সদস্য কারা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কারা এই কাঠামোর অংশ, তা নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। তবে কিছু গোষ্ঠী ও ব্যক্তিকে প্রায়ই এই প্রসঙ্গে চিহ্নিত করা হয়:
১. প্রাতিষ্ঠানিক ও বর্ণনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে:
মূলধারার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডিপস্টেটের অংশ হলেন সেইসব উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী ও ঠিকা কর্মী, যারা দীর্ঘদিন ধরে একই পদে থেকে যান এবং নির্বাচিত প্রশাসনের নীতির সাথে একমত না হলে তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করেন বা বাধা দেন। যেমন: গোয়েন্দা বিশ্লেষক, সামরিক জেনারেল, মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিবরা ।
২. রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে (বিশেষ করে মার্কিন প্রেক্ষাপটে):
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক ও তাঁর প্রশাসনের কিছু সদস্য “ডিপস্টেট” বলতে বোঝান সেই সমস্ত ব্যক্তিদের, যারা ট্রাম্পের নীতি ও এজেন্ডার বিরোধিতা করেছিলেন। ২০২২ সালে ট্রাম্পের এফবিআই পরিচালক পদে মনোনীত কাশ প্যাটেল তাঁর বই “গভর্নমেন্ট গ্যাংস্টারস”-এ ৬০ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেন, যাদের তিনি “কার্যনির্বাহী শাখার ডিপস্টেটের সদস্য” বলে অভিহিত করেন । এই তালিকায় উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলেরই ব্যক্তিরা ছিলেন, যেমন:
· রিপাবলিকান: বিল বার (অ্যাটর্নি জেনারেল), জন বোল্টন (জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা), জিনা হাসপেল (সিআইএ প্রধান), ক্রিস্টোফার রে (এফবিআই পরিচালক)।
· ডেমোক্র্যাট: জো বাইডেন (প্রেসিডেন্ট), কামালা হ্যারিস (ভাইস প্রেসিডেন্ট), হিলারি ক্লিনটন (পররাষ্ট্রমন্ত্রী), সুসান রাইস (জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা)।
· গোয়েন্দা ও আইন কর্মকর্তা: জেমস কোমি, অ্যান্ড্রু ম্যাককেব, পিটার স্ট্রজক, লিসা পেজ, জন ব্রেনান, জেমস ক্ল্যাপার।
· অন্যান্য: মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, বিশেষ কাউন্সেল (রবার্ট মুলার)।
৩. অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে:
অনেক সমালোচক, যেমন সাবেক কংগ্রেসনাল স্টাফ মাইক লফগ্রেন, মনে করেন প্রকৃত ডিপস্টেট হলো অর্থের শক্তি। তাঁর মতে, এটি “কর্পোরেট এবং বেসরকারি প্রভাবের একটি নেটওয়ার্ক যার হাতে সীমাহীন অর্থ রয়েছে” এবং এই নেটওয়ার্কই মূলত নীতি নির্ধারণ করে, কোন দল ক্ষমতায় থাকুক না কেন । এই দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, শীর্ষস্থানীয় অর্থদাতা, লবিস্ট এবং কর্পোরেট প্রধানরাই প্রকৃত ডিপস্টেটের সদস্য, যারা নির্বাচিত কর্মকর্তাদের এজেন্ডা নিয়ন্ত্রণ করেন ।
সমালোচনা ও বিতর্ক
“ডিপস্টেট” ধারণাটি ব্যাপকভাবে সমালোচিতও। অনেক রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ মনে করেন, এটি একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব মাত্র, যা সরকারের জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক গতিময়তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি কাল্পনিক শত্রু দাঁড় করায় । তাদের মতে, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে নীতিগত বিরোধ, আমলাতান্ত্রিক লালফিতার ফাঁদ এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর চাপই “ডিপস্টেট” নামে একটি সুসংহত ষড়যন্ত্রের ধারণা দেয়, যা বাস্তবসম্মত নয়।
বিবিসির একটি প্রামাণ্যচিত্রে এই ধারণাটিকে রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের একটি বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মানুষের রাজনৈতিক শক্তিহীনতার অনুভূতি এবং সরকার সম্পর্কে তাদের সন্দেহ-প্রবণতা প্রকাশ করে ।
উপসংহার
“ডিপস্টেট” বলতে কী বোঝায়, তা নির্ভর করে কে এই শব্দটি ব্যবহার করছেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে। এটি কখনও কখনও সরকারের গভীরে থাকা একটি সুনির্দিষ্ট ও ক্ষমতাধর নেটওয়ার্ককে বোঝায়, তো কখনও এটি একটি অস্পষ্ট ও বিতর্কিত ধারণা মাত্র, যা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে, নির্বাচিত সরকার ও স্থায়ী আমলাতন্ত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু “ডিপস্টেট” ধারণাটি সেই দ্বন্দ্বকে একটি সুসংহত ও গভীর ষড়যন্ত্রের রূপ দেয়, যা প্রকৃত ঘটনা অপেক্ষা কাল্পনিক হলেও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য।