কুরআনের আলোকে বিবাহ
লেখক ও বিশ্লেষকঃ মাহতাব উদ্দিন
বিবাহের উদ্দেশ্য, দাম্পত্য সম্পর্ক, মাহর, পারিবারিক দায়িত্ব, অধিকার, বিবাহের বিধান ও বিচ্ছেদ
কুরআনে বিবাহ মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও অঙ্গীকার হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে **প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া** স্থাপন করেছেন এবং বিবাহকে একটি **দৃঢ় অঙ্গীকার** হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কুরআনের বিভিন্ন আয়াত একত্রে বিবাহের উদ্দেশ্য, জীবনসঙ্গী নির্বাচন, মাহর, দাম্পত্য সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্ব, একাধিক বিবাহ, ইদ্দত এবং বিচ্ছেদের নীতিমালা তুলে ধরে।
এই নিবন্ধে বিবাহ সম্পর্কিত বিষয়গুলো **কুরআনের আয়াতের আলোকে** ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো।
*১. বিবাহের মূল উদ্দেশ্য — প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া*
সূরা ৩০:২১
> **“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”**
এই আয়াত বিবাহের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে:
* **প্রশান্তি**
* **ভালোবাসা**
* **দয়া**
অতএব কুরআনের আলোকে বিবাহ শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি এমন একটি সম্পর্ক যার মধ্যে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের কাছে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া খুঁজে পায়।
*২. জীবনসঙ্গী, দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা ও গর্ভধারণ*
সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৯
> **“তিনি তোমাদেরকে একটি সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করে। অতঃপর যখন সে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলো, তখন সে একটি হালকা গর্ভ ধারণ করল এবং তা নিয়ে চলাফেরা করতে লাগল…”**
এই আয়াতে তিনটি বিষয় পাশাপাশি এসেছে:
**সঙ্গী → ঘনিষ্ঠতা → গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়।**
অতএব কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা এবং তার মাধ্যমে গর্ভধারণের সূচনাকে একই ধারার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
*৩. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোশাক*
সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭
> “তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।”
পোশাক যেমন মানুষকে আচ্ছাদিত, সুরক্ষিত ও ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত রাখে, তেমনি এই আয়াত স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার একটি গভীর উপমা তুলে ধরে।
*৪. বিবাহিত জীবনে দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা*
সূরা আল-বাকারা ২:২২৩
> “তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্রস্বরূপ; অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা আসো…”
এই আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে **দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতার** কথা সরাসরি এসেছে।
এটি বিবাহিত জীবনের স্বাভাবিক ও বৈধ ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি স্পষ্ট করে।
*৫. বিবাহ একটি দৃঢ় অঙ্গীকার*
সূরা আন-নিসা ৪:২১
> “আর তারা তোমাদের কাছ থেকে একটি দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।”
কুরআন বিবাহকে একটি সাধারণ সম্পর্ক হিসেবে নয়, বরং **দৃঢ় ও গুরুতর অঙ্গীকার** হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তাই বিবাহের সঙ্গে দায়িত্ব, বিশ্বস্ততা ও অঙ্গীকার রক্ষার বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত।
*৬. বিবাহের জন্য উৎসাহ*
সূরা আন-নূর ২৪:৩২
> “আর তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ দাও…”
একই আয়াতে বলা হয়েছে:
