×
×
Sunday, 26 July, 2026, 12:05 am


“মিম্বরের খতিবদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান”

মুরাদ বিন আমজাদঃ প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, মুসলিম উম্মাহ ফাউন্ডেশন

ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে যখন ন্যায়ের কণ্ঠস্বর মৌন হয়ে যায়, তখন ‘দীন’ পরাজিত হয়ে যায়। আর দীনের মিম্বরে দাঁড়িয়ে যখন অধর্মের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ কুরআনের পক্ষে কথা বলা না যায়, তখন সমাজ থেকে দীন বিদায় নিতে সময় লাগে না।

অর্থাৎ ওয়াদা রক্ষার কথা, ন্যায়বিচারের কথা, অন্যায়ভাবে জুলুম বা সম্পদ ভোগের কথা, সঠিক ওজন প্রতিষ্ঠার কথা না বলে যখন শুধু নামাজ পড়া, দোয়া, দাড়ি, পর্দার কথা বলা হয়—তখন মানুষ নামাজ পড়েই ওয়াদা ভঙ্গ করে, দোয়া পড়েই জুলুম করে, দাড়ি রেখেই প্রতারণা করে। অথচ মানুষের মনমতো না চলে আল্লাহর আয়াত দ্বারা যাবতীয় অন্যায়কে প্রতিহত করাকেই আল্লাহ ‘জিহাদে আকবার’ বা কঠোর সংগ্রাম বলেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
​فَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا
​”সুতরাং তুমি অবিশ্বাসীদের আনুগত্য করিও না এবং তুমি কুরআনের সাহায্যে উহাদের সঙ্গে প্রবল সংগ্রাম চালাইয়া যাও।” (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৫২)

​এই যে আমরা কুরআনের সত্য তুলে না ধরে, মানুষের সামনে কুরআনকে শুধু সুর করে পড়ে মিথ্যাকে ধর্ম বানিয়ে তার ফজিলত বর্ণনা করি, তা কি আল্লাহ জানেন না?

দেখুন, আল্লাহ বলেন:
​بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ ۚ وَلَكُمُ الْوَيْلُ مِمَّا تَصِفُونَ
​”বরং আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর; ফলে উহা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা যাহা বলিতেছ তাহার জন্য।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১৮)

​وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا
​”এবং বল, ‘সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে;’ মিথ্যা তো বিলুপ্ত হইবারই।” (সূরা বনী-ইসরাইল ১৭:৮১)

কাজেই, ধর্মের মিম্বারে দাঁড়িয়ে যদি সত্য দ্বারা মিথ্যাকে আঘাত করা না যায়, যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নেওয়া না যায়—তবে সেই মিম্বারে দাঁড়ানোই অর্থহীন। যারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ধর্মীয় কাজের বিনিময়ে হাদিয়া বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন, তাদের অনেকেই বাস্তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেন না; বরং অনিচ্ছাসত্ত্বেও অন্যায়ের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন।

এর মূল কারণ হলো—অপরের কৃপার ওপর নির্ভরশীলতা। যখন একজন মানুষ তার জীবিকা, সম্মান ও অবস্থান অন্যের অনুকম্পা, দান বা বেতনের ওপর নির্ভর করিয়ে ফেলে, তখন ধীরে ধীরে তার নৈতিক মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। দাতার মাথা থাকে সর্বদা উঁচু, আর গ্রহীতার মাথা থাকে নিচু। যাদের অর্থে, যাদের দানে-দক্ষিণায় কারও সংসার চলে—তাদের দ্বারা সংঘটিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সেই ব্যক্তির পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন কিন্তু সত্য শিক্ষা দেয়— যে ব্যক্তি সত্যের উপর দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান থাকতে চায়, তাকে কোনো অবস্থাতেই অন্যের দানের উপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। দান-দক্ষিণার উপর নির্ভরশীলতা একজন মানুষকে ধীরে ধীরে দাতার নীরব গোলামে পরিণত করে; সে নেতৃত্ব দিতে পারে না, সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে না। ফলে, তারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ক্ষমতাশালীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধেও ন্যায়বিচারের কথা স্পষ্টভাবে বলতে অক্ষম হয়ে পড়ে।

আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:
​يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ۚ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا ۚ وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا

​”হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত থাকিবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও ইহা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হউক অথবা বিত্তহীন হউক আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করিতে প্রবৃত্তির অনুগামী হইও না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কাটাইয়া যাও তবে তোমরা যাহা কর আল্লাহ তো তাহার সম্যক খবর রাখেন।” (সূরা আন-নিসা ৪:১৩৫)

​আল্লাহর এসব মহৎ আদেশ—যেগুলো মানুষের জীবনকে ন্যায়, সত্য ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করার জন্য নাযিল হয়েছে—আজ অনেক ক্ষেত্রেই কেবল সুর করে পাঠ করার একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। কিছু বেতনভুক্ত হুজুর যেন এই দায়িত্ব পালন করেন শুধু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে; আর সেই চাকরি টিকিয়ে রাখাই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান লক্ষ্য।

অন্যদিকে, অনেক মসজিদ কমিটির দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্য সমাজের নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করেন না। সামাজিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের দাপটে তারা সত্যকে অবজ্ঞা করে, অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে। আর যখন এই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ধর্মনেতাদেরকেও অর্থের বিনিময়ে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়, তখন তাদের বেপরোয়া আচরণ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

এই তথাকথিত ‘ধর্মব্যবসা’ টিকে থাকার কারণেই সমাজে অন্যায়ের বিস্তার ঘটার সুযোগ সৃষ্টি হয়। অথচ সত্য হলো—অন্যায়কারী যেমন অপরাধী, তেমনি অন্যায়কে নীরবে সহ্য করাও সমান অপরাধ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ধর্মের নামে এই বিকৃত চর্চা মানুষকে প্রতিবাদের পরিবর্তে নীরবতা শেখায়, সাহসের পরিবর্তে কাপুরুষতার দিকে ঠেলে দেয়। যারা সমাজের অন্যায় দেখেও মৌন থাকে, হাশরের দিন আল্লাহ বলবেন:

​وَامْتَازُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ
​”আর ‘হে অপরাধিগণ! তোমরা আজ পৃথক হইয়া যাও।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৫৯)

​তখন এরা অপরাধীদের কাতারেই একীভূত হয়ে যাবে। অথচ আল্লাহ মুমিনদের জন্য গোনাহ মাফের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রকৃত মুমিন তো তারাই—যারা সমাজে অন্যায় প্রতিরোধে দৃঢ় অবস্থান নেয় এবং আল্লাহর সত্য দীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা (জিহাদ) চালিয়ে যায়। কিন্তু শয়তান ‘লাহুয়াল হাদিস’-এর মাধ্যমে কুরআনের বাণীকে আড়াল করে দিতে চায়, মানুষকে সত্যের পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে চায়।

কেয়ামতে জাহান্নামের রক্ষীদের জিজ্ঞাসায় তারা আফসোস করে বলবেন:
​تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ ۖ كُلَّمَا أُلْقِيَ فِيهَا فَوْجٌ سَأَلَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيرٌ * قَالُوا بَلَىٰ قَدْ جَاءَنَا نَذِيرٌ فَكَذَّبْنَا وَقُلْنَا مَا نَزَّلَ اللَّهُ مِن شَيْءٍ إِنْ أَنتُمْ إِلَّا فِي ضَلَالٍ كَبِيرٍ * وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ * فَاعْتَرَفُوا بِذَنبِهِمْ فَسُحْقًا لِّأَصْحَابِ السَّعِيرِ
​”রোষে জাহান্নাম যেন ফাটিয়া পড়িবে, যখনই উহাতে কোন দলকে নিক্ষেপ করা হইবে, উহাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞাসা করিবে, ‘তোমাদের নিকট কি কোন সতর্ককারী আসে নাই? উহারা বলিবে, ‘অবশ্যই আমাদের নিকট সতর্ককারী আসিয়াছিল, আমরা উহাদেরকে মিথ্যাবাদী গণ্য করিয়াছিলাম এবং বলিয়াছিলাম, ‘আল্লাহ কিছুই অবতীর্ণ করেন নাই, তোমরা তো মহাবিভ্রান্তিতে রহিয়াছ। এবং উহারা আরও বলিবে, ‘যদি আমরা শুনিতাম অথবা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করিতাম, তাহা হইলে আমরা জাহান্নামবাসী হইতাম না। উহারা উহাদের অপরাধ স্বীকার করিবে। ধ্বংস জাহান্নামীদের জন্য।” (সূরা আল-মূলক ৬৭:৮-১১)

​বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ ইসলামকে শুধুমাত্র বাহ্যিক লেবাস বা পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে। অথচ ইসলাম কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের নাম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে অন্তরের পরিশুদ্ধি ও সৎকর্মের বাস্তব প্রয়োগই মুখ্য বিষয়।

আল্লাহ তাআলা মানুষের বাহ্যিক রূপের চেয়ে তার অন্তর ও আমলকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই শুধু পোশাক পরিবর্তন করলেই একজন প্রকৃত মুসলিম হওয়া যায় না; বরং সত্যিকারের মুসলিম হতে হলে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা, ন্যায়পরায়ণতা, সততা এবং মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করা জরুরি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই নিজেদের সঠিক পথে আছে বলে মনে করলেও তারা মূলত বাহ্যিকতা নিয়েই ব্যস্ত থাকে এবং অন্তরের পরিশুদ্ধির দিকে তেমন মনোযোগ দেয় না। এর ফলে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য ও উদ্দেশ্য আড়ালেই থেকে যায়।

অতএব, আমাদের প্রত্যেকের উচিত বাহ্যিকতার পাশাপাশি অন্তরের সংস্কার ও সৎকর্মের মাধ্যমে নিজেদেরকে পরিপূর্ণ মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা। আর যদি এমনটা করা না হয় তাহলে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

​قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُم بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا * الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا
​”বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দিব কর্মে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্তদের? উহারাই তাহারা, ‘পার্থিব জীবনে যাহাদের প্রচেষ্টা পণ্ড হয়, যদিও তাহারা মনে করে যে, তাহারা সৎকর্মই করিতেছে।” (সূরা কাহফ ১৮:১০৩-১০৪)

​অন্য একটি আয়াতে অতীতের জাতিগুলো ধ্বংস হওয়ার কারণ সম্পর্কে বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন:

​فَلَوْلَا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِن قَبْلِكُمْ أُولُو بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِي الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّنْ أَنجَيْنَا مِنْهُمْ ۗ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ
​”তোমাদের পূর্বযুগে আমি যাহাদেরকে রক্ষা করিয়াছিলাম তাহাদের মধ্যে অল্প কতক ব্যতীত সজ্জন ছিল না, যাহারা পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাইতে নিষেধ করিত। সীমালংঘনকারীরা যাহাতে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পাইত তাহারই অনুসরণ করিত এবং উহারা ছিল অপরাধী।” (সূরা হুদ ১১:১১৬)

​পবিত্র কুরআন শুধুমাত্র তিলাওয়াতের জন্য নয় বরং এটি আমাদের জীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। তাই আসুন, আমরা কুরআনকে শুধু আরবি ভাষায় পাঠ করার মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে, নিজ মাতৃভাষা বাংলায় এর অর্থ গভীরভাবে অনুধাবন করি এবং সেই অনুযায়ী আমাদের জীবনকে গড়ে তুলি।

মুসলিম উম্মাহর চেতনা ও দায়িত্বকে সামনে রেখে আমরা এই শ্লোগানটি হৃদয়ে ধারণ করি—

“আরবি ভাষায় কুরআন পড়ি। মাতৃভাষায় কুরআন বুঝি। তদনুযায়ী আমল করি। অন্যের কাছে পৌঁছে দেই।”

এই হোক আমাদের জীবনের অঙ্গীকার—জ্ঞান অর্জন, আমল করা এবং সত্যকে মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন সঠিকভাবে বুঝার এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন।

হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দোয়া কবুল করুন।

আরও