ঈমানের আলোয় পরিবার ও জীবন গঠন:
মানুষের জীবন একটি পবিত্র আমানত। এই জীবনকে কীভাবে গড়ে তুললে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জিত হবে, তার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দিয়েছে পবিত্র কোরআন। এটি শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান । কোরআন কারীমকে অন্তরের গভীরে ধারণ করার মাধ্যমেই আমরা আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ঈমানের আলোয় আলোকিত করতে পারি। কেননা কোরআনকে আল্লাহ তাআলা নিজেই ‘রুহ’ বা আত্মা হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা মৃত হৃদয়কে জীবনদান করে ।
পরিবার: শান্তির নীড় ও ঈমানের ভিত্তি
পরিবার মানবসমাজের মৌলিক ভিত্তি। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে কেন্দ্র করে পৃথিবীর প্রথম পরিবারের সূচনা হয় । পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “আর তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আর-রুম, আয়াত: ২১) । এই আয়াত থেকে আমরা তিনটি মৌলিক বিষয় শিখতে পারি:
১. শান্তি লাভের মাধ্যম: পরিবারের মূল লক্ষ্য হল দাম্পত্য সম্পর্কের মাধ্যমে মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি অর্জন করা।
২. মাওয়াদ্দাহ ও রহমত: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও মমত্ববোধ আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন। এটি অর্জিত হয় ঈমানের আলোকে পরস্পরের অধিকার ও কর্তব্যবোধ থেকে।
৩. ঈমানের প্রতিফলন: পরিবারে বিদ্যমান এই স্নেহ-প্রেমই প্রকৃত ঈমানের বহিঃপ্রকাশ।
আদর্শ পরিবার গঠনে করণীয়
পবিত্র কোরআন আদর্শ পরিবার গঠনের জন্য কয়েকটি মৌলিক নির্দেশনা দিয়েছে, যা ঈমানদারদের জন্য পাথেয়।
১. পারস্পরিক সম্পর্কের দিশা
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে কোরআন অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছে। আল্লাহ বলেন, “তারা তোমাদের পরিচ্ছদ (পোশাক) এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭) । যেমন পোশাক মানুষকে আবৃত রাখে, রক্ষা করে এবং সৌন্দর্য দান করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের দোষ-ত্রুটি আড়ালকারী, পরস্পরের রক্ষাকবচ এবং জীবনের শোভাবর্ধনকারী।
২. যোগ্যতা ও চরিত্রের গুরুত্ব
পরিবারের অগ্রভাগে থাকা স্বামী-স্ত্রীর ঈমান ও চরিত্র সুদৃঢ় হওয়া জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও কোরআনের শিক্ষা হলো, সচ্চরিত্র ও ধার্মিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা । কারণ তারাই হবে সন্তানদের প্রথম পাঠশালা।
৩. দোয়া ও প্রার্থনা
একটি আদর্শ পরিবার গঠনের জন্য কোরআনে সুন্দর দোয়া শেখানো হয়েছে। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা প্রার্থনা করেন, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শস্বরূপ করুন।” (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪) । এই দোয়ায় পরিবারের প্রতিটি সদস্য যেন পাপের অন্ধকার থেকে মুক্ত থেকে পুণ্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয় এবং অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে—এ প্রার্থনাই নিহিত।
সুন্দর আদর্শে জীবন গঠন
শুধু পরিবার নয়, কোরআনের নির্দেশনা মানবজীবনের সর্বস্তরে প্রযোজ্য। জীবনকে কোরআনের আলোয় গড়তে হলে আমাদের কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা জরুরি :
ক. কোরআনকে আত্মার খোরাক বানানো: আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কোরআন তিলাওয়াতকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। শুধু তিলাওয়াতই নয়, এর অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করে পাঠ করতে হবে, যেন তা আমাদের অন্তরে প্রভাব ফেলে। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোরআনের হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবন সংকীর্ণ হয়ে যায়।”
খ. আমল ও বাস্তবতা: কোরআনকে শুধু পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক, ন্যায়বিচার—সব ক্ষেত্রেই কোরআনের আইন মেনে চলতে হবে ।
গ. সন্তানদের কোরআনী শিক্ষা দান: নিজেদের ও নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর সর্বোত্তম পন্থা হলো কোরআনের জ্ঞান দান করা। আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।” (সূরা আত-তাহরিম, আয়াত: ৬) । এর অর্থ হলো তাদেরকে কোরআনের আদেশ-নিষেধ শিক্ষা দেওয়া।
পবিত্র কোরআন মানবজাতির জন্য এক অতুলনীয় নেয়ামত। এটি এমন একটি আলো, যা আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের অন্ধকার দূর করে শান্তির পথ দেখায় । ঈমানের আলোয় জীবন গঠনের অর্থই হলো কোরআনকে হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দিয়ে তার নির্দেশ মোতাবেক চলা। যখন আমরা কোরআনকে আমাদের জীবনযাপনের একমাত্র পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করব, তখনই আমাদের পরিবার হবে প্রশান্তির নীড়, সমাজ হবে শান্তির আবাস এবং জীবন হবে সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরআনের আলোয় নিজেদের জীবন ও পরিবার গঠনের তাওফিক দান করুন। আমিন।