মেসির পায়ের জাদুতে জেগে ওঠে বিশ্ববাসীর স্বপ্ন: এক ফুটবলারের জয়ে কোটি মানুষের জীবনের গল্প
পিছিয়ে থেকেও জয়ের মহাকাব্য, ইতিহাসের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ছাপিয়ে লিওনেল মেসি হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষের আশা, সংগ্রাম ও স্বপ্নের প্রতীক।
ফুটবল কখনো শুধু একটি খেলা নয়। অনেক সময় এটি একটি জাতির ইতিহাস, আবেগ, আত্মপরিচয় এবং স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে যখন দাঁড়িয়ে থাকেন লিওনেল মেসির মতো একজন কিংবদন্তি, তখন একটি ম্যাচের ফলাফলও কোটি মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দেয়।
সেমিফাইনালের সেই নাটকীয় লড়াইয়ে ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচ যত এগোচ্ছিল, ততই বাড়ছিল সমর্থকদের উৎকণ্ঠা। কিন্তু মাঠের ভেতরে একজন মানুষ যেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস হারাননি। ৩৯ বছর বয়সেও মেসির পায়ের ছন্দ, দৃষ্টিশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার ভেঙে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর অসাধারণ দুটি অ্যাসিস্টে ঘুরে যায় ম্যাচের ভাগ্য, আর আর্জেন্টিনা নিশ্চিত করে বিশ্বকাপের আরেকটি ফাইনাল।
‘এল পিবে’ যে পরিচয় আজও অমলিন
আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে একটি শব্দ বহু বছর ধরে বিশেষ মর্যাদা বহন করে ‘এল পিবে’, যার অর্থ ‘সেই ছেলেটি’ বা ‘দ্য কিড’। ১৯২৮ সালে বিখ্যাত ক্রীড়া সাময়িকী এল গ্রাফিকো-এর সম্পাদক রিকার্দো লোরেঞ্জো ‘বোরোকোতো’ এই ধারণার জন্ম দেন। তাঁর মতে, আর্জেন্টিনার ফুটবলকে ইউরোপীয় শৃঙ্খলার অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব কৌশল, সৃজনশীলতা ও সাহসিকতার পরিচয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
অনেক বছর ধরে ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে এই দর্শনের সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেসিও নিজেকে সেই ধারার অন্যতম উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিশ্বকাপ জয়, ধারাবাহিক সাফল্য এবং জাতীয় দলের প্রতি তাঁর নিবেদন তাঁকে আজ ‘এল পিবে’র নতুন রূপে পরিণত করেছে।
জয়ের পর আবেগে ভেঙে পড়া এক কিংবদন্তি
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন মেসি। চোখেমুখে তখন উচ্ছ্বাস, স্বস্তি আর অশ্রুর মিশ্র অনুভূতি। কয়েক মুহূর্ত আগেও যিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দিচ্ছিলেন, তিনিই পরক্ষণে হয়ে ওঠেন কোটি আর্জেন্টাইনের আবেগের প্রতিচ্ছবি।
এই দৃশ্য কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ জয়ের প্রতিক্রিয়া নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের চাপ, প্রত্যাশা ও সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ।
‘আমরা মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি’
ম্যাচ শেষে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন,
“দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমাদের দেশে অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনের নানা কষ্টের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেন। যদি আমাদের এই সাফল্য তাঁদের মুখে কিছুটা হলেও হাসি ফোটাতে পারে, সেটাই আমাদের গর্ব।”
এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে একজন অধিনায়কের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর কাছে জয় শুধু ট্রফি জেতা নয়; বরং কঠিন বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের মুখে সামান্য আনন্দ পৌঁছে দেওয়াও বড় দায়িত্ব।
একসময় যাঁর দেশপ্রেম নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল
একটা সময় ছিল, যখন জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থতার কারণে মেসির দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেক সমর্থক। কেউ বলেছিলেন, তিনি জাতীয় সংগীত গাইতে চান না, কেউ বলেছিলেন তাঁর মধ্যে আর্জেন্টাইন আবেগের ঘাটতি রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সেই সব অভিযোগ ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। আজ মেসিই সেই মানুষ, যিনি আর্জেন্টিনার আবেগ, ইতিহাস এবং সমর্থকদের মানসিকতা সবচেয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
ইতিহাসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জয়ের বাড়তি গুরুত্ব
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’, বিশ্বকাপের বহু স্মরণীয় দ্বৈরথ সব মিলিয়ে এই ম্যাচ দুই দেশের সমর্থকদের কাছে বিশেষ আবেগ বহন করে।
মেসিও জানতেন, এই ম্যাচ আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে আর দশটি ম্যাচের মতো নয়। তাঁর ভাষায়,
“সমর্থকেরা অন্য যেকোনো ম্যাচের চেয়ে এই ম্যাচটি বেশি জিততে চেয়েছিল। কারণ এর আবেগ ও গুরুত্ব আলাদা।”
মাঠে জুড বেলিংহামের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন কিংবা লড়াকু মনোভাবও সেই আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল।
বিশ্বাস হারাননি কখনো
ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পরও আর্জেন্টিনা নিজেদের খেলার ধরন বদলায়নি। বরং ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষা করেছে।
মেসি বলেন,
“আমরা কখনো বিশ্বাস হারাইনি। স্কোরে পিছিয়ে থাকলেও জানতাম আমরা ফিরে আসতে পারব। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই আমার বিশ্বাস ছিল, এই দল ফাইনালে খেলবে।” এই আত্মবিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত দলকে জয়ের পথে নিয়ে যায়।
ফুটবলের বাইরে মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয়:
মেসির অর্জনের তালিকায় রয়েছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অরসহ প্রায় সব বড় শিরোপা। তবুও তাঁকে আলাদা করে তোলে তাঁর বিনয়, নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আবেগের সংযোগ।
তিনি জানেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক সংকট দূর করার ক্ষমতা একজন ফুটবলারের নেই। কিন্তু কিছু সময়ের জন্য হলেও মানুষকে হাসাতে পারেন তিনি। আর সেই হাসিই হয়তো সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
সতীর্থদের চোখে অনুপ্রেরণার নাম
দলের তরুণ ফুটবলার জুলিয়ানো সিমিওনে বলেন,
লিওনেল মেসির বয়স এখন ৩৯
একজন ফুটবলার যা যা অর্জন করতে পারে, তাঁর সবই রয়েছে। তারপরও তিনি প্রতিদিন একই রকম পরিশ্রম করেন। তাই আমাদের দায়িত্ব তাঁর জন্য এবং দেশের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করা।”
এই মন্তব্যই প্রমাণ করে, মেসি শুধু দলের অধিনায়ক নন, তিনি পুরো দলের অনুপ্রেরণার উৎস।
একদিন হয়তো দৌড় থামবে, কিন্তু থামবে না উত্তরাধিকার
প্রতিটি কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের একসময় সমাপ্তি আসে। একদিন হয়তো মেসিও আর মাঠে নামবেন না। কিন্তু তাঁর ফুটবল, তাঁর নেতৃত্ব, তাঁর সংগ্রাম এবং কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প কখনো হারিয়ে যাবে না।
ইংরেজ গায়িকা জুলি কোভিংটনের বিখ্যাত গান Don’t Cry for Me Argentina-এর সেই বিখ্যাত পংক্তির মতোই বলা যায়
“সত্যি হলো, আমি কখনো তোমাদের ছেড়ে যাইনি।”
সম্ভবত লিওনেল মেসির ক্ষেত্রেও কথাটি একইভাবে প্রযোজ্য। তিনি একদিন ফুটবল ছাড়বেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার মানুষের হৃদয়, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস এবং কোটি সমর্থকের ভালোবাসায় তাঁর উপস্থিতি চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। কারণ, কিছু কিংবদন্তি মাঠ ছাড়লেও মানুষের স্মৃতি থেকে কখনো বিদায় নেন না।