চলতি ৮ মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ, ছাড়-পরিশোধে বিপজ্জনক সমতা
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নীরব চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে যে বিদেশি ঋণ একসময় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো, সেই ঋণই এখন বড় বোঝা হয়ে ফিরে আসছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ এসেছে, প্রায় সমপরিমাণ অর্থই আবার দেশ ছাড়ছে—সুদ ও আসল পরিশোধের মাধ্যমে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। এই সময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঋণ ও অনুদান। বিপরীতে, পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ২৯০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, অর্থ আসা আর যাওয়ার হিসাব প্রায় সমান—যা অর্থনীতিবিদদের ভাষায় “ঋণচক্রের সংকেত”।
সুদ-আসলে গিলে খাচ্ছে অর্থপ্রবাহ
এই আট মাসে শুধু আসল ঋণ পরিশোধেই গেছে প্রায় ১৯৫ কোটি ডলার, আর সুদ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৯৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ, দেশের অর্জিত বৈদেশিক সম্পদের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে অতীতের দায় মেটাতে।
অন্যদিকে নতুন ঋণ হিসেবে এসেছে ২৭৯ কোটি ডলার এবং অনুদান মাত্র ২৬ কোটি ডলার—যা মোট অর্থের তুলনায় খুবই সামান্য।
বাড়ছে চাপ, সংকুচিত হচ্ছে স্বস্তি
গত কয়েক বছর ধরে এই প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। গত অর্থবছরেই ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সরকারের সতর্ক বার্তা
এমন বাস্তবতায় সরকারের পক্ষ থেকেও এসেছে সতর্ক বার্তা। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, আগের মতো ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো হবে না। অর্থাৎ, উন্নয়নের পথ এখন আরও হিসাবি ও নিয়ন্ত্রিত করতে চাইছে সরকার।
কারা দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি ঋণ?
এই সময়ের ঋণ ছাড়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রাশিয়া, যারা দিয়েছে ৭৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার। এরপর রয়েছে বিশ্বব্যাংক (৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি (৫৬ কোটি ৬১ লাখ ডলার)।
চীন, ভারত ও জাপানও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ ছাড় করেছে।
প্রতিশ্রুতি বাড়লেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ পেয়েছে ২৪৩ কোটি ডলারের নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি—যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই নতুন ঋণ কি সত্যিই উন্নয়নের গতি বাড়াবে, নাকি ভবিষ্যতের বোঝা আরও ভারী করবে?
শেষকথা: উন্নয়নের মূল্য কত?
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উন্নয়নের স্বপ্ন, অন্যদিকে ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ।
যদি ঋণ নিয়ে উন্নয়ন হয়, কিন্তু সেই উন্নয়নের ফল দিয়ে ঋণ শোধ করাই কঠিন হয়ে পড়ে—তবে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই?
এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। 🔥