×
×
Saturday, 12 September, 2026, 10:23 am


ড্রাগন চাষে বাড়ছে সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় দেশের মানুষের কাছে বিদেশি ও দুর্লভ ফল হিসেবে পরিচিত ড্রাগন ফল এখন বাংলাদেশের বাজারেও বেশ পরিচিত। আকর্ষণীয় রং, মিষ্টি স্বাদ এবং তুলনামূলক ভিন্ন ধরনের পুষ্টিগুণের কারণে শহর থেকে গ্রাম বাড়ছে এর চাহিদা। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের এই ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক কৃষক।

ড্রাগন ফল মূলত উষ্ণ ও উপ-উষ্ণ অঞ্চলের ক্যাকটাসজাতীয় ফল। লাল খোসার ভেতরে সাদা বা লাল শাঁস এবং ছোট কালো বীজ থাকে। বিশেষ করে লাল শাঁসের জাতটিতে betalain, phenolic compounds ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

পুষ্টিগুণে কেন এগিয়ে ড্রাগন ফল?

ড্রাগন ফলে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন, বিভিন্ন খনিজ এবং নানা ধরনের জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে। গবেষণা পর্যালোচনায় এতে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন সি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

ফলের খাদ্যআঁশ হজম ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি এর বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে। লাল শাঁসের ড্রাগন ফলে betalain ও phenolic compounds তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ড্রাগন ফলকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা ওষুধ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা ক্যানসার প্রতিরোধে এর সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা থাকলেও মানুষের ওপর নিশ্চিত চিকিৎসাগত ফলাফল প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আরও শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন।

কৃষকের জন্য কেন আকর্ষণীয়?

ড্রাগন ফলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বাজারমূল্য। প্রচলিত অনেক ফলের তুলনায় এটি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমূল্যের ফল হিসেবে বাজারে অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। ফলে সঠিক জাত, আধুনিক চাষপদ্ধতি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের জন্য এটি একটি লাভজনক বিকল্প ফসল হতে পারে।

আরেকটি সুবিধা হলো তাজা ফলের পাশাপাশি ড্রাগন ফল থেকে জুস, জ্যাম, জেলি, আইসক্রিম, শরবত, শুকনো ফল ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। এমনকি ফলের খোসা ও বীজের মধ্যেও মূল্যবান জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য ও প্রসাধনশিল্পে ব্যবহারযোগ্য পণ্যের কাঁচামাল হতে পারে।

লাভের পাশাপাশি রয়েছে ঝুঁকিও

ড্রাগন ফলের বাজার যত আকর্ষণীয়, উৎপাদন ও বিপণনের ঝুঁকিও ততটা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দাম ওঠানামা। একই সময়ে অনেক কৃষক বাজারে ফল তুললে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম কমে যেতে পারে। বিপরীতে অফ-সিজনে উৎপাদন সম্ভব হলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এ ছাড়া চারা, খুঁটি বা অবকাঠামো, সেচ, শ্রম, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যার খরচ রয়েছে। ফল সংগ্রহের পর দ্রুত বাজারজাত করা না গেলে গুণগত মান কমে যেতে পারে। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; সংরক্ষণ, পরিবহন, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে।

রপ্তানির বাজারেও সম্ভাবনা

ড্রাগন ফলের আন্তর্জাতিক বাজারে ভিয়েতনাম একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। তবে সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ভিয়েতনামের ড্রাগন ফল রপ্তানি আয় ছিল ৪৮৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার যা এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। অতীতে দেশটির ড্রাগন ফল রপ্তানি বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল এবং ২০১৮ সালে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।

এর অর্থ হলো, শুধু বেশি উৎপাদন করলেই আন্তর্জাতিক বাজারে সফল হওয়া যায় না। বাজার বৈচিত্র্য, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্যাকেজিং, সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং ব্র্যান্ডিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ভিয়েতনামের ড্রাগন ফল রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ২৮২ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে চীন ছিল সবচেয়ে বড় বাজার, যদিও দেশটি একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি রাশিয়ার বাজারেও ভিয়েতনামের লাল শাঁসের ড্রাগন ফল METRO Cash & Carry-এর অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জায়গা পেয়েছে। অর্থাৎ এশিয়ার বাইরে নতুন বাজার তৈরির সুযোগও রয়েছে।

লাভ-ক্ষতির হিসাব কোথায়?

ড্রাগন ফলের ব্যবসায় লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয় মূলত উচ্চ বাজারমূল্য, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরির সুযোগ এবং রপ্তানি সম্ভাবনা থেকে।

অন্যদিকে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারদর পড়ে যাওয়া, একই সময়ে অতিরিক্ত সরবরাহ, রোগবালাই, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর বিপণন ব্যবস্থার কারণে।

তাই একজন কৃষকের জন্য শুধু ‘ড্রাগন ফলের দাম কত’ এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং হিসাব করতে হবে প্রতি বিঘায় মোট উৎপাদন, মোট খরচ, ফলন, বিক্রয়মূল্য, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় এবং নষ্ট হওয়ার হার বিবেচনা করে।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

বাংলাদেশে ড্রাগন ফলের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। কৃষকদের শুধু চাষে উৎসাহিত না করে উন্নত জাত নির্বাচন, মাটির উপযোগিতা পরীক্ষা, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, পোস্ট-হারভেস্ট প্রযুক্তি, গ্রেডিং, প্যাকেজিং এবং সরাসরি বাজার সংযোগ তৈরি করা জরুরি।

একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রাগন ফলের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও নজরে রাখতে হবে। কারণ কৃষকের উৎপাদন বাড়লেও যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হয়, তাহলে লাভজনক ফসলটি একসময় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ড্রাগন ফল শুধু একটি আকর্ষণীয় বিদেশি ফল নয়; এটি কৃষি অর্থনীতিতে উচ্চমূল্যের একটি সম্ভাবনাময় পণ্য। পুষ্টিগুণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি তিন ক্ষেত্রেই এর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে টেকসই লাভের জন্য উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য সংযোজনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অর্থাৎ ড্রাগন ফলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু ‘কত বেশি ফলানো গেল’ তার ওপর নয়; বরং ‘কত ভালো মানে উৎপাদন করে, কত কম অপচয়ে এবং কত বেশি মূল্য সংযোজন করে বাজারে পৌঁছানো গেল’ তার ওপর।

আরও