×
×
Sunday, 26 July, 2026, 8:07 am


স্বস্তির বাজেট ২০২৬-২৭: বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত- অর্থমন্ত্রী

সংকটকালে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে ভারসাম্যপূর্ণ বাজেটের আহ্বান; সাধারণ মানুষের স্বস্তি ও ব্যবসার ব্যয় কমানোয় জোর

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে নীতি নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা এখন এক বিন্দুতে এসে মিলেছে এই বাজেট হতে হবে মানুষের জন্য স্বস্তির এবং অর্থনীতির জন্য পুনরুদ্ধারের রূপরেখা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণের আহ্বানের পাশাপাশি করব্যবস্থায় সংস্কার, উচ্চ সুদের হার কমানো এবং ব্যবসায়িক ব্যয় হ্রাসের দাবি উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত “সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা” শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হোক বাজেটের কেন্দ্রবিন্দু

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাজেটকে এমনভাবে সাজানোর আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা হলেও ফিরে আসে।

একই সঙ্গে করের চাপ কমানো এবং কর আদায়ে হয়রানি বন্ধের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, কর কাঠামো সহজ ও স্বচ্ছ না হলে বিনিয়োগে গতি আসবে না।

অর্থমন্ত্রীর অঙ্গীকার: প্রবৃদ্ধির চেয়ে মানুষের কল্যাণ গুরুত্বপূর্ণ

আলোচনায় অর্থমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, “এমন প্রবৃদ্ধির কোনো মূল্য নেই, যা মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না।”

তিনি আরও জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

অলিগার্কি থেকে অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতির পথে

অর্থমন্ত্রী অর্থনীতিকে একটি অংশগ্রহণমূলক কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া জরুরি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

করনীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, করদাতাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। কর আদায়ের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক পদ্ধতির পরিবর্তে আস্থা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারে জোর

বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারকে বিকল্প উৎস হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের বদলে শেয়ারবাজার ও বন্ড মার্কেট থেকে অর্থায়ন করলে ব্যবসার খরচ কমবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, যা সরকারের ওপর চাপ কমাবে।

ব্যবসা সহজীকরণে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি

ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা কমাতে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, একাধিক অনুমতির পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকেই সব অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

বন্দর ও শুল্ক খাতে স্বয়ংক্রিয়তা বাড়ানোর মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এসব খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে পণ্যের দাম প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়।

নীতিগত চ্যালেঞ্জ: বাজেট ঘাটতি ও বৈশ্বিক চাপ

অর্থনীতিবিদদের মতে, আসন্ন বাজেট প্রণয়ন একটি কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা। একদিকে বড় অঙ্কের বাজেট ঘাটতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত এবং জনগণের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তারা সতর্ক করে বলেন, বাজেট ঘাটতি কমাতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কমানো উচিত নয়। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে বাস্তবসম্মত বরাদ্দ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

কর সংস্কার ও বৈষম্য হ্রাসে নতুন প্রস্তাব

করপোরেট কর ছাড় পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর চালুর প্রস্তাবও উঠে আসে আলোচনায়। এতে আয়বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাভজনক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়।

আস্থার সংকট কাটানোই বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট হলো আস্থার অভাব। বিনিয়োগকারী থেকে সাধারণ মানুষ—সবার মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। #বাজেটের মাধ্যমে এই আস্থার সংকট দূর করা জরুরি।

একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে ব্যর্থতা অর্থনীতির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।

দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগের আহ্বান

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাজেটকে শুধুমাত্র আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়গুলো বাজেট আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

ভারসাম্যপূর্ণ বাজেটই হতে পারে সংকট উত্তরণের পথ

সামগ্রিকভাবে, আসন্ন বাজেটকে এমনভাবে প্রণয়ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। #মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং আস্থা পুনর্গঠন—এই চারটি স্তম্ভের ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হবে বাজেটের সফলতা।

একটি বাস্তবমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর বাজেটই বর্তমান #অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

আরও