×
×
Saturday, 7 November, 2026, 10:27 am


জ্বালানি আমদানির ঊর্ধ্বগতিতে চাপে বৈদেশিক লেনদেন: ৩ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ৭৪৭ কোটি ডলার

চলতি হিসাবে ১৩৩ কোটি ডলারের ঘাটতি, সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যেও বড় ধস; রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, রিজার্ভে বাড়ছে চাপ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের অর্থনীতির বহিঃখাত একটি বড় ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের অগ্নিগর্ভ মূল্যবৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে মন্দাভাবের কারণে দেশের রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় বৈদেশিক লেনদেনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বসাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই তিন মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৭ কোটি ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি শুধুমাত্র সামষ্টিক অর্থনীতির হিসাবের খাতায় একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি ডলার বাজারে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মুদ্রার বিনিময় হারকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধানে বাড়ছে অস্থিরতা

বৈদেশিক লেনদেনের এই সংকটের মূলে রয়েছে আমদানি ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল এর চেয়ে অনেক কম। অপরদিকে, এই সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৮৩৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ, রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে এই বিশাল ব্যবধানই মূলত বাণিজ্য ঘাটতিকে ৭৪৭ কোটি ডলারে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানিমুখী, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিশ্ববাজারে ইউরোপ এবং আমেরিকার মতো প্রধান ক্রেতা দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে পোশাকের অর্ডার কমেছে এবং দামও পড়েছে। এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে রপ্তানি খাত আমদানি ব্যয়ের বিপরীতে প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করতে পারছে না।

আরো পড়ুনঃ

মধ্যবিত্তই যখন হাঁপিয়ে উঠছে, নিম্নমধ্যবিত্তের সংসার চলছে কীভাবে?

জ্বালানি আমদানিতেই বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ

আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এবং লুব্রিকেন্ট। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের কারণে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে এই খাতে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৪২২ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ২০৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে ১০৫ শতাংশেরও বেশি, যা প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর। অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজান থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি সেচ, পরিবহন এবং শিল্প খাতের চাহিদা মেটাতে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের ব্যাপক আমদানি করতে হচ্ছে। এই উচ্চমূল্যের জ্বালানি আমদানি দেশের ডলার বাজারে যে চাপ তৈরি করছে, তা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কমিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, কারণ এই পণ্যগুলোর চাহিদা অস্থিতিস্থাপক। অর্থাৎ, দাম বাড়লেও আমদানি কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে নিমজ্জন

বাণিজ্য ঘাটতির প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যও (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) বড় ধাক্কা খেয়েছে। চলতি হিসাব হলো একটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, রেমিট্যান্স এবং অন্যান্য আয়ের সমষ্টি। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস শেষে এসে তা ১৩৩ কোটি ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তরটি খুব দ্রুত ঘটেছে এবং এটি বহিঃখাতের ওপর বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিতবাহী।

এ সময়ে রেমিট্যান্সে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়েছেন, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক। কিন্তু রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি কাজে লাগিয়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি ঠেকানো যায়নি। কারণ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে যে পরিমাণ ডলার আসছে, আমদানি ও অন্যান্য খাতে তার চেয়ে অনেক বেশি ডলার ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি আড়াইশ কোটি ডলারের বেশি হলেও তা কয়েক হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে সমর্থ হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় চলতি হিসাবে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়লেও তা আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। এই ঘাটতি ডলারের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি করছে, যা বিনিময় হারের ওপর অস্থিরতা তৈরি করে।

আর্থিক হিসাবে সামান্য স্বস্তি, তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে

যদিও চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়ছে, তবুও আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আর্থিক হিসাব বলতে মূলত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বিদেশি ঋণ, অনুদান এবং পোর্টফোলিও বিনিয়োগকে বোঝায়। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি থাকলেও সেপ্টেম্বর শেষে তা ৩২ কোটি ডলারের উদ্বৃত্তে ফিরেছে। মূলত কিছু বিদেশি ঋণ ও অনুদান প্রবাহ আসায় এই সাময়িক উন্নতি হয়েছে।