> “তারা দরিদ্র হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন।”
অতএব কুরআন সমাজে অবিবাহিতদের বিবাহের ব্যবস্থা করতে উৎসাহিত করেছে।
*৭. বিবাহের সামর্থ্য না থাকলে পবিত্রতা*
সূরা আন-নূর ২৪:৩৩
> “আর যারা বিবাহের সামর্থ্য পায় না, তারা যেন পবিত্রতা বজায় রাখে, যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করেন।”
অতএব বিবাহের সামর্থ্য না থাকলে কুরআনের নির্দেশ হলো পবিত্রতা বজায় রাখা।
*৮. ঈমান ও বিবাহ*
সূরা আল-বাকারা ২:২২১
এই আয়াতে মুশরিক নারী-পুরুষের সঙ্গে বিবাহের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং ঈমানদার নারী-পুরুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, **বিশ্বাস ও ঈমান জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।**
*৯. আহলে কিতাবের পবিত্র নারীদের সঙ্গে বিবাহ*
সূরা আল-মায়িদা ৫:৫
এই আয়াতে পূর্বে কিতাবপ্রাপ্তদের মধ্যকার **পবিত্র নারীদের** সঙ্গে বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তাদের প্রাপ্য প্রদান এবং পবিত্রতার উদ্দেশ্যে বিবাহ করার কথা বলা হয়েছে—ব্যভিচার বা গোপন সম্পর্কের উদ্দেশ্যে নয়।
*১০. বিবাহে সম্মতি*
সূরা আল-বাকারা ২:২৩২
তালাকপ্রাপ্ত নারীরা তাদের অপেক্ষার সময় শেষ করার পর, তারা যদি নিজেদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্মত হয়, তাহলে তাদের পুনরায় বিবাহে বাধা দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
এই আয়াতে **পারস্পরিক সম্মতির** গুরুত্ব স্পষ্ট।
*১১. নারীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন*
সূরা আন-নিসা ৪:১৯
> “আর তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
কুরআন স্বামীদের স্ত্রীদের সঙ্গে **মারুফ**—অর্থাৎ ন্যায়সঙ্গত ও উত্তমভাবে—জীবনযাপনের নির্দেশ দিয়েছে।
*১২. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার*
সূরা আল-বাকারা ২:২২৮
> “আর নারীদের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে তেমন অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর অধিকার রয়েছে।”
এই আয়াত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে:
*অধিকার ও দায়িত্ব পারস্পরিক।*
*১৩. পুরুষের কাওয়ামাহ — পরিবারের দায়িত্ব*
সূরা আন-নিসা ৪:৩৪
> “পুরুষরা নারীদের ওপর কাওয়াম, কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন এবং কারণ তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে।”
এখানে পুরুষকে **কাওয়াম** বলা হয়েছে—অর্থাৎ পরিবারের দায়িত্বশীল, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও দেখাশোনাকারী।
আয়াতটি এর একটি কারণ হিসেবে পুরুষের **অর্থ ব্যয় করার দায়িত্ব* উল্লেখ করেছে।
অতএব কুরআনের আলোকে পুরুষের কাওয়ামাহকে শুধু কর্তৃত্ব হিসেবে নয়, বরং **দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার সঙ্গে যুক্ত পারিবারিক ভূমিকা** হিসেবে দেখা উচিত।
*১৪. নারীর আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা*
সূরা আন-নিসা ৪:৩৪
একই আয়াতে বলা হয়েছে:
> “সুতরাং সৎ নারীরা অনুগত এবং আল্লাহ যা সংরক্ষণ করতে বলেছেন তা গোপনে সংরক্ষণ করে।”
এখানে নারীদের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে **অনুগত হওয়া** এবং অনুপস্থিতিতে যা সংরক্ষণ করা উচিত তা সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে।
এই বক্তব্যকে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার এবং সদ্ভাবে জীবনযাপনের নির্দেশের সঙ্গে একত্রে দেখতে হবে।
*১৫. ৬৬:১–৫ — নবীর পারিবারিক ঘটনা, আনুগত্য ও তওবা*
সূরা আত-তাহরীম ৬৬:১–৫
এই অংশে নবীর পারিবারিক জীবনের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
৬৬:১
> “হে নবী! আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন, তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনা করে তা কেন নিজের জন্য হারাম করছ?”
