×
×
Saturday, 12 September, 2026, 9:40 am


বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের খেলাপি অনুপাত বিশ্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ে

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংকট নতুন এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি বা Non-Performing Loan (NPL) দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। ফলে মোট ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি বা অনাদায়ী শ্রেণিতে রয়েছে।

অর্থাৎ, ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা এমন ঋণে পরিণত হয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবে আদায় হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক সর্বশেষ প্রাপ্য তথ্যের তুলনায় এই অনুপাত বাংলাদেশকে বিশ্বের সর্বোচ্চ NPL অনুপাতের দেশ হিসেবে তুলে ধরছে। বাংলাদেশকে অনুসরণ করছে চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানার মতো দেশ। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিভিন্ন দেশের সর্বশেষ তথ্যের সময়কাল এক নয়। তাই এটিকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং-খাতের NPL অনুপাতের তুলনা হিসেবে দেখা উচিত, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশ’ হিসেবে নয়।

ছয় লাখ কোটি টাকার সীমা আবার অতিক্রম

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে তা বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। জুন শেষে এই পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। একই সময়ে NPL অনুপাত ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশে উঠেছিল। পরে পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন নীতিগত সুবিধার কারণে ডিসেম্বর ২০২৫-এ তা কমে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায় নেমে আসে। কিন্তু ২০২৬ সালে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

অর্থাৎ, সমস্যাটি সাময়িকভাবে কমলেও এর মূল কারণগুলো দূর হয়নি।

কেন এত দ্রুত বাড়ছে খেলাপি ঋণ?

বিশেষজ্ঞ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতি এবং ঋণ আদায়ে দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের Financial Stability Report-এ দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের gross NPL ratio ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং মোট gross NPL ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ঋণ প্রদানে দুর্বলতা, পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতি এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের ধীরগতি সম্পদের মানের অবনতিতে ভূমিকা রেখেছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম কঠোর হওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পরিবর্তন করা হয়। এর ফলে আগে যেসব ঋণ প্রকৃত সমস্যাগ্রস্ত হলেও হিসাবের খাতায় পুরোপুরি খেলাপি হিসেবে দেখা যাচ্ছিল না, সেগুলোর একটি অংশ নতুন নিয়মে শ্রেণিকৃত হয়েছে।

ফলে বর্তমান পরিসংখ্যানের একটি অংশকে নতুন করে প্রকাশিত পুরোনো সমস্যার হিসাব হিসেবেও দেখতে হবে।

কয়েক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পরিস্থিতির পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট চিত্র দেয়।

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধার কারণে NPL অনুপাত অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমেছিল। এরপর ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে ব্যাংক খাতে NPL ratio ছিল প্রায় ৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের শেষে তা বেড়ে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে অনুপাত আরও বেড়ে ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়।

পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ NPL ratio ৩৬ শতাংশের ওপরে চলে যায়।

এই ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, এটি একদিনে সৃষ্টি হওয়া সংকট নয়; বরং দীর্ঘ সময়ের সঞ্চিত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ঝুঁকি বেশি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সব ব্যাংকের পরিস্থিতি একই নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর gross NPL ratio ছিল ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা ছিল ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে মাত্র ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অর্থাৎ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রায় অর্ধেক ঋণই সমস্যাগ্রস্ত এমন পরিস্থিতি ব্যাংকের মূলধন, মুনাফা এবং আমানতকারীদের আস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশের নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণও প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বলে সংসদে জানানো হয়েছে।

খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়

খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেলে এর প্রভাব ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাংকগুলোকে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে বেশি অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমতে পারে।

অন্যদিকে, ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হলে আমানতকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাংক যদি সমস্যাগ্রস্ত ঋণ থেকে অর্থ ফেরত না পায়, তাহলে ভালো ঋণগ্রহীতারাও ভবিষ্যতে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্তের মুখে পড়তে পারেন।

এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও দেখা যায়, ২০২৫ সালে পুরো ব্যাংকিং খাতের net NPL ratio-ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সম্পদের মানের অবনতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

পুনঃতফসিল কি সমস্যার সমাধান করছে?

খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব সুবিধার পরও সামগ্রিক খেলাপি ঋণ আবার বাড়তে থাকায় প্রশ্ন উঠছে ঋণ পুনঃতফসিল করা হচ্ছে, নাকি প্রকৃত সমস্যা শুধু পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে?

২০২৫ সালে বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল হলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ পরবর্তী সময়ে আবার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও স্বীকার করেছে যে বিভিন্ন সহায়তা ও পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সমাধান হলো নতুন করে ঋণ দেওয়ার আগে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ, দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায় এবং ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো শক্তিশালী করা।

তবে ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ ঋণগ্রস্ত দেশ’ বলা যাবে না
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সরকারি ঋণগ্রস্ত দেশ এমন তথ্য এই প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে না।

এখানে ‘বিশ্বে সর্বোচ্চ’ বলতে বোঝানো হচ্ছে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের মধ্যে Non-Performing Loan-এর অনুপাত।

এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা।
একটি দেশের সরকারি ঋণ, বৈদেশিক ঋণ, GDP-এর তুলনায় ঋণ এবং ব্যাংকের খেলাপি ঋণ চারটি ভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঋণ আদায়

৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ এখন বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার একটি বড় সংকেত।

সমস্যার সমাধানে বিশেষজ্ঞদের মতে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন

প্রথমত, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও হিসাব প্রকাশ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও ব্যবসায়িক কারণে সাময়িকভাবে সমস্যায় পড়া ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করে দেখতে হবে।

তৃতীয়ত, বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ অনুমোদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

চতুর্থত, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, ঋণ আদায়ের জন্য আদালত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত ও দ্রুততর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় যোগ্যতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকার NPL এবং ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ NPL ratio নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সর্বশেষ প্রাপ্য তথ্যের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশের এই অনুপাত বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক তুলনায় বিভিন্ন দেশের তথ্যের সময়কাল ভিন্ন হওয়ায় এটিকে সেই সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেই উপস্থাপন করা উচিত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিপুল খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে ঋণ পুনঃতফসিল, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং আদায় ব্যর্থতার সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে এখন শুধু নতুন নীতি ঘোষণা যথেষ্ট নয় প্রকৃত খেলাপি ঋণ শনাক্তকরণ, দায়ীদের জবাবদিহি, দ্রুত ঋণ আদায় এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Stability Report 2025, Bangladesh Bank Annual Report 2024–25 এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের NPL তথ্য; আন্তর্জাতিক তুলনার ক্ষেত্রে সর্বশেষ প্রাপ্য দেশভিত্তিক তথ্য।

আরও