×
×
Thursday, 29 October, 2026, 2:42 pm


হেদায়াতের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বানঃ মানুষের ভালো-মন্দের দায় তার নিজের

সৎপথ গ্রহণে নিজেরই কল্যাণ, আর পথভ্রষ্টতার পরিণতিও মানুষের নিজের জন্য সূরা ইউনুসের ১০৮ নম্বর আয়াতে এসেছে আত্মজবাবদিহিতার গভীর শিক্ষা

মানুষের জীবনে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভুল পথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও। ইসলাম মানুষের এই স্বাধীন সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়টিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। পবিত্র কোরআনের সূরা ইউনুসের ১০৮ নম্বর আয়াতে মানুষকে সৎপথ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে হেদায়াত গ্রহণ করলে তার উপকার মানুষ নিজেই পাবে; আর পথভ্রষ্ট হলে তার ক্ষতিও তাকেই বহন করতে হবে।

আয়াতটিতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

“বলুন, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সত্য এসেছে। অতএব, যে সৎপথ গ্রহণ করবে, সে নিজেরই কল্যাণের জন্য সৎপথ গ্রহণ করবে; আর যে পথভ্রষ্ট হবে, সে নিজেরই ক্ষতির জন্য পথভ্রষ্ট হবে। আর আমি তোমাদের ওপর কোনো তত্ত্বাবধায়ক নই।’”

— সূরা ইউনুস, সূরা নম্বর ১০, আয়াত নম্বর ১০৮

সত্য মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে

আয়াতটির শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা রয়েছে মানুষের কাছে তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্য এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে যে পথনির্দেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, তা অন্ধকারের মধ্যে অনুমাননির্ভর কোনো পথ নয়; বরং সত্য ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।

কোরআনের দৃষ্টিতে মানুষের দায়িত্ব হলো সেই সত্যকে গ্রহণ করা, তা নিয়ে চিন্তা করা এবং জীবনের পথচলায় তার অনুসরণ করা। সত্য মানুষের সামনে উপস্থিত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি ব্যক্তির নিজের ওপর ন্যস্ত।

হেদায়াতের লাভ কার?

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে মানুষের একটি মৌলিক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে যে সৎপথ গ্রহণ করবে, সে নিজেরই কল্যাণের জন্য তা গ্রহণ করবে।

অর্থাৎ মানুষ যখন ঈমান, ন্যায়, সত্য, সৎকর্ম ও আল্লাহর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করে, তখন এর কোনো লাভ আল্লাহর প্রয়োজনের কারণে হয় না। বরং সেই কল্যাণ ফিরে আসে মানুষের নিজের জীবনেই।

সৎপথ মানুষের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে, তাকে ন্যায় ও দায়িত্ববোধের দিকে পরিচালিত করে এবং পরকালীন সফলতার পথও সুগম করে। ফলে হেদায়াত গ্রহণ মূলত মানুষের নিজের জন্যই একটি কল্যাণকর সিদ্ধান্ত।

পথভ্রষ্টতার ক্ষতিও নিজের

এর বিপরীতে আয়াতটি সতর্ক করে বলছে, যে পথভ্রষ্ট হবে, সে নিজেরই ক্ষতির জন্য পথভ্রষ্ট হবে।

এখানেও রয়েছে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার সুস্পষ্ট ঘোষণা। মানুষ যদি সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, অন্যায় ও অবিচারের পথে চলে অথবা আল্লাহর নির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তার পরিণতির দায় অন্য কারও ওপর চাপানোর সুযোগ নেই।

এই বক্তব্য মানুষের আত্মজবাবদিহিতার ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের কাজ এবং নিজের নির্বাচিত পথ সবকিছুর পরিণতির সঙ্গে মানুষ নিজেই জড়িত।

‘আমি তোমাদের ওপর কোনো তত্ত্বাবধায়ক নই’

আয়াতের শেষ অংশটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলা হয়েছে:

“আর আমি তোমাদের ওপর কোনো তত্ত্বাবধায়ক নই।”

এ বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, রাসুলের দায়িত্ব সত্য ও আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সতর্ক করা। কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তরকে জোর করে পরিবর্তন করা বা তাকে হেদায়াতের পথে বাধ্য করা তাঁর দায়িত্ব নয়।

সত্য মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে; এরপর মানুষ কী সিদ্ধান্ত নেবে, তার দায় তার নিজের।

আধুনিক জীবনেও আয়াতটির শিক্ষা

বর্তমান সময়ে তথ্যের অভাব নেই। মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য মত, বিশ্বাস, আদর্শ ও জীবনদর্শনের মুখোমুখি হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সূরা ইউনুসের এই আয়াত ব্যক্তিকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় আমি কোন পথ বেছে নিচ্ছি এবং সেই সিদ্ধান্তের দায় কি আমি নিজে গ্রহণ করছি?

আয়াতটি অন্যের ভুল খোঁজার আগে নিজের সিদ্ধান্ত ও কর্মের দিকে তাকাতে শেখায়। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, সত্যের পথে চলার উপকার যেমন ব্যক্তির নিজের, তেমনি ভুল পথে চলার ক্ষতিও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে।

আত্মজবাবদিহিতার একটি শক্তিশালী বার্তা

সূরা ইউনুসের ১০৮ নম্বর আয়াত তাই শুধু সৎপথ গ্রহণের আহ্বান নয়; এটি মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং আত্মজবাবদিহিতার একটি গভীর ঘোষণা।

আল্লাহ মানুষের সামনে সত্যের পথনির্দেশ দিয়েছেন। এখন সেই সত্য গ্রহণ করবে কি না সিদ্ধান্ত মানুষের। আর সেই সিদ্ধান্তের ফলও শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের জীবনেই প্রতিফলিত হবে।

হেদায়াতের পথে চললে কল্যাণ মানুষের নিজের; আর পথভ্রষ্ট হলে ক্ষতিও তার নিজের। এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর বার্তাই আয়াতটির অন্যতম প্রধান শিক্ষা।

[atn_photocard]
আরও