মানতে হলে জানতে হবে
দুনিয়ার মোহ, সম্পদের আকর্ষণ ও আখিরাতের শ্রেষ্ঠ প্রতিদান
নারী, সন্তান, সোনা-রূপা, পশুসম্পদ ও শস্যক্ষেতের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণকে স্বীকার করে কোরআন স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যের কথা। দুনিয়ার ভোগসামগ্রী সাময়িক, কিন্তু আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।
মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য
মানুষের জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তার চিন্তা, পরিশ্রম ও পরিকল্পনার একটি বড় অংশ আবর্তিত হয় ভালোবাসা, পরিবার, অর্থসম্পদ, জীবিকা এবং স্বাচ্ছন্দ্যকে কেন্দ্র করে। কেউ সুন্দর পারিবারিক জীবন গড়তে চান, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চান, কেউ সম্পদ সঞ্চয় করেন, আবার কেউ কৃষিজমি, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য উপায়ে আর্থিক সমৃদ্ধি অর্জনের চেষ্টা করেন। এসব আকাঙ্ক্ষা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত অংশ।
কিন্তু জীবনের এই পরিচিত বাস্তবতার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। মানুষ যা অর্জনের জন্য এত পরিশ্রম করে, সেগুলো কি তার জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য? সম্পদ, পরিবার ও পার্থিব প্রাচুর্য কি মানুষের অস্তিত্বের পূর্ণ উদ্দেশ্য, নাকি এগুলোর বাইরেও রয়েছে আরও গভীর কোনো গন্তব্য?
পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াত এই প্রশ্নের একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। আয়াতটিতে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে এমন কয়েকটি বিষয়ের কথা, যেগুলোর প্রতি মানুষের স্বাভাবিক ঝোঁক রয়েছে। একই সঙ্গে এসব উপভোগ্য বিষয়ের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার কথা।
আয়াতটি হলো:
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَآءِ وَالْبَنِيْنَ وَالْقَنَاطِيْرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْاَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ؕ ذٰلِكَ مَتَاعُ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا ۚ وَاللّٰهُ عِنْدَهٗ حُسْنُ الْمَاٰبِ
বাংলা অর্থ: “মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালোবাসা, নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।”
এই আয়াতের বক্তব্য কেবল সম্পদশালী মানুষের জন্য নয়। বরং পরিবার, ভালোবাসা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং পার্থিব সাফল্য নিয়ে চিন্তা করেন, এমন প্রত্যেক মানুষের জন্য এটি প্রাসঙ্গিক। কারণ আয়াতটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি সেই আকাঙ্ক্ষার সীমা এবং জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কেও সচেতন করে।
নারী ও পারিবারিক ভালোবাসা: আকর্ষণের সঙ্গে দায়িত্বও জরুরি
সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াতে মানুষের আকর্ষণের বিষয়গুলোর মধ্যে প্রথমেই নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর এসেছে সন্তানদের কথা। এই ধারাবাহিকতা মানুষের পারিবারিক জীবন এবং সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে।
মানুষের জীবনে ভালোবাসা একটি শক্তিশালী অনুভূতি। দাম্পত্য সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে জীবন কাটানোর আকাঙ্ক্ষা মানুষের সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তবে কোরআনের আলোকে কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ থাকা এবং সেই আকর্ষণকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা এক বিষয় নয়।
এই আয়াত আমাদের ভাবতে শেখায়, পার্থিব সম্পর্কের প্রতি ভালোবাসা যেন জীবনের বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে আড়াল না করে। মানুষ যখন কোনো সম্পর্ক বা আকাঙ্ক্ষার প্রতি অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। আয়াতটি নারীকে দোষারোপ করছে না, কিংবা নারীকে কোনো অশুভ বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করছে না। বরং মানুষের প্রবৃত্তির আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর তালিকায় নারীর প্রতি আকর্ষণের কথা উল্লেখ করছে। একইভাবে পরবর্তী অংশে সন্তান, সম্পদ, পশুসম্পদ ও কৃষিজ উৎপাদনের কথাও এসেছে।
কোরআনের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দোষী করা নয়। মূল শিক্ষা হলো, মানুষের আকর্ষণ ও ভালোবাসা যেন তার জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারণ করে না ফেলে।
সন্তানসন্ততি: ভালোবাসার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা
সন্তান মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভালোবাসার কেন্দ্র। বাবা-মা সাধারণত সন্তানের নিরাপত্তা, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন। সন্তানদের জন্য অর্থ ব্যয় করা, তাদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা এবং তাদের সাফল্যে আনন্দ পাওয়া পারিবারিক জীবনের পরিচিত বাস্তবতা।
সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াতে সন্তানদের প্রতিও মানুষের আকর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, পারিবারিক সম্পর্ক ও সন্তানসন্ততির প্রতি মানুষের টানও পার্থিব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু সন্তানকে ভালোবাসা এবং সন্তানের সাফল্যকে জীবনের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা এক নয়। সন্তানকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রত্যাশা কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যখন সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা পারিবারিক জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
আয়াতটি পাঠককে নিজের অগ্রাধিকার নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ দেয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রচেষ্টা কি কেবল সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও পার্থিব সাফল্যের জন্য, নাকি জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সচেতনতা রয়েছে?
