×
×
Saturday, 12 September, 2026, 10:25 am


বিস্ময়কর কুরআনের বিস্ময়কর সমাধান

আল্লাহ সুবহানাতায়ালা সূরা জিন (৭২) এ ঘোষণা করেছেন যে জিনদের একটি দল কুরআন শুনে বিস্মিত হয়ে বলে: “নিশ্চয়ই আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি।” (সূরা জিন, ৭২:১) আবার সূরা কাফ (৫০) -এর শুরুতেও কুরআনের বিস্ময়করত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে।

 

কুরআনের সমাধান কেন বিস্ময়কর?

১. মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতা

মানুষের জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা—সবকিছুরই একটি সীমা রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধান মানবকল্যাণের জন্য এতই পূর্ণাঙ্গ ও চমৎকার যে তা মানুষের কল্পনার ঊর্ধ্বে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:

“তোমাদেরকে অল্প জ্ঞান ছাড়া আর কিছু দেওয়া হয়নি।” (সূরা বনি ইসরাইল, ১৭:৮৫)

অতএব, মানবরচিত কোনো আইন, মতবাদ বা দর্শন কখনোই কুরআনের মতো চূড়ান্ত ও নিখুঁত সমাধান দিতে পারে না।

২. বাস্তব জীবনের উদাহরণ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উদ্ধারকাজ

বর্তমানে নেপাল, তিব্বতসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা, ভূমিধস ও দুর্যোগে মানুষ মাটির নিচে, কাদার মধ্যে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। দিনের পর দিন পরেও তারা জীবিত উদ্ধার হচ্ছে এটি কি আল্লাহর ক্ষমতার প্রকাশ নয়?

আল্লাহ সূরা কিয়ামাহ (৭৫) ও সূরা মুমিনুন (২৩) -তে প্রশ্ন করেছেন:

“আমি কি মৃতদের জীবিত করতে সক্ষম নই?”

এটি শুধু পরকালের জন্য নয়; বরং বর্তমান জীবনেও আল্লাহ প্রতিদিন মৃতপ্রায় মানুষকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু আমরা কি এতে চিন্তা করি? কুরআনের সমাধান মানুষের এই চিন্তার বাইরে।

কুরআন সংরক্ষণ ও ব্যাখ্যার দায়িত্ব আল্লাহর

অনেকে মনে করেন, কুরআন সংকলন বা সংরক্ষণ কোনো সাহাবী বা মনুষ্যকর্ম। অথচ আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন:

“নিশ্চয়ই এ কুরআন জমা করা ও পাঠ করানো আমার দায়িত্ব।” (সূরা কিয়ামাহ, ৭৫:১৭)

আবার:
“অতঃপর এর ব্যাখ্যা দেওয়াও আমার দায়িত্ব।” (সূরা কিয়ামাহ, ৭৫:১৯)

অর্থাৎ, কুরআনের সংরক্ষণ, শিক্ষাদান ও ব্যাখ্যা সবই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। কোনো মানবরচিত গ্রন্থ বা মতবাদ এখানে স্থান পায় না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক মুসলিম সমাজ কুরআনের বাইরে গিয়ে ফিকহ, মাযহাব, ফতোয়া ইত্যাদি মানবরচিত গ্রন্থকে সামনে রেখে সমাধান খোঁজে, যা কুরআনের বিরোধী।

কুরআনের নাম ‘মাজিদ’ এর তাৎপর্য

কুরআনের একটি নাম ‘মাজিদ’ (সম্মানিত, মর্যাদাপূর্ণ)।

“কাফ, সম্মানিত কুরআনের শপথ।” (সূরা কাফ, ৫০:১)

‘মাজিদ’ শব্দের অর্থ:
➡️ সম্মানে পরিপূর্ণ,
➡️ মর্যাদাদাতা,
➡️ কল্যাণে পরিপূর্ণ।

অর্থাৎ, কুরআন যেমন নিজেই সম্মানিত, তেমনি যে ব্যক্তি কুরআন অনুসরণ করে, আল্লাহ তাকেও সম্মানিত করেন। পবিত্র কুরআন মানুষের মৌলিক অধিকার, ব্যক্তিমর্যাদা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করে। যেমন আল্লাহ বলেছেন:

“আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।” (সূরা বনি ইসরাইল, ১৭:৭০)

এই সম্মান তখনই বাস্তবায়িত হয় যখন কুরআনের বিধানসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়।

