×
×
Wednesday, 29 July, 2026, 1:00 pm


সূরা আন-নিসা, আয়াত নং- ১৩৫: ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ

আরবি পাঠ:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ۚ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا ۚ وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا

উচ্চারণ: “ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু কুনু কাওওয়ামিনা বিল-কিসতি শুহাদা-আ লিল্লাহি ওয়া লাও ‘আলা আনফুসিকুম আওয়িল ওয়ালিদাইনি ওয়াল-আকরাবিন, ইঁ ইয়াকুন গানিয়্যান আও ফাকিরান ফাল্লাহু আওলা বিহিমা, ফালা তাত্তাবি‘উল হাওয়া আন তা‘দিলু, ওয়া ইন তালউ আও তু‘রিদু ফাইন্নাল্লাহা কানা বিমা তা‘মালুনা খাবিরা।”

আয়াতের অনুবাদ:
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। (সে ব্যক্তি) যদি ধনী বা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ উভয়েরই বেশি ঘনিষ্ঠ। কাজেই তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা সাক্ষ্যে পেঁচালো কথা বল অথবা তা দিতে অস্বীকার কর, তবে তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।”

১. আয়াতের মূল নির্দেশ

এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে চারটি মৌলিক নির্দেশ দিয়েছেন:

ক. ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা:
আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে।” অর্থাৎ মাঝে মাঝে ন্যায় করা যথেষ্ট নয়; বরং সবসময়, সব অবস্থায় ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকা মুমিনের দায়িত্ব।

খ. আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেওয়া:
“আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে” – এই বাক্যটি সাক্ষ্যের মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, সম্পর্ক বা লোভ-লালসার জন্য নয়, শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য সাক্ষ্য দিতে হবে।

গ. নিকটজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য:
আয়াতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, “যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।” কোরআন স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করছে যে, সম্পর্কের মায়া ন্যায়বিচারের পথে প্রতিবন্ধক হতে পারে না। নিজের বা নিজের লোকের ক্ষতি হলেও সত্য বলতে হবে।

ঘ. ধনী-গরিবের বৈষম্য না করা:
“সে যদি ধনী বা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ উভয়েরই বেশি ঘনিষ্ঠ।” অর্থাৎ ধনীকে তার সম্পদের মর্যাদায় আর গরিবকে তার অভাবের জন্য মায়া করে সত্য গোপন করা যাবে না। তাদের প্রকৃত কল্যাণ কী, তা আল্লাহই ভালো জানেন।

২. নিষিদ্ধ কাজ

আয়াতে দুটি কাজ করতে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে:

ক. প্রবৃত্তির অনুসরণ:
“তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।” ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, রাগ, ভালোবাসা বা ঘৃণা যেন ন্যায় থেকে বিচ্যুত না করে।

খ. সাক্ষ্যে বিকৃতি বা অস্বীকার:
“যদি তোমরা সাক্ষ্যে পেঁচালো কথা বল অথবা তা দিতে অস্বীকার কর” – সত্য গোপন করা বা বিকৃত করাও বড় অন্যায়।

৩. আয়াতের শেষ সতর্কবাণী

আল্লাহ বলেন, “তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।”
সত্য গোপন করা হোক বা বিকৃত করা, মানুষের চোখে তা ধরা না পড়লেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছু লুকানো সম্ভব নয়। প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে।

৪. কোরআনের অন্যান্য আয়াতে সমর্থন

এই আয়াতের নির্দেশনা কোরআনের অন্যান্য আয়াতেও পাওয়া যায়:

· সূরা আল-মায়েদা (৫:৮): “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়সাক্ষ্য দানে অবিচল থাকবে। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা তোমাদেরকে যেন সুবিচার থেকে বিরত না রাখে। তোমরা ন্যায়বিচার করবে, এটাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী।”

· সূরা আল-আনআম (৬:১৫২): “তোমরা ন্যায়বিচার করবে, যদিও তা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।”

· সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:৯): মুমিনদের মধ্যে বিবাদ হলে ন্যায়সঙ্গত মীমাংসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৫. আয়াতের মূল শিক্ষা

১. ন্যায়বিচার ইমানের দাবি: ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি মুমিনের ইমানের অপরিহার্য অংশ।

২. সম্পর্কের ঊর্ধ্বে সত্য: পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন এমনকি নিজের বিরুদ্ধে গেলেও সত্য বলতে হবে।

৩. পক্ষপাতহীনতা: ধনী-গরিব, উচ্চ-নীচ কোনো ভেদাভেদ সাক্ষ্যে স্থান পাবে না।

৪. জবাবদিহির চেতনা: সব কাজের ওপর আল্লাহ তত্ত্বাবধান করেন, তাই সাক্ষ্যে সততা অবশ্যই পালনীয়।

৫. আবেগ নয়, ন্যায়: প্রবৃত্তির অনুসরণ নয়, কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ন্যায়বিচার করতে হবে।

এই আয়াত মানবসমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কোরআনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্পষ্ট নির্দেশনাগুলোর একটি। এটি ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অনন্য দিক-নির্দেশনা দেয়।

আরও