×
×
Sunday, 13 September, 2026, 4:22 am


আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে জেনে নিন এই ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

করদাতাদের মনে জাগা সাধারণ প্রশ্নের সহজ সমাধান

আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় ঘনিয়ে আসতেই অনেক করদাতার মনে একগুচ্ছ প্রশ্ন উঁকি দিতে শুরু করে। চাকরি পরিবর্তন, ব্যাংক হিসাবের সুদ, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের স্থিতি, উত্তরাধিকারের সম্পত্তি এমন অনেক বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় করদাতারা প্রায়ই দ্বিধায় পড়েন। ফলে রিটার্নে ভুল তথ্য দেওয়া বা কিছু আয়-সম্পদ বাদ পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে, যা পরবর্তীতে জটিলতা তৈরি করতে পারে।

জাতীয় রাজস্व বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৬ সালের আয়কর নির্দেশিকা অনুসরণ করে করদাতাদের জন্য সবচেয়ে প্রায়ই জিজ্ঞাসিত ১০টি প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরা হলো নিচে, যা রিটার্ন জমার আগে জানা থাকলে ভুল-বোঝাবুঝি ও অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি এড়ানো সহজ হবে।

১. চাকরি পরিবর্তন হলে কোন প্রতিষ্ঠানের আয় দেখাতে হবে

অনেকেই বছরের মাঝপথে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি বদল করেন। এমন অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, আয় বিবরণীতে কোন প্রতিষ্ঠানের আয় দেখাতে হবে। উত্তর হলো একই আয়বর্ষে যদি কেউ একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকেন, তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা আলাদা আলাদাভাবে আয় বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানের আয় দেখিয়ে দায় সারলে তা রিটার্নে অসম্পূর্ণ তথ্য বলে গণ্য হবে।

২. পুরোনো টিআইএন থাকলে নতুন করে নেওয়ার প্রয়োজন নেই

অনেকে বছরের পর বছর আগে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) নিয়েছেন, কিন্তু কোনো রিটার্ন জমা দেননি। তাদের প্রশ্ন রিটার্ন দাখিল করতে গেলে কি নতুন টিআইএন লাগবে? এনবিআরের নির্দেশনা স্পষ্ট করে বলছে, একবার টিআইএন গ্রহণ করলে তা সারাজীবনের জন্য বৈধ থাকে। ফলে পুরোনো টিআইএন দিয়েই রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে, নতুন করে নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই।

৩. সামান্য সুদ আয়ও রিটার্নে দেখাতে হবে

ব্যাংকের এফডিআর বা সঞ্চয়ী হিসাব থেকে পাওয়া সুদের পরিমাণ অনেকের কাছে নগণ্য মনে হয়, তাই তারা মনে করেন এটি বাদ দিলে সমস্যা হবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আয়কর আইন অনুযায়ী, আয়ের পরিমাণ যত কমই হোক, তা রিটার্নে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। এই তথ্য গোপন রাখলে ভবিষ্যতে অসামঞ্জস্যতা তৈরি হতে পারে, যা করদাতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

৪. বিকাশ-নগদ-রকেটের স্থিতি দেখাতে হবে নগদ অর্থ হিসেবে

দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএসের ব্যবহার ব্যাপক বেড়েছে। বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে থাকা অর্থ কীভাবে দেখাতে হবে, তা নিয়ে করদাতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। নিয়ম অনুযায়ী, অর্থবছরের ৩০ জুন তারিখে এই হিসাবগুলোতে থাকা স্থিতি “হাতে নগদ” খাতের অধীনে দেখাতে হবে।

৫. যৌথ ব্যাংক হিসাবে নিজের অংশ অনুযায়ী তথ্য দিতে হবে

স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যৌথ নামে ব্যাংক হিসাব থাকা বাংলাদেশে বেশ প্রচলিত। এমন হিসাবের ক্ষেত্রে করদাতার নিজের অংশীদারত্ব অনুযায়ী তথ্য রিটার্নে উপস্থাপন করতে হবে। অর্থাৎ পুরো হিসাবের পরিবর্তে করদাতার প্রকৃত অংশটুকুই হিসাব করে দেখাতে হবে।

