×
×
Sunday, 13 September, 2026, 10:52 am


নতুন পে-স্কেলে কোন গ্রেডে কত বেতন

১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন বেতন কাঠামো; সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

দীর্ঘ এক যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬, অর্থাৎ নবম জাতীয় পে স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। ৩১ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর জানানো হয়েছে, এটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে।

নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। তবে গ্রেডভেদে মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা, যা আগের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অন্যদিকে ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, যেখানে ২০১৫ সালের স্কেলে তা ছিল ৭৮ হাজার টাকা।

১২ বছর পর নতুন পে স্কেল

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় নতুন বেতন কাঠামো না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনকে সামনে রেখে নতুন পে স্কেলের দাবি জোরালো হয়।

২০২৫ সালে গঠিত নবম জাতীয় বেতন কমিশন এ বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করে। কমিশনের প্রতিবেদন ও সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর সচিব পর্যায়ের কমিটি সুপারিশ দেয়। শেষ পর্যন্ত সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভা নতুন কাঠামো অনুমোদন করে।

এক নজরে ২০২৬ সালের নতুন বেতন স্কেল

নিচের তালিকায় ২০১৫ সালের স্কেলের সঙ্গে ২০২৬ সালের অনুমোদিত নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতনের তুলনা দেওয়া হলো।

গ্রেড| ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন| ২০২৬ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন| প্রাথমিক বৃদ্ধির হার*
১ম| ৭৮,০০০| ১,৫৬,০০০| ১০০%
২য়| ৬৬,০০০| ১,৩২,০০০| ১০০%
৩য়| ৫৬,৫০০| ১,১৩,০০০| প্রায় ১০০%
৪র্থ| ৫০,০০০| ১,০০,০০০| ১০০%
৫ম| ৪৩,০০০| ৮৬,০০০| ১০০%
৬ষ্ঠ| ৩৫,৫০০| ৭১,০০০| ১০০%
৭ম| ২৯,০০০| ৫৮,০০০| ১০০%
৮ম| ২৩,০০০| ৪৬,০০০| ১০০%
৯ম| ২২,০০০| ৪৪,০০০| ১০০%
১০ম| ১৬,০০০| ৩২,০০০| ১০০%
১১তম| ১২,৫০০| ২৫,০০০| ১০০%
১২তম| ১১,৩০০| ২৪,০০০| প্রায় ১১২%
১৩তম| ১১,০০০| ২৪,০০০| প্রায় ১১৮%
১৪তম| ১০,২০০| ২৩,৫০০| প্রায় ১৩০%
১৫তম| ৯,৭০০| ২২,৮০০| প্রায় ১৩৫%
১৬তম| ৯,৩০০| ২১,৯০০| প্রায় ১৩৫%
১৭তম| ৯,০০০| ২১,৪০০| প্রায় ১৩৮%
১৮তম| ৮,৮০০| ২১,০০০| প্রায় ১৩৯%
১৯তম| ৮,৫০০| ২০,৫০০| প্রায় ১৪১%
২০তম| ৮,২৫০| ২০,০০০| প্রায় ১৪২%

*এখানে শতাংশটি ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন থেকে ২০২৬ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন কতটা বেড়েছে—তার হিসাব। সরকারি অনুমোদনের পর প্রকাশিত কাঠামোর গ্রেডভিত্তিক অঙ্কই এখানে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে। নতুন স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডে বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ, প্রায় ১৪২ শতাংশ; সর্বোচ্চ গ্রেডে বৃদ্ধি ১০০ শতাংশ।

কার বেতন কত হবে?

নতুন পে স্কেলে একজন কর্মচারীর মূল বেতন নির্ভর করবে তাঁর গ্রেড, বেতনধাপ এবং চাকরির পর্যায়ের ওপর। ফলে শুধু গ্রেডের শুরুর বেতন দেখেই কোনো কর্মচারীর চূড়ান্ত মাসিক আয় নির্ধারণ করা যাবে না।

উদাহরণ হিসেবে, ২০তম গ্রেডে নতুন বেতন কাঠামোর শুরু হচ্ছে ২০ হাজার টাকা থেকে এবং ধাপে ধাপে তা ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। ১৯তম গ্রেডে শুরু ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা। একইভাবে ১৮তম গ্রেডে শুরু ২১ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৫০ হাজার ৯০০ টাকা।

অন্যদিকে ১০ম গ্রেডে নতুন কাঠামোর বেতনসীমা ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা, ৯ম গ্রেডে ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ১২০ টাকা, আর ৫ম গ্রেডে ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।

১ম গ্রেডের ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারিত ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

সবচেয়ে বেশি বেতন বাড়ছে নিচের গ্রেডে

নতুন পে স্কেলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ গ্রেডের তুলনায় নিম্ন গ্রেডে শতাংশের হিসাবে বেতন বৃদ্ধি বেশি।

২০১৫ সালের স্কেলে ২০তম গ্রেডের শুরু ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন কাঠামোয় তা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ১৪২ শতাংশ।

১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ টাকা বৃদ্ধি প্রায় ১৪১ শতাংশ।

১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২১ হাজার টাকা বৃদ্ধি প্রায় ১৩৯ শতাংশ।

অন্যদিকে ১ম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হওয়ায় বৃদ্ধি ১০০ শতাংশ।

অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় নিম্ন বেতনধারী কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখা হয়েছে। এর ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতনের ব্যবধানও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। সরকার জানিয়েছে, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত আগের ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।

১ জুলাই ২০২৬ থেকেই কি পুরো বেতন হাতে পাওয়া যাবে?

