ঈমানের সুরক্ষা: আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি আনুগত্য ও মানুষের কথার সীমা
ঈমান কেবল মুখে কিছু বিশ্বাসের ঘোষণা নয়; বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর নাযিলকৃত ওহির প্রতি বিশ্বাস, গ্রহণ এবং আনুগত্যও ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ মানুষকে তাঁর পক্ষ থেকে পথনির্দেশ দিয়েছেন এবং সেই পথনির্দেশের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাকে ঈমানের মৌলিক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
কুরআন আমাদের সতর্ক করে দেয় আল্লাহ ও তাঁর নাযিলকৃত বিধানের পরিবর্তে মানুষের মনগড়া বক্তব্য, মতবাদ ও বিধানকে এমন মর্যাদা দেওয়া যাবে না, যা কেবল আল্লাহর ওহির প্রাপ্য।
তাই একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কোন কথাকে সে সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করছে? আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবকে, নাকি মানুষের রচিত কোনো গ্রন্থ, মতবাদ, ব্যাখ্যা বা ব্যক্তিকে?
ঈমানের একটি মৌলিক শর্ত: আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি বিশ্বাস
আল্লাহ বলেন,
«“হে মুমিনগণ! তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সেই কিতাবের প্রতি, যা তিনি তাঁর রাসূলের ওপর নাযিল করেছেন, এবং সেই কিতাবসমূহের প্রতিও, যেগুলো তিনি পূর্বে নাযিল করেছেন।”
—সূরা আন-নিসা ৪:১৩৬»
এই আয়াত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখায় যে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান ঈমানেরই অংশ।
অতএব, একজন মুমিনের অবস্থান হওয়া উচিত আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা সত্য বলে গ্রহণ করা এবং তার বিপরীতে মানুষের কোনো বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্যের মানদণ্ডে উন্নীত না করা।
আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি অসন্তুষ্টি একটি ভয়াবহ বিষয়
কুরআনে আল্লাহ এমন মানুষের কথা বলেছেন, যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অপছন্দ করেছে।
আল্লাহ বলেন,
«“এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অপছন্দ করেছে; ফলে তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।”
—সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৯»
এই আয়াত ঈমানদারকে অত্যন্ত গভীরভাবে সতর্ক করে। আল্লাহর নাযিলকৃত সত্য সামনে আসার পর সেটিকে অপছন্দ করা, প্রত্যাখ্যান করা কিংবা মানুষের বক্তব্যকে তার ওপর প্রাধান্য দেওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট মানুষের লেখা বই পড়া বা তার কোনো সত্য কথার সঙ্গে একমত হওয়া নিজেই কুরআনের দৃষ্টিতে ঈমানভঙ্গের প্রমাণ নয়। বরং বিচার করতে হবে সে কথাটি কি আল্লাহর ওহির বিরোধী? তাকে কি আল্লাহর কিতাবের সমকক্ষ করা হচ্ছে? নাকি কেবল এমন একটি সত্য কথা বলা হয়েছে, যা কুরআনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড কে?
আল্লাহ বলেন,
«“এটি আল্লাহর কিতাব; এতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকিদের জন্য এটি পথনির্দেশ।”
—সূরা আল-বাকারা ২:২»
আবার আল্লাহ বলেন,
«“নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথের দিকে পথনির্দেশ করে, যা সর্বাধিক সরল।”
—সূরা আল-ইসরা ১৭:৯»
অতএব, কোনো আলেম, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, লেখক বা মানুষের রচিত গ্রন্থকে সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মাপকাঠি বানানো একজন মুমিনের জন্য নিরাপদ পদ্ধতি নয়।
মানুষ ভুল করতে পারে; কিন্তু আল্লাহর ওহি সত্য।
সুতরাং কোনো বইয়ে সুন্দর কথা আছে বলেই সেই বইয়ের সব বক্তব্য সত্য হয়ে যায় না। আবার কোনো মানুষের লেখা বইয়ে সত্য কথা আছে বলেই সেই সত্য কথাটি প্রত্যাখ্যান করাও জরুরি নয়। মাপকাঠি হবে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব।
মানুষের কথাকে আল্লাহর কথার সমকক্ষ করা যাবে না
কুরআন প্রশ্ন করে;
«“তারা কি আল্লাহ ছাড়া এমন কিছু গ্রহণ করেছে, যারা সৃষ্টি করে অথচ নিজেরাই সৃষ্ট?”
—সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৯১»
আর আল্লাহ বলেন,
«“তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিত ও সংসারবিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে…”
—সূরা আত-তাওবা ৯:৩১»
এখানে মূল শিক্ষা হলো মানুষকে এমন কর্তৃত্ব দেওয়া যাবে না, যাতে সে আল্লাহর বৈধ ও অবৈধ নির্ধারণের ক্ষমতার অংশীদার হয়ে যায়।
অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা গ্রন্থকে এমন অবস্থানে রাখা যাবে না যে, আল্লাহর কিতাব এক কথা বললেও সেই ব্যক্তি বা বইয়ের কথা চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করতে হবে।
“ভালো কথা” গ্রহণ করার বিষয়টি কীভাবে বুঝতে হবে?
মানুষের লেখা বইয়ে ভালো কথা থাকতে পারে। কোনো দার্শনিক নৈতিকতার কথা বলতে পারেন, কোনো ইতিহাসবিদ সত্য ঘটনা তুলে ধরতে পারেন, কোনো চিন্তাবিদ সুন্দর মানবিক মূল্যবোধের কথা বলতে পারেন। এসব কথা সত্য হলে তা সত্য হওয়ার কারণে সত্য কেবল কোনো মানুষের বইয়ে লেখা হয়েছে বলে নয়।
কুরআন মানুষকে কথা শুনে উত্তমটি অনুসরণ করতে উৎসাহিত করেছে,
«“অতএব যারা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং তার মধ্যে উত্তমটি অনুসরণ করে, তারাই তারা, যাদের আল্লাহ হেদায়াত দিয়েছেন এবং তারাই বোধসম্পন্ন।”
—সূরা আয-যুমার ৩৯:১৮»
এই আয়াতের আলোকে বলা যায়, একজন মুমিনের কাজ হলো অন্ধভাবে কোনো ব্যক্তির অনুসরণ করা নয়; বরং কথা শুনে বিচার-বিবেচনা করা এবং উত্তমটি অনুসরণ করা।
তবে “উত্তম” নির্ধারণের সর্বোচ্চ মানদণ্ড আল্লাহর ওহির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।
কুরআনের বাইরে কোনো বক্তব্যকে “ওহি” বানানোর বিপদ
আল্লাহ বলেন,
«“এগুলো আল্লাহর আয়াত; আমি তোমার কাছে সত্যসহ তা পাঠ করছি। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন কথায় বিশ্বাস করবে?”
—সূরা আল-জাসিয়াহ ৪৫:৬»
এই আয়াত একজন মুমিনকে গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায়। আল্লাহর আয়াতের সামনে মানুষের বক্তব্যের অবস্থান কী?
মানুষের বক্তব্যকে শোনা, পড়া ও বিচার করা এক বিষয়; আর সেই বক্তব্যকে আল্লাহর নাযিলকৃত বাণীর সমতুল্য বা চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
এই পার্থক্যটি ভুলে গেলে ঈমান ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে গুরুতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
পূর্বপুরুষ, প্রচলিত মত ও মানুষের অনুসরণের ব্যাপারে সতর্কতা
আল্লাহ বলেন—
«“আর যখন তাদের বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ করো’, তারা বলে, ‘বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যে পথে পেয়েছি তা অনুসরণ করব।’ তারা কি তাদের পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করবে, যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই বুঝত না এবং সঠিক পথেও ছিল না?”
—সূরা আল-বাকারা ২:১৭০»
এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মতবাদ, সংস্কৃতি, প্রথা বা পূর্বপুরুষের অনুসরণ সত্যের প্রমাণ নয়।
একইভাবে কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠিত মত, কোনো জনপ্রিয় গ্রন্থ বা কোনো বহুল প্রচলিত বক্তব্যও নিজে নিজে সত্যের প্রমাণ নয়।
সত্যের মূল্য নির্ধারিত হবে তার সত্যতার দ্বারা, তার প্রচারকের খ্যাতির দ্বারা নয়।
ঈমান রক্ষার জন্য আত্মসমালোচনা অপরিহার্য
আল্লাহ বলেন—
«“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে যে, সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে।”
—সূরা আল-হাশর ৫৯:১৮»
এই আয়াত আমাদের ব্যক্তিগত আত্মপর্যালোচনার দিকে আহ্বান জানায়।
তাই আমাদের প্রত্যেকের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত;
– আমি কি আল্লাহর কিতাবকে সত্যের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করি?