এখানে কোরআনের বক্তব্যকে সন্তান পালনের বিরোধিতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আয়াতটি মানুষের আকর্ষণের প্রকৃতি তুলে ধরছে এবং জানাচ্ছে যে এসব আকর্ষণ দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রীর অংশ। ফলে সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও মানুষকে নিজের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
সোনা-রূপা ও বিপুল সম্পদ: প্রাচুর্য কি জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য?
আয়াতের পরবর্তী অংশে এসেছে বিপুল পরিমাণ সোনা ও রূপার কথা। প্রাচীনকাল থেকে মূল্যবান ধাতু সম্পদ, বিনিময় এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমান সময়ে অর্থ, ব্যাংক আমানত, বিনিয়োগ, ব্যবসা, জমি এবং অন্যান্য সম্পদের প্রতিও মানুষের আকর্ষণ লক্ষ করা যায়।
কোরআনের আয়াতে সরাসরি সোনা-রূপার উল্লেখ থাকলেও এর আলোচনায় একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আসে: সম্পদ মানুষের জীবনে কী ভূমিকা পালন করছে?
অর্থ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ, পরিবার পরিচালনা, শিক্ষা গ্রহণ, চিকিৎসা এবং বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করে। আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করা মানুষের জীবনের বাস্তব প্রয়োজনের অংশ। কিন্তু সম্পদ যখন জীবনের প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, তখন মানুষ তার অর্জনকে নিজের সাফল্যের একমাত্র প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
আয়াতের শেষাংশ এই ধারণাকে সীমার মধ্যে রাখতে সাহায্য করে। সেখানে বলা হয়েছে, এসব বিষয় দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। অর্থাৎ সম্পদ মানুষের জীবনের একটি অংশ, কিন্তু তার চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।
এখানে আয়াতটি সম্পদ অর্জনকে সরাসরি নিষিদ্ধ করছে না। একইভাবে ধনী হওয়াকে অপরাধ বলেও ঘোষণা করছে না। বরং সম্পদের আকর্ষণ এবং তার প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করছে।
কোরআনের আলোকে পাঠকের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মজিজ্ঞাসা উঠে আসে: সম্পদ কি আমার প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম, নাকি সম্পদ অর্জনই আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তির জীবনদর্শন, সিদ্ধান্ত এবং অগ্রাধিকার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করতে পারে।
চিহ্নিত ঘোড়া: সম্পদ, সৌন্দর্য ও সামাজিক মর্যাদার আকর্ষণ
আয়াতটিতে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বা চিহ্নিত ঘোড়ার কথাও বলা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ঘোড়া ছিল যাতায়াত, কৃষিকাজ, যুদ্ধ এবং সামাজিক মর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। উৎকৃষ্ট ঘোড়ার মালিকানা অনেক সময় অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সামাজিক অবস্থানের পরিচায়ক হিসেবেও বিবেচিত হতো।
এই উল্লেখের মাধ্যমে আয়াতের আলোচনায় এমন সম্পদের দিকটি সামনে আসে, যেগুলোর মূল্য কেবল ব্যবহারিক উপযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। কোনো সম্পদ তার সৌন্দর্য, বিশেষত্ব, বিরলতা কিংবা সামাজিক মর্যাদার কারণেও মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।
বর্তমান সময়ে দামি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি, মূল্যবান অলংকার কিংবা বিশেষ মর্যাদাসূচক সামগ্রীর প্রতি মানুষের আকর্ষণের সঙ্গে এই বিষয়টির একটি সাধারণ তুলনা করা যায়। তবে এগুলো আয়াতে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি; বরং আয়াতের মূল বক্তব্য থেকে বর্তমান জীবনের জন্য একটি চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি হয়।
মানুষ কোনো কিছু ব্যবহারিক প্রয়োজনের জন্য অর্জন করতে পারে। আবার কখনো অন্যদের কাছে নিজের অবস্থান প্রমাণ করার জন্যও ব্যয় করতে পারে। এই দুই ধরনের উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
আয়াতের শিক্ষা হলো, কোনো আকর্ষণীয় সম্পদকে জীবনের চূড়ান্ত অর্জন মনে করা উচিত নয়। বাহ্যিক প্রাচুর্য যতই আকর্ষণীয় হোক, তা দুনিয়ার জীবনের অংশ হিসেবেই থাকে।
গবাদি পশু ও কৃষিজমি: জীবিকা ও উৎপাদনের বাস্তবতা
সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াতে গবাদি পশু ও শস্যক্ষেতের উল্লেখ রয়েছে। এগুলো মানুষের খাদ্য, জীবিকা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
কৃষিনির্ভর সমাজে জমি ও ফসল ছিল সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। গবাদি পশু খাদ্য, কৃষিকাজ, পরিবহন এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হতো। তাই পশুসম্পদ ও কৃষিজ উৎপাদনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ জীবনের বাস্তব চাহিদার সঙ্গেও যুক্ত।
আজও কৃষিজমি, ফসল, পশুপালন এবং উৎপাদনশীল সম্পদ বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম। একজন কৃষক জমি চাষ করেন, একজন খামারি পশু পালন করেন এবং একজন উদ্যোক্তা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এসব কাজ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে আয়াতের বক্তব্য এসব সম্পদের উপযোগিতা অস্বীকার করে না। বরং গবাদি পশু ও শস্যক্ষেতকেও সেই পার্থিব ভোগসামগ্রীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেগুলোর প্রতি মানুষের আকর্ষণ রয়েছে।
এখানে মূল বিষয় হলো, জীবিকার উপকরণকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা না করা। জমি, ফসল কিংবা পশুসম্পদ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে, কিন্তু এগুলোর মালিকানাই মানুষের চূড়ান্ত সাফল্যের পূর্ণ সংজ্ঞা নয়।
“দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী”: আয়াতের কেন্দ্রীয় বক্তব্য
আয়াতটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো:
ذٰلِكَ مَتَاعُ الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا
অর্থ: “এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী।”
এই বাক্যের মাধ্যমে আগের অংশে উল্লেখ করা আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর প্রকৃতি স্পষ্ট করা হয়েছে। নারী, সন্তান, সোনা-রূপা, ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেতের প্রতি মানুষের আকর্ষণ রয়েছে। কিন্তু এসব কিছুই দুনিয়ার জীবনের অংশ।
এখানে “ভোগসামগ্রী” কথাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কোনো বস্তু ব্যবহার করা যায়, উপভোগ করা যায় কিংবা তার মাধ্যমে জীবনের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করা যায়। কিন্তু সেই উপযোগিতা বা আনন্দের উপস্থিতি কোনো কিছুকে চূড়ান্ত গন্তব্যে পরিণত করে না।
মানুষের জীবনে পার্থিব সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে। কেউ ব্যবসায় সফল হন, কেউ সম্পদ অর্জন করেন, কেউ পরিবার নিয়ে সুখী জীবন কাটান। কিন্তু কোরআনের এই আয়াত এসব অর্জনকে জীবনের পূর্ণ উদ্দেশ্য হিসেবে উপস্থাপন করে না।
এখানে ভারসাম্যপূর্ণভাবে বোঝা প্রয়োজন যে, আয়াতটি দুনিয়ার সব আনন্দ বা প্রয়োজনকে অস্বীকার করছে না। বরং এগুলোর সীমা নির্ধারণ করে মানুষের দৃষ্টি জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে ফেরাচ্ছে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে পাঠক উপলব্ধি করতে পারেন, পার্থিব অর্জন যত বড়ই হোক, তা মানুষের জীবনের সম্পূর্ণ অর্থ নির্ধারণ করে না। দুনিয়ার আকর্ষণের বাইরে এমন একটি প্রত্যাবর্তনের কথা রয়েছে, যার গুরুত্ব আয়াতের শেষাংশে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
“আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল”: জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে:
وَاللّٰهُ عِنْدَهٗ حُسْنُ الْمَاٰبِ
অর্থ: “আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।”
এই বাক্যটি পুরো আয়াতের বক্তব্যকে একটি চূড়ান্ত দিকনির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত করেছে। একদিকে রয়েছে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় পার্থিব বিষয়গুলো, অন্যদিকে রয়েছে আল্লাহর কাছে উত্তম প্রত্যাবর্তনের কথা।
কোরআনের এই বক্তব্য পাঠককে শুধু বর্তমান জীবন নিয়ে চিন্তা করতে বলে না; বরং জীবনের পরিণতি সম্পর্কেও সচেতন করে। মানুষ সম্পদ অর্জন করে, পরিবার গড়ে, জীবিকা নির্বাহ করে এবং নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। কিন্তু এসব কার্যক্রমের বাইরেও তার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে “উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল” কথাটি মানুষের দৃষ্টিকে সাময়িক আকর্ষণ থেকে চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে পরিচালিত করে। অর্থাৎ দুনিয়ার প্রাপ্তি ও আনন্দকে জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে।
