×
×
Saturday, 31 October, 2026, 8:25 pm


“ইফতারের জাঁকজমক আর অবহেলিত মানুষের নিদারুন সংগ্রামঃ রমজানে এক বিচিত্র বৈপরীত্য”

পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের বার্তা নিয়ে আসে। এ মাসের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ইফতার। দিনভর রোজা রাখার পর ইফতারের মাধ্যমে রোজা ভাঙা হয়। বর্তমান সময়ে ইফতার শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাঁকজমকের একটি অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই জাঁকজমকের উল্টোপিঠে চোখ রাখলে ধরা পড়ে সমাজের এক অবহেলিত অংশের নিদারুণ জীবনের করুণ চিত্র, যাদের জন্য একবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এই পবিত্র মাসেও।

শহরের পাঁচতারা হোটেল থেকে শুরু করে অলিগলির দোকানগুলোতে ইফতারের জন্য নেওয়া হয় বাড়তি আয়োজন। বাহারি পদের ইফতার সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয় ইফতারির দোকানগুলো। ছোলা, মুড়ি, জিলাপি, বেগুনি, পেঁয়াজু, চিকেন রোল, ফ্রুট চাট, হালিম, বিভিন্ন রকমের শরবত—কী নেই তালিকায়! বিত্তবানদের ইফতার টেবিলে দেখা মেলে দেশি-বিদেশি নানা পদের সমাহার। শুধু পেট পুরে খাওয়াই নয়, বরং ইফতারের আয়োজন হয়ে ওঠে সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তির প্রতীক। অনেকে আবার ইফতার পার্টির আয়োজন করে থাকেন, যা অনেক সময় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের চেয়ে বাড়াবাড়িতে রূপ নেয়।

ঠিক একই শহরে, বিলাসবহুল ইফতার আয়োজনের পাশেই কাট-ছেঁড়া জামা গায়ে জীর্ণশীর্ণ কিছু মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে অতি সাধারণ একটি ইফতারির আশায়। রিকশাচালক, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, পথশিশু, বস্তিবাসী—এসব মানুষদের জন্য রোজা মানেই শুধু খাদ্য নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং রোজগার কমে যাওয়া ও অভাব আরও গভীর হওয়ার আরেক নাম। তাদের দুপুরের খাবার জোটেনি, ইফতার তো দূরের কথা।

এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অনেকের জন্য ইফতার মানে কিছু ভাঙা ছোলা, একটি মুড়ি আর পানি। হয়তো কারও কাছে তা-ও জোটে না। অভাবের সংসারে এক টুকরো খেজুরও যেন অমৃত। বিত্তবানেরা যখন খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করেন, তখন তারা হয়তো জানেন না, এই একই খেজুর শহরের অপর প্রান্তের কোনো শিশুর চোখে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের নাম। হোটেলের বাইরে ফেলে দেওয়া অতিরিক্ত খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকে অনাহারি চোখ, যা কোনো নিয়তি তাদের নাগালের বাইরে রেখেছে।

ইফতারের এই আয়োজন আর অবহেলিত মানুষের নিদারুণ জীবন যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এক পাশে খাবারের অপচয়, অপর পাশে খাবারের জন্য হাহাকার। ইফতারকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হয়, যা অসহায় মানুষের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজের এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি নৈতিক প্রশ্নও বটে। যারা পারেননি, তাদের প্রতি কি আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই?

রমজানের শিক্ষা হলো আত্মসংযম ও সহমর্মিতা। এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ইফতারের আয়োজনে বাড়াবাড়ি না করে বরং খরচের একটি অংশ অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করা উচিত। ব্যক্তি পর্যায়ে ইফতারের সময় প্রতিবেশী ও কর্মক্ষেত্রের অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করা জরুরি। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, মসজিদ ও ধনী ব্যক্তিদের উচিত পবিত্র এ মাসে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের ইফতার ও সাহ্রির ব্যবস্থা করা এবং খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া।

ইফতারের রকমারি আয়োজন আর অবহেলিত মানুষের নিদারুন জীবনের চিত্র আমাদের সামনে সামাজিক বৈষম্যের একটি কঠিন বাস্তবতা উপস্থাপন করে। রমজান আমাদের শেখায় ভোগবিলাস নয়, বরং ত্যাগ ও অন্যের দুঃখে দুঃখিত হওয়া। আসুন, এই পবিত্র মাসে আমরা নিজেদের ইফতারের জাঁকজমক কমিয়ে, সেই অপচয়কৃত অর্থ ও খাদ্য দিয়ে কোনো ক্ষুধার্ত মানুষের ইফতার ও জীবিকার ব্যবস্থা করি। তবেই না রমজানের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হবে।

[atn_photocard]
আরও