– কোনো ব্যক্তির বক্তব্য কি কখনো আল্লাহর বক্তব্যের ওপর স্থান পেয়ে যাচ্ছে?
– কোনো প্রচলিত মতের কারণে কি আমি কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্যকে উপেক্ষা করছি?
– কোনো বইয়ে সুন্দর কথা আছে বলে কি তার সব বক্তব্যকে সত্য ধরে নিচ্ছি?
– আবার কোনো বক্তব্য মানুষের বইয়ে আছে বলে কি কুরআনের সঙ্গে মিল থাকলেও তা অকারণে প্রত্যাখ্যান করছি?
– আমি কি নিজের পছন্দের মতকে কুরআনের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি?
এই আত্মজিজ্ঞাসা ঈমানের সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআনকে ছেড়ে মানুষের কথাকে চূড়ান্ত মানদণ্ড বানানোর পরিণতি
আল্লাহ বলেন,
«“তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা রয়েছে?”
—সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৪»
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; চিন্তা, উপলব্ধি ও অনুসরণের জন্যও নাযিল হয়েছে।
তাই কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়া উচিত এমন আমরা কোনো বক্তব্য শুনব, পড়ব, বিশ্লেষণ করব; তারপর আল্লাহর কিতাবের আলোকে তার সত্যতা যাচাই করব।
কোনো মানুষকে সত্যের উৎস না বানিয়ে সত্যকে অনুসরণ করতে হবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। কোনো ব্যক্তি কুরআনবিরোধী কোনো কথা বললেই তাকে কাফির ঘোষণা করা, কিংবা কোনো বইয়ের কিছু ভুল থাকার কারণে তার পাঠককে ঈমানভঙ্গকারী বলে দেওয়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুতর।
কুরআন আমাদের অন্যায়ভাবে কাউকে অপবাদ বা অবিচার করতে নিষেধ করে এবং যাচাই-বাছাইয়ের শিক্ষা দেয়।
«“হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও…”
—সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৬»
সুতরাং ঈমানের সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি অন্যের ঈমান সম্পর্কে বিচার করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি।
আল্লাহর কিতাবের কোনো বক্তব্যকে অস্বীকার করা এবং কোনো মানুষের বই থেকে উপকারী কোনো কথা পড়া এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়।
ঈমানের নিরাপদ পথ
ঈমানের নিরাপত্তার জন্য মুমিনের অবস্থান হওয়া উচিত সুস্পষ্ট:
আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবই হেদায়াতের মূল ও চূড়ান্ত মানদণ্ড।
মানুষের লেখা বই পড়া যেতে পারে, মানুষের বক্তব্য শোনা যেতে পারে, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে; কিন্তু কোনো মানুষের বক্তব্যকে এমন মর্যাদা দেওয়া যাবে না, যাতে তা আল্লাহর ওহির সমকক্ষ হয়ে যায় অথবা আল্লাহর নাযিলকৃত সত্যের ওপর প্রাধান্য পায়।
আল্লাহ বলেন,
«“আর এটাই আমার সরল পথ; অতএব তোমরা তা অনুসরণ করো এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করো না; তাহলে সেগুলো তোমাদের তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।”
—সূরা আল-আন‘আম ৬:১৫৩»
সুতরাং ঈমানকে সুরক্ষিত রাখার অন্যতম প্রধান উপায় হলো আল্লাহর কিতাবকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা, চিন্তা করা, যাচাই করা এবং তার সত্যের সামনে নিজের পছন্দ, মতবাদ ও পূর্বধারণাকে সমর্পণ করা।
কারণ মুমিনের প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু “কে বলেছেন?” নয়; বরং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
“আল্লাহ কী বলেছেন?”
আর যখন আল্লাহর বক্তব্য স্পষ্টভাবে জানা হয়ে যায়, তখন একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব হলো সত্যকে গ্রহণ করা এবং তার সামনে আত্মসমর্পণ করা।
«“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।”
—সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১১»
অতএব, ঈমান রক্ষার পথ হলো অন্ধ ব্যক্তিপূজা নয়; অন্ধ গ্রন্থপূজাও নয়; বরং আল্লাহর নাযিলকৃত সত্যকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে জ্ঞান, বক্তব্য ও মতামতকে সেই সত্যের আলোকে যাচাই করা।