৬৬:২
এরপর আল্লাহ শপথের কাফফারার বিধান উল্লেখ করেন।
৬৬:৩–৪
নবী তাঁর একজন স্ত্রীকে একটি গোপন কথা বলেছিলেন। পরে তা প্রকাশিত হলে আল্লাহ তাঁকে তা জানিয়ে দেন এবং সংশ্লিষ্ট স্ত্রীদের তওবা করতে বলেন।
> “তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করো…”
৬৬:৫
> “যদি তিনি তোমাদের তালাক দেন, তবে তাঁর প্রতিপালক সম্ভবত তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দেবেন—আত্মসমর্পণকারী, বিশ্বাসী, অনুগত, তওবাকারী, ইবাদতকারী…”
এই আয়াতগুলোতে **আনুগত্য, তওবা এবং দাম্পত্য সম্পর্কের দায়িত্ব** তুলে ধরা হয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি:
**৬৬:১–৫ সাধারণ মুসলিম স্বামীদের জন্য স্ত্রী অবাধ্য হলে কোনো নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান দেয় না।*
বরং এই অংশটি নবীর পারিবারিক একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং এতে তওবা, আনুগত্য ও প্রয়োজনে বিচ্ছেদের সম্ভাবনার কথা এসেছে এবং মুমিনদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।
*১৬. মাহর — নারীর অধিকার*
সূরা আন-নিসা ৪:৪
> “আর নারীদের তাদের মাহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।”
মাহর নারীর নিজস্ব অধিকার।
নারী যদি নিজের ইচ্ছায় মাহরের কোনো অংশ ছেড়ে দেয়, তখন তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
*১৭. মাহরের নির্দিষ্ট পরিমাণ*
কুরআন মাহর প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন বা সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণ করেনি।
সূরা আন-নিসা ৪:২০
এমনকি অনেক সম্পদ মাহর হিসেবে দেওয়া হলেও তা অন্যায়ভাবে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।
*১৮. মাহর ফিরিয়ে নেওয়া নিষিদ্ধ*
সূরা আন-নিসা ৪:২০–২১
একজন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করলেও আগের স্ত্রীকে দেওয়া সম্পদ অন্যায়ভাবে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।
এরপর ৪:২১-এ বিবাহকে একটি **দৃঢ় অঙ্গীকার** হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
*১৯. যাদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ*
সূরা আন-নিসা ৪:২২–২৪
এই আয়াতগুলোতে বিভিন্ন নিষিদ্ধ সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
* মা
* মেয়ে
* বোন
* পিতার বোন
* মায়ের বোন
* ভাইয়ের মেয়ে
* বোনের মেয়ে
* দুধ-মা
* দুধ-বোন
* স্ত্রীর মা
* নির্দিষ্ট অবস্থায় সৎকন্যা
* নিজের ঔরসজাত ছেলের স্ত্রী
* একই সময়ে দুই বোন
এছাড়া বিবাহিত নারীকে বিবাহ করাও নিষিদ্ধ বলে ৪:২৪-এ উল্লেখ করা হয়েছে।
*২০. বিবাহ ও পবিত্রতা*
সূরা আন-নিসা ৪:২৪
বৈধ বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর প্রাপ্য প্রদান এবং পবিত্রতার উদ্দেশ্যে সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
সূরা আল-মায়িদা ৫:৫
আহলে কিতাবের পবিত্র নারীদের সঙ্গে বিবাহের ক্ষেত্রেও পবিত্রতা এবং ব্যভিচার থেকে পৃথক থাকার কথা বলা হয়েছে।
*২১. একাধিক বিবাহ ও ন্যায়বিচার*
সূরা আন-নিসা ৪:৩
> “দুই, তিন অথবা চার; কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে ন্যায় করতে পারবে না, তবে একজন…”
এই আয়াতে একাধিক বিবাহের সঙ্গে **ন্যায়বিচার**কে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।
অতএব:
*ন্যায় করতে পারলে — দুই, তিন বা চার পর্যন্ত।*
*ন্যায় করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে — একজন।*
*২২. এতিমদের ব্যাপারে ন্যায়*
সূরা আন-নিসা ৪:৩
একাধিক বিবাহের বক্তব্যটি এতিমদের ব্যাপারে ন্যায়বিচারের প্রসঙ্গের মধ্যে এসেছে।
তাই আয়াতটি তার সম্পূর্ণ প্রসঙ্গসহ বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
*২৩. বিবাহের চুক্তি*
সূরা আল-বাকারা ২:২৩৫
