×
×
Wednesday, 29 July, 2026, 12:54 pm


আমিরাতে ৫ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল

পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মভিসা বাতিলের অভিযোগে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে বিমানবন্দরেই ভিসা বাতিলের খবর পাচ্ছেন অনেকে। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছে লাখো প্রবাসীর ভবিষ্যৎ, বাড়ছে উদ্বেগ ও আর্থিক চাপ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে ভিসা বাতিলের আতঙ্ক। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় এই শ্রমবাজারে অনেকের কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে বিমানবন্দরে ভিসা বাতিলের তথ্য জানতে পারছেন অনেক প্রবাসী। এমনকি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ তাদের।

দেশে এখন বেশ কয়েক হাজার প্রবাসী শ্রমিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ফিরতে চান এমন প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেক প্রবাসী অনলাইনে তাদের ‘স্ট্যাটাস’ যাচাই করে দেখেছেন, তাদের ভিসা ‘ক্যানসেল’ দেখাচ্ছে।

ভিসা বাতিলের আশঙ্কায় দ্রুত কর্মস্থলে ফিরতে চাইছেন অনেকে। তবে এ সুযোগে একমুখী বিমান টিকিটের দামও বেড়ে গেছে। আগে ৩০-৩৫ হাজার টাকার টিকিট এখন কোথাও কোথাও ১ লাখ টাকায় পৌঁছেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রবাসীরা।

এক মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন আবুধাবি প্রবাসী নোয়াখালীর তাহের হোসেন। ৮ বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি লন্ড্রি দোকানে কাজ করেন তিনি। ২ বছর পর স্ত্রী-সন্তান আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে ছুটি কাটিয়ে রুটি-রুজির তাগিদে পুনরায় ফিরছিলেন কর্মস্থলে।

বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনে সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পৌঁছান আবুধাবি বিমানবন্দরে। সে দেশের ইমিগ্রেশন পার হতে গিয়েই আকাশ ভেঙে পড়ে তাহেরের মাথায়। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে জানান, তার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। ফলে তার প্রবেশের অনুমতি নেই। ফিরতে হবে বাংলাদেশেই।

এমন খবরে বিমানবন্দরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তাহের। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পরিবারের মুখ, ঋণের বোঝা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। শেষপর্যন্ত হতাশা আর অনিশ্চয়তা সঙ্গী করে শুক্রবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি।

তাহের হোসেন বলেন, ২ বছর পর পরিবারের সঙ্গে ১ মাস কাটিয়ে কাজে ফিরছিলাম। আবুধাবিতে নেমে জানতে পারি আমার ভিসা বাতিল। মনে হলো সব শেষ হয়ে গেছে। বিমানবন্দরেই বসে পড়ি। এখন কীভাবে সংসার চলবে, কেমন করে ঋণ শোধ করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

এমন ঘটনা শুধু তাহের হোসেনের একার নয়।

প্রবাসী শওকত আলী মীরন বলেন, আগামী সপ্তাহে ছুটিতে বাংলাদেশে যাওয়ার কথা। সে অনুযায়ী আগেই বিমান টিকিট কেটে রেখেছেন তিনি। কিন্তু এখন দেশে গেলে ভিসা বাতিল হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, একদিকে ভিসা হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে কষ্টার্জিত টাকায় কেনা টিকিটও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। গত ২ দিন ধরে দূতাবাসে যোগাযোগের চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছি না। কেউ কোনো তথ্য বা দিকনির্দেশনাও দিচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যা সমাধানে দূতাবাস কাজ করছে।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ প্রবাসীর আবেদনের তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ১ হাজার ৪০০টি আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সেগুলোও পর্যায়ক্রমে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

ভিসা বাতিলের শঙ্কায় নির্ধারিত ছুটি শেষ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে কর্মস্থলে ফিরতে চাইলেও নতুন বিপদ তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। একমুখী বিমান টিকিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে এয়ারলাইন্সগুলোর বিরুদ্ধে।

আগে যে টিকিট ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন একই টিকিটের দাম বেড়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকারও বেশি হয়েছে।

ভিসা বাতিল হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত নন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহপ্রবাসী এসএম করিম। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাতে দেশে এসেছিলেন তিনি। সাধারণ প্রবাসীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে জরুরি ভিত্তিতে কর্মস্থলে ফিরতে চাইলেও উচ্চমূল্যের বিমান টিকিটের কারণে ফিরতে পারছেন না।

এসএম করিম বলেন, টিকিটের জন্য পরিচিত এক ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে কথা বলেছি। কয়েকদিন আগেও যে টিকিট ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন একই টিকিটের জন্য ৯৫ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। যে টাকা নিয়ে এসেছি খরচ করে ফেলেছি। এখন কিভাবে টিকিট কাটব বুঝতে পারছি না।

ভিসা বাতিলের ঘটনায় আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাস সোমবার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে জানায়, এটি কারিগরি ত্রুটি নাকি অন্য কোনো বিশেষ কারণে ঘটছে, তা জানার চেষ্টা চলছে।

একই সঙ্গে ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়া প্রবাসীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কোনো ব্যক্তি, দালাল বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যেন আর্থিক লেনদেন না করা হয়।

দূতাবাস আরও জানিয়েছে, ভিসাসংক্রান্ত যে কোনো জটিলতায় প্রবাসীদের সরকারি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরাসরি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। পাকিস্তান, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশের কর্মীদের ক্ষেত্রেও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একই ধরনের ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, ঠিক কী কারণে এটি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই এর কারণ জানা যাবে। এ বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে ফিরলে কূটনৈতিক চ্যানেলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ২২ জুলাই থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনা সামনে আসতে শুরু করে।

এ পরিস্থিতিতে অনেকেই বাংলাদেশ দূতাবাসে ধরনা দিচ্ছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ভিসা বাতিলের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়ায় ঠিক কতজনের ভিসা বাতিল হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশ হয়নি।

কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হচ্ছে, সে কারণও স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে চরম উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন প্রবাসীরা। তারা বলছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও কোনো সুস্পষ্ট তথ্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।

আরও