তবে বিস্তারিত হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত অনেক কম। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) এ হিসাবে ১৭৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। ওই সময়ে বিদেশি ঋণ এসেছিল ১০০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণ এসেছে ঠিক তার অর্ধেক, অর্থাৎ ৫০ কোটি ডলার। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও (এফডিআই) প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং ডলার বিনিময় হারের অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।

সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় সংকট

বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবের ঘাটতি মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে (Overall Balance of Payment) বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত রেমিট্যান্স ও আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্তের কারণে সামগ্রিক হিসাব কিছুটা চালু রাখা যাচ্ছিল। তবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে বিদেশি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে ১১৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি থাকলেও সামগ্রিক ঘাটতি পূরণে তা যথেষ্ট হয়নি। এই পরিস্থিতি দেশের বৈদেশিক খাতের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। সামগ্রিক ভারসাম্যের ঘাটতির অর্থ হলো, দেশের কাছে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার মোট পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে বাধ্য করছে।

রিজার্ভের ওপর বাড়ছে চাপ এবং বিনিময় হারের অস্থিরতা

এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংককে বাজারে ডলারের যোগান ধরে রাখতে এবং আমদানি বিল পরিশোধের জন্য ক্রমাগত রিজার্ভ থেকে ডলার ছাড়তে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী, দেশের gross reserve বর্তমানে ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ওঠানামা করছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম। একটি দেশের জন্য কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমান রিজার্ভ থাকা উচিত। বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে কিছুদিন চললেও, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

এদিকে, ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশীয় মুদ্রা টাকার মান ক্রমাগত কমছে। গত কয়েক বছরে টাকার অবমূল্যায়ন (ডি-ভ্যালুয়েশন) একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে ডলারপ্রতি টাকার মান ৮৫ টাকার ঘরে থাকলেও, বর্তমানে তা ১২০ টাকারও বেশি হয়েছে। টাকার এই অবমূল্যায়ন রপ্তানি খাতের জন্য কিছুটা সহায়ক হলেও, এটি আমদানি খরচ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ডলারের বাজারকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সাময়িকভাবে বিনিময় হার স্থিতিশীল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা রিজার্ভের ওপর বড় চাপ ফেলে। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণ করা হলে ডলারের চাহিদা কিছুটা কমে আসতে পারে এবং রিজার্ভ কমার হারও ধীর হতে পারে।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয়ের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে এর দাম আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এতে সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হলেও পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই আশাবাদের পেছনে যুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করলে এবং দেশের রপ্তানি খাতে গতি ফিরলে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, শুধুমাত্র জ্বালানির দাম কমার ওপর নির্ভর করা যাবে না। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা বাড়ানো না হলে বৈদেশিক লেনদেনের এই কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে যাবে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ভরসা। তবে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনোই বাণিজ্য ঘাটতির দauerি সমাধান নয়। প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ মূলত ভোগে ব্যবহৃত হয়, যা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের চেয়ে আলাদা। তাই রেমিট্যান্স প্রবাহকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বৈধ পথে ডলার আনতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে হুন্ডি বন্ধ করে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

পথ কী?

বৈদেশিক লেনদেনের চলমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। জ্বালানি ব্যবহারে অপচয় রোধ, বিকল্প উৎস থেকে সাশ্রয়ী দামে গ্যাস ও তেল কেনার চুক্তি করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে নতুন বাজার খুঁজতে হবে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে।

মধ্যমেয়াদে তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে রপ্তানি বাড়াতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পকে রক্ষা করতে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নিজেদের সমুদ্রসীমায় গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

সর্বোপরি, অর্থনীতির সুশাসন ও আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ডলার সংকট মোকাবিলায় রিজার্ভের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবাসী আয় বাড়াতে হবে, যাতে করে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে আসে। তা না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বৈদেশিক ঋণ সংকট এবং মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতির পরিসংখ্যান মূলত একটি সতর্কবার্তা। এটি বলছে, অর্থনীতির ভিত আরও মজবুত করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার এই সময়ে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্তই পারে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যকে সুরক্ষিত রাখতে এবং কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে।

সার্বিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের অর্থনৈতিক চিত্র উদ্বেগজনক হলেও, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং রপ্তানি খাতের গতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই হবে আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

[atn_photocard]
আরও