কুরআনে “ *নিকাহের চুক্তি* ” সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি দেখায় যে বিবাহ একটি স্বীকৃত **চুক্তি ও অঙ্গীকার**।
*২৪. ইদ্দতের সময় নতুন বিবাহ*
সূরা আল-বাকারা ২:২৩৫
ইদ্দতের সময় শেষ হওয়ার আগে নতুন বিবাহের চুক্তি সম্পন্ন করতে নিষেধ করা হয়েছে।
*২৫. সহবাসের আগে তালাক*
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৯
যদি কোনো নারীকে বিবাহ করার পর তাকে স্পর্শ/সহবাসের আগে তালাক দেওয়া হয়, তাহলে তার ওপর ইদ্দত নেই।
তাকে উপযুক্ত কিছু প্রদান করে সুন্দরভাবে বিদায় দিতে বলা হয়েছে।
*২৬. সহবাসের আগে তালাক ও মাহর*
সূরা আল-বাকারা ২:২৩৬–২৩৭
সহবাসের আগে তালাক হলে মাহর নির্ধারিত ছিল কি না, তার ওপর ভিত্তি করে আর্থিক বিধান দেওয়া হয়েছে।
এতে বিবাহ-চুক্তি ও মাহরের আর্থিক অধিকারের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়।
*২৭. তালাকের পর পুনর্বিবাহ*
সূরা আল-বাকারা ২:২৩২
ইদ্দত শেষ হওয়ার পর নারী-পুরুষ যদি ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্মত হয়, তাহলে তাদের পুনরায় বিবাহে বাধা দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
*২৮. তালাক — হয় সুন্দরভাবে রাখা, নয় সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া*
সূরা আল-বাকারা ২:২২৯
> “হয় ন্যায়সঙ্গতভাবে রেখে দেওয়া, অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া।”
বিবাহ টিকিয়ে রাখা সম্ভব না হলে বিচ্ছেদও ন্যায় ও সম্মানের সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।
*২৯. তালাকের সময় ক্ষতি করা নিষিদ্ধ*
সূরা আল-বাকারা ২:২৩১
তালাকের পর নারীদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আটকে রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।
অতএব বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও কুরআনের নীতি:
**ন্যায় + সম্মান + ক্ষতি না করা।**
*৩০. তালাকের ক্ষেত্রে দুইজন সাক্ষী*
সূরা আত-তালাক ৬৫:২
> “আর তোমাদের মধ্য থেকে দুইজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখো…”
এখানে কুরআন স্পষ্টভাবে **দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর** কথা বলেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নির্দেশটি **তালাকের প্রসঙ্গে** এসেছে।
*৩১. বিবাহের জন্য দুইজন সাক্ষী কি কুরআনে নির্ধারিত?*
বিবাহের ক্ষেত্রে কুরআনে এমন কোনো আয়াত নেই যেখানে বলা হয়েছে:
> “বিবাহের জন্য অবশ্যই দুইজন সাক্ষী থাকতে হবে।”
অন্যদিকে তালাকের ক্ষেত্রে ৬৫:২-এ দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর কথা স্পষ্টভাবে এসেছে।
তাই কুরআনের সরাসরি বক্তব্য অনুযায়ী *দুইজন সাক্ষীকে বিবাহের বৈধতার বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় না।*
*৩২. ওয়ালি বা অভিভাবক*
কুরআনে বিবাহের বৈধতার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওয়ালি বা অভিভাবকের অনুমতিকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে সরাসরি বলা হয়নি।
সূরা আল-বাকারা ২:২৩২
তালাকপ্রাপ্ত নারী ও পুরুষ যখন ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্মত হয়, তখন তাদের পুনর্বিবাহে বাধা দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
অতএব কুরআনের আলোকে “ *ওয়ালির অনুমতি ছাড়া বিবাহ অবৈধ* ”—এমন সরাসরি বিধান কুরআনে নেই।
*৩৩. ইমাম, কাজি বা নির্দিষ্ট বিবাহ অনুষ্ঠান*
কুরআনে বিবাহের বৈধতার জন্য:
* ইমাম
* কাজি
* মসজিদ
* নির্দিষ্ট খুতবা
* নির্দিষ্ট আরবি বাক্য
* নির্দিষ্ট পোশাক
* নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান
এর কোনোটি বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি।
অতএব এগুলোকে **কুরআনের নির্ধারিত বিবাহের শর্ত** বলা যায় না।
*৩৪. কুরআনের আলোকে বিবাহের সামগ্রিক কাঠামো*
**বৈধ জীবনসঙ্গী**
↓
**পারস্পরিক সম্মতি**
↓
**বিবাহের অঙ্গীকার/চুক্তি**
↓
**মাহর**
↓
