×
×
Saturday, 7 November, 2026, 10:27 am


ফলের বাজারে স্বস্তির আভাস, তবু ক্রেতার হাতের নাগালের বাইরে বিদেশি ফল

কারওয়ান বাজারে আপেল-মাল্টার দাম সামান্য কমলেও ঊর্ধ্বমুখী অন্যান্য ফলের বাজার; আমদানি শুল্ক, ডলার সংকট ও সরবরাহ ঘাটতিতে চাপে সাধারণ ক্রেতা

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কমেছে বিভিন্ন ধরনের ফলের দাম। বিশেষ করে আপেল ও মাল্টার দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তবে বেশ কিছু ফলের দাম এখনো তুলনামূলক বেশি। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সব ধরনের ফল এখনো ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসেনি। বাজারে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি কমলা বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়। এছাড়া ফুজি আপেল ৩০০ টাকা, দিলশান আপেল ২৫০ টাকা এবং ছোট সাইজের আপেল ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে মানভেদে প্রতি কেজি মাল্টা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, পেঁপে ৫০ থেকে ৮০ টাকা, আনারস আকারভেদে প্রতিটি ৩০ থেকে ৬০ টাকা এবং সাদা আঙুর ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কালো আঙুর প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা, আনার ৩৫০ টাকা, ড্রাগন ফল ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা, পেয়ারা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং নাশপাতি ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সাম্মাম প্রতি কেজি ১০০ টাকা এবং দেশি মাল্টা ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

 

আরো পড়ুনঃ

অনুমান, সন্দেহ, অবজ্ঞা ও সম্মানহানি: কোরআনের নির্দেশনা কি?

 

কারওয়ান বাজারের ফল ব্যবসায়ী সাইয়েদুল ইসলাম বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় ফলের দাম কিছুটা কমেছে। আপেল ও মাল্টার দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমেছে। বাজারের আরেক ফল ব্যবসায়ী সুলতান আহমদ বলেন, মাল্টা ও আপেলের দাম কিছুটা কমেছে। মাল্টা ২৮০ টাকা বিক্রি করছি। গত সপ্তাহে ৩০০ টাকার উপরে বিক্রি করেছি। আজকে নাশপাতি ৩২০ টাকা বিক্রি করছি। আফ্রিকান আপেলের দাম একটু বেশি বলে তিনি জানান। প্রতি কেজি আফ্রিকান আপেল ৩৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। জুম্মার নামাজ আদায় করে কারওয়ান বাজারে ফল কিনতে আসেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, পাকা পেঁপে আড়াই কেজি কিনেছি ১৫০ টাকা। দাম মূলত ফলের সাইজের উপর নির্ভর করে। ছোট সাইজের পেঁপে ৫০ টাকা কেজিও বিক্রি করছে। দেশি ফলগুলোর দাম সবসময় কম থাকে। আমি সেগুলো বেশি কিনে থাকি। এদিকে ফল কিনতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু ফলের দাম কমলেও সব ধরনের ফল কেনার ক্ষেত্রে এখনো হিসাব করে চলতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশি ফলের দাম তুলনামূলক বেশি থাকায় অনেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প পরিমাণে ফল কিনছেন।

আরো পড়ুনঃ

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে বোর্ডের দ্বিতীয় সভা ৯ নভেম্বর

বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার এই অসম সমীকরণের পেছনে কাজ করছে কয়েকটি বড় কারণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়া, উচ্চ শুল্ক-কর, ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন, পরিবহণ ও বন্দর ব্যয় এবং সরবরাহ ঘাটতিই বিদেশি ফলের দাম বাড়ার বড় কারণ। পাশাপাশি আমদানি ও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগও রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আমদানি করা প্রায় প্রতিটি ফলের ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক-কর ১২০ শতাংশেরও বেশি। একটি ফল ১০০ টাকায় আমদানি করা হলেও শুল্ক-কর যোগ করলে সেই ফলের মূল্য দাঁড়ায় ২২০ টাকা। আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও নাশপাতি আমদানি করতে ১২১.৭৮ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয়, যার মধ্যে কাস্টমস শুল্ক ২৫ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২০ শতাংশ। আনার ক্ষেত্রে এই হার ১২৬.৭৮ শতাংশ। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, গত দেড় বছরে ফলের ওপর নতুন করে কোনো শুল্ক বাড়ানো হয়নি। তিনি বলেন, ‘ডলারের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। দুই বছর আগে যেখানে ডলার ৮০ থেকে ৮৫ টাকা ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১২৬-২৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে যেকোনো পণ্য আমদানিতে খরচ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে’।

শুধু শুল্ক-কর বা ডলারের দাম নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতিও ফলের বাজারকে অস্থির করে তুলছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, কোনো কোনো সপ্তাহে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার ফল আমদানি হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিনই প্রায় ১৫ কনটেইনার প্রয়োজন। উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরসংক্রান্ত জটিলতা এবং আগের লোকসানের কারণে আমদানিকারকেরা আমদানি কমিয়েছেন। এতে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ফল কেনা হলেও দীর্ঘ পরিবহন সময়ে অনেক ফল নষ্ট হয়ে যায়। একটি কনটেইনারে প্রায় ৪০ কার্টন ফল নষ্ট হতে পারে, যার ক্ষতিপূরণও বাকি ফলের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির মাল্টার অস্বাভাবিক দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত এলসি খুলে ফল আমদানি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি অস্বাভাবিক দামের প্রমাণ মিললে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং মাল্টার শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনার আশ্বাস দেন।

সরকারি প্রতিবেদনে ফলের দাম বাজারের চেয়ে অনেক কম দেখানো হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আমদানি ব্যয় নয়, আমদানিকারক থেকে পাইকার ও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ফলের দাম কমাতে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি শুল্ক ও বাজার ব্যবস্থাপনাতেও নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের দাম স্থিতিশীল না হলে এবং আমদানি শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে না নামানো হলে আগামী দিনেও ফলের বাজারে স্বস্তি ফিরবে না। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ফল কেনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। রাজধানীর বাজারে ইতিমধ্যেই মাল্টা ৫২০ টাকা এবং কমলা ৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে, সামান্য দাম কমার স্বস্তি থাকলেও ফল কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের হিসাবের বোঝা এখনো কমেনি।

[atn_photocard]
আরও