৬. চাকরির বাইরের বাড়তি আয়ও গোপন রাখা যাবে না

চাকরির পাশাপাশি টিউশনি, পরামর্শ সেবা বা অন্য কোনো সূত্র থেকে আয় করা এখন অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু অনেকে এই বাড়তি আয়ের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করেন না। এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, করবর্ষে অর্জিত সব ধরনের আয়ের তথ্য রিটার্নে সম্পূর্ণভাবে প্রদর্শন করতে হবে, তা যে সূত্র থেকেই আসুক না কেন।

৭. জিপিএফের সুদ করমুক্ত হলেও রিটার্নে তুলতে হবে

সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে জিপিএফ (সাধারণ ভবিষ্য তহবিল) সংক্রান্ত একটি সাধারণ ভুল দেখা যায়। অনেকে বিনিয়োগ রেয়াতের জন্য জিপিএফে কাটা অর্থ দেখান, কিন্তু জিপিএফের মোট ব্যালেন্স ও তার ওপর পাওয়া সুদ উল্লেখ করেন না। নির্দেশিকা বলছে, জিপিএফের সুদ করমুক্ত হলেও তা রিটার্নে দেখাতে হবে, এবং জিপিএফের ক্রমবর্ধমান ব্যালেন্স অবশ্যই সম্পত্তি ও দায় বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৮. পুরোনো সম্পত্তির মূল্য দেখাতে হবে ক্রয়মূল্য অনুযায়ী, বাজারমূল্য নয়

সম্পত্তির মূল্যায়ন নিয়ে করদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়। ধরা যাক, কেউ কয়েক বছর আগে অল্প টাকায় একটি জমি কিনেছেন, যার বর্তমান বাজারদর অনেক বেড়ে গেছে। প্রথমবার করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে রিটার্ন দাখিলের সময় এই সম্পত্তির কোন মূল্য দেখাবেন তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে স্বাভাবিক। নিয়ম হলো, বর্তমান বাজারমূল্য যত কমই বা বেশিই হোক, রিটার্নে সব সময় সম্পদের মূল অর্জনমূল্য বা ক্রয়মূল্যই উল্লেখ করতে হবে।

৯. উত্তরাধিকারে পাওয়া সম্পত্তি দেখাতে হবে অর্জনকালীন বাজারমূল্যে

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বা সম্পত্তির মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়েও অনেকের প্রশ্ন থাকে। যেহেতু এ ধরনের সম্পত্তির কোনো ক্রয়মূল্য থাকে না, তাই নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তি অর্জনের তারিখে যে ন্যায্য বাজারমূল্য ছিল, সেই মূল্যই রিটার্নের কৃষি সম্পত্তি খাতে (প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে) দেখাতে হবে।

১০. রিটার্নে ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ আছে ১৮০ দিন

প্রথমবার রিটার্ন জমা দেওয়া অনেক করদাতার ক্ষেত্রেই ভুলবশত কোনো সম্পদ বা তথ্য বাদ পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সুখবর হলো, এমন ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ আছে। রিটার্ন দাখিলের পর ১৮০ দিনের মধ্যে ভুল সংশোধন করে পুনরায় রিটার্ন জমা দেওয়া যায়। তাই ভুল হলে ঘাবড়ে না গিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন জমা দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

রিটার্ন জমার আগে সতর্কতা জরুরি

আয়কর রিটার্ন দাখিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একজন নাগরিকের আর্থিক স্বচ্ছতার প্রতিফলন। ছোট ছোট বিষয়ে অসতর্কতা যেমন সুদ আয় গোপন রাখা, বাড়তি আয়ের তথ্য না দেওয়া বা সম্পত্তির মূল্য ভুলভাবে দেখানো ভবিষ্যতে জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে এই সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনে নেওয়া এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া করদাতাদের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

তথ্যসূত্র: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬

আরও