গ্যাস শিল্পে সংকট: হাজার কোটি টাকা জমা দিয়েও সংযোগহীন ৫৫০ প্রতিষ্ঠান
দেশের শিল্পখাতে গ্যাস সংকট দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। গ্যাস সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দিয়েও দীর্ঘ ৪ থেকে ৫ বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে শুধু এসব প্রতিষ্ঠানই নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, শিল্প ও ক্যাপটিভ সংযোগের জন্য দেশের বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে বর্তমানে প্রায় ১,৮০০টি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের বিপরীতে কয়েক কোটি টাকা করে জমা দিয়েছে। মোট জমাকৃত অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবুও সংযোগ না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না।
গ্যাস সংকটে স্থবির শিল্পায়ন
গ্যাস সংযোগের অভাবে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে পারছে না, ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
রোববার সচিবালয়ে জ্বালানিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, গত কয়েক বছর ধরে নতুন করে শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়া কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মত দেওয়া হয়।
সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে নীতি নির্ধারণ
বৈঠক শেষে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, এখনো শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ভবিষ্যতে সংযোগ দেওয়া হলে যেসব প্রতিষ্ঠান আগে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সরকারি পর্যায়ে স্বীকার করা হয়েছে যে, অতীতে গ্যাস সংযোগ প্রদানে যথাযথ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। ফলে বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সময় নিচ্ছে।
শিল্পমালিকদের ক্ষোভ ও বাস্তবতা
একজন শিল্পমালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, হবিগঞ্জ অঞ্চলে গ্যাসের চাপ থাকা সত্ত্বেও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা শিল্পের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং অস্থিতিশীল।
এ ধরনের পরিস্থিতি শিল্পকে রুগ্ণ করে তুলছে। পাশাপাশি এলপিজি আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
চাহিদা-সরবরাহের বিশাল ঘাটতি
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে বিদ্যুৎ ও সার কারখানাসহ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানই প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শিল্পই কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।
আবেদন জমার চিত্র
দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাসে ১,৩০০টির বেশি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দিয়েছে। এছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানিতেও ৩০০টির বেশি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে।
সম্ভাব্য সমাধান ও চ্যালেঞ্জ
বৈঠকে কয়েকটি সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো
নতুন আবেদন আপাতত স্থগিত রাখা
ডিমান্ড নোট জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া
অদক্ষ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে পুনর্বণ্টন করা
তবে মূল সমস্যা রয়ে গেছে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়া। অতীতে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ছে
সংশ্লিষ্টরা জানান, পূর্ববর্তী সময়ে উৎপাদন বাড়ানো ছাড়াই বিপুলসংখ্যক সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ফলে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণ নিয়ে বসে আছে, কিন্তু গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করতে পারছে না। এতে তারা ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। শিল্পখাতে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।