আয়াতটির এই অংশই আগের সব বিষয়ের অর্থকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে। সম্পদ, পরিবার, কৃষিজমি কিংবা পশুসম্পদ মানুষের জীবনের পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু মানুষের চিন্তা ও মূল্যায়ন যেন শুধু এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই শিক্ষা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।
সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াত থেকে বর্তমান জীবনের শিক্ষা
বর্তমান সমাজে মানুষের সাফল্য প্রায়ই অর্থ, পেশাগত অবস্থান, বাড়ি, গাড়ি, সামাজিক পরিচিতি এবং পারিবারিক অর্জনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অন্যের জীবনযাপন ও সম্পদের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতাও অনেকের মধ্যে দেখা যায়।
এমন বাস্তবতায় সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াত মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আত্মজিজ্ঞাসা তুলে ধরে।
প্রথমত, নিজের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি বোঝা জরুরি। মানুষ কী চায় এবং কেন চায়, তা নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কোনো কিছু আকর্ষণীয় বলেই সেটিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানাতে হবে, এমন নয়।
দ্বিতীয়ত, সম্পদ ও পারিবারিক অর্জনের প্রকৃত অবস্থান উপলব্ধি করা দরকার। এগুলো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও আয়াত অনুসারে দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রীর অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয়ত, সামাজিক মর্যাদা ও বাহ্যিক প্রাচুর্যকে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ বা বাহ্যিক অবস্থানই তার জীবনের সব অর্থ নির্ধারণ করে না।
চতুর্থত, জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। আয়াতের শেষাংশ মানুষকে আল্লাহর কাছে উত্তম প্রত্যাবর্তনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এসব শিক্ষা আয়াতের বক্তব্য থেকে উদ্ভূত চিন্তার ক্ষেত্র। এগুলোকে এমন কোনো অতিরিক্ত বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়, যা আয়াতে সরাসরি বলা হয়নি। বরং আয়াতের মূল বক্তব্যকে বর্তমান জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে বোঝার উপায় হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
উপসংহার: পার্থিব আকর্ষণের বাইরে জীবনের গভীরতর অর্থ
সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াত মানুষের পরিচিত জীবনবাস্তবতাকে সামনে রেখে একটি গভীর বার্তা প্রদান করে। নারী, সন্তান, সোনা-রূপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেতের প্রতি মানুষের আকর্ষণের কথা উল্লেখ করে আয়াতটি জানিয়ে দেয় যে এসবই দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। এরপর আল্লাহর কাছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, মানুষের জীবনে ভালোবাসা, সম্পদ ও পার্থিব প্রাপ্তি থাকতেই পারে। কিন্তু এগুলোকে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা এবং জীবনের বৃহত্তর উদ্দেশ্য ভুলে যাওয়া এক বিষয় নয়।
আয়াতটি মানুষকে নিজের আকাঙ্ক্ষা, অর্জন ও অগ্রাধিকার নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেয়, পার্থিব জীবনের আকর্ষণ যতই শক্তিশালী হোক, তা চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বকে মুছে দিতে পারে না।
অতএব, এই আয়াতের আলোকে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো, দুনিয়ার প্রাপ্তিকে তার যথাযথ অবস্থানে রেখে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকা। সম্পদ, পরিবার ও জীবিকার বাস্তবতাকে বুঝতে হবে, কিন্তু জীবনের অর্থকে শুধু এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াতের মূল বার্তা এখানেই: দুনিয়ার আকর্ষণ মানুষের জীবনের অংশ, কিন্তু আল্লাহর কাছে উত্তম প্রত্যাবর্তনই সেই বৃহত্তর গন্তব্য, যার কথা মানুষকে স্মরণ রাখতে হবে।