**পবিত্রতা**
↓
**দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা**
↓
**প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া**
↓
**পুরুষের পারিবারিক দায়িত্ব**
↓
**নারীর আনুগত্যশীলতা**
↓
**পারস্পরিক অধিকার**
↓
**ন্যায় ও সদ্ভাবে জীবনযাপন**
সম্পর্ক ভেঙে গেলে:
**তালাক**
↓
**ইদ্দত**
↓
**পুনর্মিলনের সুযোগ**
↓
**ন্যায়সঙ্গতভাবে রাখা অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া**
↓
**আর্থিক অধিকার সংরক্ষণ**
↓
**তালাকের ক্ষেত্রে দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী**
✍️*শেষ কথা*
কুরআনের আলোকে বিবাহ একটি **দৃঢ় অঙ্গীকার ও গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সম্পর্ক**। এর উদ্দেশ্য শুধু একসঙ্গে বসবাস করা নয়; বরং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে **প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া** প্রতিষ্ঠা করা।
কুরআন বিবাহের ক্ষেত্রে **জীবনসঙ্গী, পারস্পরিক সম্মতি, পবিত্রতা, মাহর, দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা, পারিবারিক দায়িত্ব, আনুগত্য, পারস্পরিক অধিকার এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণ**-এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
**সূরা আর-রূম ৩০:২১** বিবাহের উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার কথা বলে।
**সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৯** জীবনসঙ্গী, দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা এবং গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়ের কথা উল্লেখ করে।
**সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭ ও ২:২২৩** স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতার কথা বলে।
**সূরা আন-নিসা ৪:২১** বিবাহকে একটি দৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করে।
**সূরা আন-নিসা ৪:৪** নারীর মাহরের অধিকার নিশ্চিত করে।
**সূরা আল-বাকারা ২:২২৮** স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকারের নীতি প্রতিষ্ঠা করে।
**সূরা আন-নিসা ৪:১৯** স্ত্রীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপনের নির্দেশ দেয়।
**সূরা আন-নিসা ৪:৩৪** পুরুষের কাওয়ামাহ বা পারিবারিক দায়িত্ব এবং সৎ নারীদের আনুগত্যশীলতার কথা উল্লেখ করে।
**সূরা আত-তাহরীম ৬৬:১–৫** নবী ﷺ-এর পারিবারিক একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মাধ্যমে তওবা, আনুগত্য এবং প্রয়োজনে বিচ্ছেদের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে। তবে এই আয়াতগুলোকে সাধারণভাবে **“স্ত্রী অবাধ্য হলে নির্দিষ্ট শাস্তি”** হিসেবে উপস্থাপন করা কুরআনের সরাসরি বক্তব্য নয়।
**সূরা আন-নিসা ৪:৩** একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের শর্তের কথা বলে।
**সূরা আল-বাকারা ২:২৩২** পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতির গুরুত্ব দেখায়।
**সূরা আল-বাকারা ২:২২৯–২৩১** তালাকের ক্ষেত্রেও ন্যায়, সম্মান এবং ক্ষতি না করার নির্দেশ দেয়।
**সূরা আত-তালাক ৬৫:২** তালাকের ক্ষেত্রে দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে।
সুতরাং কুরআনের আলোকে একটি সুস্থ বিবাহের ভিত্তি হলো:
**প্রশান্তি → ভালোবাসা → দয়া → পবিত্রতা → পারস্পরিক সম্মতি → মাহর → দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতা → দায়িত্ব → আনুগত্য → পারস্পরিক অধিকার → ন্যায় → সদ্ভাবে জীবনযাপন।**
আর যখন কোনো কারণে বিবাহ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না, তখনও কুরআনের নির্দেশ হলো
*ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্পর্ক রাখা অথবা সুন্দরভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়া**, কারও অধিকার নষ্ট না করা এবং কারও ক্ষতি না করা।