×
×
Monday, 27 July, 2026, 7:40 pm


মানুষ কেন আল্লাহর দ্বীন ছেড়ে পূর্বপুরুষদের প্রথাকে প্রাধান্য দেয়

মানুষ জন্মগতভাবে অনুসরণপ্রবণ। সে একা চলতে চায় না—সে দেখে, শোনে, শেখে, এবং অনুকরণ করে। এই অনুকরণের মধ্যেই গড়ে ওঠে সংস্কৃতি, প্রথা, ঐতিহ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যখন এই প্রথা সত্যের বিপরীতে দাঁড়ায়, তখন মানুষ কাকে বেছে নেয়?

কোরআন আমাদের সামনে এই প্রশ্নটি বারবার উত্থাপন করে—
মানুষ কি আল্লাহর নাযিলকৃত দ্বীন অনুসরণ করবে, নাকি পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া পথ?

✦ পূর্বপুরুষের পথ: নিরাপত্তার মায়া

মানুষের কাছে সবচেয়ে আরামদায়ক পথ হলো—যে পথে সে তার পিতা-মাতা, সমাজ ও পূর্বপুরুষদেরকে চলতে দেখেছে। এই পথ তার কাছে পরিচিত, সহজ এবং নিরাপদ মনে হয়। তাই যখন তাকে বলা হয়, “আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ কর,” তখন সে উত্তর দেয়—
“আমাদের জন্য তো যথেষ্ট আমাদের পূর্বপুরুষদের পথই।”

কোরআন এই মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে। সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়—
যদি সেই পূর্বপুরুষরা কিছুই না বুঝত? যদি তারা সত্যপথে না থাকত?
তাহলে কি অন্ধভাবে তাদের অনুসরণ করাই যুক্তিসঙ্গত?

এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের এক গভীর দুর্বলতা—
সে সত্যের চেয়ে পরিচিতিকে বেশি ভালোবাসে।

✦ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ভয়

সত্য কখনো কখনো কঠিন হয়।
এটি আমাদের অভ্যাস ভেঙে দেয়, আমাদের আরামদায়ক জগতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

যখন কোরআনের আহ্বান আসে—
“এসো, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার দিকে ফিরে আসো”—
তখন অনেকেই পিছিয়ে যায়। কারণ, এই আহ্বান মানে হলো—
নিজের ভুল স্বীকার করা, সমাজের প্রচলিত পথ থেকে বেরিয়ে আসা, এবং এক নতুন জীবন শুরু করা।

এই ভয়ই মানুষকে বাধা দেয়।
সে ভাবে—
“আমি যদি আমার পূর্বপুরুষদের পথ ছেড়ে দেই, তবে আমি কোথায় দাঁড়াবো?”

✦ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভ্রান্তি

মানুষ প্রায়ই মনে করে—যা অধিকাংশ মানুষ করছে, সেটাই সঠিক।
কিন্তু কোরআন এই ধারণাকে ভেঙে দেয়।

কোরআন সতর্ক করে—
যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ কর, তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।

এখানে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে—
সত্য কখনো সংখ্যার উপর নির্ভর করে না।
সত্য একা হলেও সত্য, আর মিথ্যা হাজার জনের সমর্থন পেলেও মিথ্যাই থাকে।

✦ জাহেলিয়াতের আধুনিক রূপ

অনেকে মনে করে “জাহেলিয়াত” মানে শুধুই প্রাচীন যুগের অজ্ঞতা।
কিন্তু কোরআন দেখায়—
যখনই মানুষ আল্লাহর বিধান ছেড়ে অন্য কোনো বিধানকে প্রাধান্য দেয়, তখনই তা জাহেলিয়াত।

আজও মানুষ নানা সামাজিক প্রথা, পারিবারিক রীতি, কিংবা ব্যক্তিগত মতামতকে আল্লাহর নির্দেশনার উপরে স্থান দেয়।
এগুলো দেখতে আধুনিক হলেও, মূলত এগুলো সেই পুরনো অন্ধকারেরই নতুন রূপ।

প্রশ্ন হলো—
মানুষ কি সত্যিই আল্লাহর বিধানকে সর্বোচ্চ স্থান দিচ্ছে, নাকি নিজের সুবিধামতো পথ বেছে নিচ্ছে?

✦ চিন্তার আহ্বান: কোরআনের বিপ্লব

কোরআন অন্ধ অনুসরণ চায় না।
বরং এটি মানুষকে চিন্তা করতে, বুঝতে, এবং সত্যকে যাচাই করতে আহ্বান জানায়।

যারা কথা শোনে এবং তার মধ্যে উত্তমটিকে অনুসরণ করে—
কোরআন তাদেরকেই সৎপথপ্রাপ্ত বলে ঘোষণা করে।

এখানে একটি বিপ্লবী ধারণা রয়েছে—
মানুষকে তার বুদ্ধি ব্যবহার করতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, এবং সত্যকে খুঁজে নিতে হবে।

✦ সত্যের পথে একাকীত্ব

সত্যের পথ সবসময় সহজ নয়।
অনেক সময় এটি একাকীত্বের পথ।

যখন একজন মানুষ তার সমাজের প্রচলিত ভুল প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সে সমালোচিত হয়, উপহাসের শিকার হয়, এমনকি প্রত্যাখ্যাত হয়।

কিন্তু কোরআন আমাদের শেখায়—
সত্যের মূল্য অনেক বেশি।
এটি সাময়িক কষ্টের বিনিময়ে চিরস্থায়ী সফলতা এনে দেয়।

✦ ফিরে আসার ডাক

এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ একটি পথের যাত্রী।
কেউ চলে অন্ধ অনুসরণের পথে,
আর কেউ চলে সচেতনভাবে সত্যের সন্ধানে।

কোরআনের আহ্বান স্পষ্ট—
মানুষ যেন প্রথার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আল্লাহর আলোতে প্রবেশ করে।

এটি শুধু একটি ধর্মীয় আহ্বান নয়,
এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক এবং আত্মিক বিপ্লবের ডাক।

আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে—
আমরা কি সত্যের অনুসারী,
নাকি আমরা শুধু আমাদের পূর্বপুরুষদের ছায়া হয়ে বেঁচে আছি?

আরও