কুরআনই একমাত্র চূড়ান্ত সমাধান

ক. বিচারব্যবস্থায় কুরআনের সমাধান

মানবরচিত আইনে কোনো বিচার ন্যায়সঙ্গত হয় না। অপরাধ সংঘটনের পর বছরের পর বছর বিচার চলতে থাকে; অপরাধী শাস্তি পায় না, ভুক্তভোগী ন্যায় পায় না। কিন্তু কুরআনের আইন তাৎক্ষণিক ও ন্যায়সঙ্গত:

“আমি তওরাতে তাদের উপর বিধান দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখমের সমতুল্য প্রতিশোধ। কিন্তু যে ক্ষমা করে দেয়, তা তার জন্য কাফফারা।” (সূরা মায়েদা, ৫:৪৫)

এখানে যদি অপরাধী ক্ষমা চায় এবং ভুক্তভোগী সম্মত হয়, তবে অর্থের বিনিময়ে সমাধান সম্ভব। কিন্তু বর্তমান বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতা ও জটিলতা রয়েছে, যা কুরআনের সহজ ও দ্রুত বিচারের বিপরীত।

খ. অর্থনৈতিক বণ্টন ও সম্পদের ন্যায্যতা

পৃথিবীর সব সম্পদ আল্লাহর। মানুষ নিজের ইচ্ছায় কিছু তৈরি করতে পারে না। আল্লাহ বলেছেন:

“তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা বাকারা, ২:২৯)

কিন্তু মানুষ আল্লাহর বিধান না মেনে সম্পদ আটকে রাখে, সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত করে, ফলে দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। কুরআনের বণ্টনব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সম্পদের সমতা ও মানবকল্যাণ নিশ্চিত হয়।

গ. নবুয়ত ও আল্লাহর নির্বাচন

কাফেররা বিস্মিত হয় যে, তাদের মধ্য থেকেই একজন মানুষ (মুহাম্মদ) আল্লাহর রাসূল হিসেবে এসেছেন। তারা বলে:

“এই কুরআন কেন অন্য কোনো বড় লোকের উপর নাজিল করা হলো না?” (সূরা যুখরুফ, ৪৩:৩১)

আল্লাহ উত্তরে বলেন:

“আল্লাহ জানেন কোথায় তাঁর রিসালাত (প্রেরিত বার্তা) রাখবেন।” (সূরা আনআম, ৬:১২৪)

অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা নবুয়ত দান করেন; এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু মানুষের অহমিকা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাই তাদের বিস্মিত করে।

বর্তমান সমাজের বিভ্রান্তি ও কুরআন থেকে দূরত্ব

আমাদের সমাজে লক্ষণীয়:

❎ কুরআনের নামে কিন্তু হাদিস, ফিকহ, মাযহাব, ফতোয়া ইত্যাদি মানবরচিত গ্রন্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

❎ কুরআনের আয়াতগুলো অনুবাদ করা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয় না।

❎ ‘শরীফ’, ‘খোদা’ ইত্যাদি নামকরণ কুরআন দ্বারা নয়, বরং মানুষের তৈরী।

❎ আল্লাহ কুরআনের নাম দিয়েছেন, কিন্তু আমরা নিজেরা নাম পরিবর্তন করি।
ধর্মীয় পণ্ডিতরা কুরআনের বাণী প্রচার করলেও নিজেরা কুরআনের বিধান অনুযায়ী চলেন না; তারা মানবরচিত গ্রন্থকেই মূল বলে প্রতিষ্ঠা করেন।

আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন:

“আমি এই কিতাব নাজিল করেছি স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ।”

অথচ মানুষ তা ছেড়ে অন্য পথে চলে, ফলে শান্তি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার কিছুই প্রতিষ্ঠিত হয় না।

▶️ কুরআন মাজিদ গ্রহণের আহ্বান

পৃথিবীতে একমাত্র কুরআনুল কারীমই মানুষের সব সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান প্রদান করে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত এক বিস্ময়কর কিতাব, যার সমাধানও বিস্ময়কর ও অদ্বিতীয়।

আমাদের করণীয়:
১. কুরআনের বাণীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
২. কুরআনের বিধানসমূহ আক্ষরিক ও পূর্ণাঙ্গভাবে মানতে হবে।
৩. কুরআনের বাইরে কোনো গ্রন্থ বা মতবাদকে হেদায়াতের উৎস হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
৪. কুরআন মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করে, তাই তা পৃথিবীর সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
৫. আখেরাতে কুরআন সম্বন্ধেই প্রশ্ন করা হবে, তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

“নিশ্চয়ই এটি একটি সম্মানিত কুরআন, যা সংরক্ষিত লৌহফলকে লিখিত রয়েছে।” (সূরা বুরুজ, ৮৫:২১-২২)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন মাজিদের প্রকৃত সমাধান বুঝে গ্রহণ করার এবং তা বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন।

আরও