এখানেই নতুন পে স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির সুযোগ রয়েছে।

সরকার নতুন বেতন কাঠামোকে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। তবে নতুন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরিবর্তে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা জানানো হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী—

– ১ জুলাই ২০২৬: নতুন মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর করার পরিকল্পনা;

– পরবর্তী বছরের শুরুতে: আরও ৩৫ শতাংশ;

– পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে: অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ;

– এরপর সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের সুপারিশ রয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “৩০ শতাংশ”, “৩৫ শতাংশ” ও “অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ” কীভাবে প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন নির্ধারণে প্রয়োগ হবে তার চূড়ান্ত হিসাব অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত আদেশে স্পষ্ট হবে। তাই নতুন গ্রেডের পুরো প্রারম্ভিক মূল বেতনকে ১ জুলাই থেকেই সম্পূর্ণ নগদ বেতন হিসেবে পাওয়ার অর্থ করা ঠিক হবে না।

শুধু মূল বেতন নয়, ভাতাও গুরুত্বপূর্ণ

সরকারি কর্মচারীর মোট মাসিক আয় কেবল মূল বেতন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, উৎসবভাতা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আর্থিক সুবিধা যুক্ত হতে পারে।

নতুন পে স্কেলের ক্ষেত্রে এসব ভাতা কী হারে এবং কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত বিধান অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনায় প্রকাশ করা হবে। ফলে বর্তমানে শুধু নতুন মূল বেতন ধরে কোনো কর্মচারীর চূড়ান্ত হাতে পাওয়া বা মোট মাসিক বেতন নির্দিষ্ট করে বলা নিরাপদ নয়।

পেনশনভোগীদের জন্যও বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ

নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনার মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের বিষয় রয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা একই সঙ্গে বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর জন্য বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় এবং পুরোনো অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের তথ্যসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা থাকায় এটি ধাপে ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জন্য অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোতেও পরিবর্তন

জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও Joint Services Instructions 2026 অনুমোদন করা হয়েছে। এটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

কেন এই পে স্কেল গুরুত্বপূর্ণ?

সরকারের বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামোর পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে,

প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে একই বেতন কাঠামো চালু থাকায় মূল্যস্ফীতির প্রভাব।

দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন।

তৃতীয়ত, নিম্ন বেতনধারী কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

চতুর্থত, দক্ষ ও যোগ্য জনবলকে সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট করা এবং কর্মীদের কর্মোদ্দীপনা বৃদ্ধি করা।

পঞ্চমত, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে একটি অধিক ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামো তৈরি করা।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

তবে বাস্তব বেতন জানতে আরও একটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ

নবম জাতীয় পে স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলেও কর্মচারীদের জন্য কোন তারিখে কত টাকা বেতন, কোন বেতনধাপে কীভাবে ফিক্সেশন হবে, ইনক্রিমেন্ট কীভাবে সমন্বয় হবে, ভাতা কত হবে এবং বকেয়া কীভাবে পরিশোধ করা হবে এসব বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নির্দেশনা অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও আদেশে নির্ধারিত হবে।

অর্থাৎ বর্তমানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য হলো

নতুন জাতীয় পেস্কেল–২০২৬ অনুমোদিত হয়েছে, ২০টি গ্রেড বহাল রয়েছে, ২০তম গ্রেডে শুরু ২০ হাজার টাকা, ১ম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং কাঠামোটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।

সারসংক্ষেপ

নবম জাতীয় পে স্কেল বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গত এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে বড় বেতন কাঠামোগত পরিবর্তন। নতুন স্কেলে মূল বেতন বৃদ্ধির হার গ্রেডভেদে প্রায় ১০০ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। উচ্চ গ্রেডে দ্বিগুণের মতো এবং নিম্ন গ্রেডে তার চেয়েও বেশি হারে প্রারম্ভিক মূল বেতন বাড়ানো হয়েছে।

তবে নতুন পে স্কেলের ‘মূল বেতন’ আর ‘মোট হাতে পাওয়া বেতন’ এক বিষয় নয়। ভাতা, বেতন ফিক্সেশন, ধাপ, ইনক্রিমেন্ট ও বাস্তবায়নের ধাপ অনুযায়ী একজন কর্মচারীর প্রকৃত মাসিক আয় নির্ধারিত হবে।

সুতরাং নতুন পে স্কেল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি তারিখ ও তথ্য হলো—অনুমোদন: ৩১ আগস্ট ২০২৬; কার্যকর তারিখ: ১ জুলাই ২০২৬; সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ প্রারম্ভিক মূল বেতন: যথাক্রমে ২০,০০০ ও ১,৫৬,০০০ টাকা।

আরও