কিশোরগঞ্জ পাগলা মসজিদের দানসিন্দুকে ২৪ কেজি সোনা রুপা ও ১৭ দেশের মুদ্রা,ভেতরের আসল গল্প কি..?
ইতিহাস, বিশ্বাস আর মানতের টানে দেশের সবচেয়ে আলোচিত দানবাক্সের ভেতরের গল্প
বিশ্বাসের সিন্দুকে জমা কোটি মানুষের প্রার্থনা
কিশোরগঞ্জ শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ আবারও দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই মসজিদের দানবাক্স বা দানসিন্দুককে বলা হয় মানুষের বিশ্বাসের ব্যাংক। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ তাদের মনের বাসনা পূরণের আশায় টাকা, সোনা, রুপা দান করে যান। সম্প্রতি সেই দানসিন্দুকের ছয় বছরের জমা সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেছে জেলা প্রশাসন, যা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে।
প্রায় ছয় বছর পর জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে দানবাক্সে রক্ষিত সোনা, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রার ওজন নির্ধারণ ও গণনা সম্পন্ন হয়েছে। এতে মিলেছে প্রায় ২৪ দশমিক ৮৭ কেজি সোনা রুপার অলংকার এবং ১৭টি দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এই ঘটনা শুধু একটি হিসাব নয়, এটি বাংলাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতি, মানুষের বিশ্বাস এবং দানের মহিমার এক জীবন্ত দলিল।
ছয় বছরে কী পরিমাণ সম্পদ জমা পড়ল
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় বছরে পাগলা মসজিদের দানবাক্সে জমা পড়েছে মোট ১ হাজার ৪৪ ভরি স্বর্ণালংকার। যার ওজন প্রায় ১২ কেজি ১৭৪ গ্রাম। একই সময়ে জমা পড়েছে ১ হাজার ৮৮ ভরি রুপার অলংকার, যার ওজন প্রায় ১২ কেজি ৬৯০ গ্রাম। সব মিলিয়ে সোনা ও রুপার মোট ওজন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ দশমিক ৮৭ কেজি।
এই বিপুল পরিমাণ অলংকারের মধ্যে রয়েছে নাকফুল, কানের দুল, চেইন, চুড়ি, আংটি, টিকলি, নথ, চাঁদ তারা আকৃতির গহনাসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী অলংকার। অনেকেই তাদের মানত পূরণ হওয়ায় নিজের ব্যবহার করা অলংকার খুলে দান করে গেছেন। আবার অনেকে নতুন অলংকার কিনে এনে দান করেছেন।
এর আগে ২০২০ সালের ১১ মার্চ তিন বছরের জমা হওয়া ৪১৫ ভরি সোনা ও ১৮৪ ভরি রুপা নিলামে বিক্রি করে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি পাওয়া গিয়েছিল। এবারের পরিমাণ তার প্রায় আড়াই গুণ বেশি হওয়ায় এর বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১৭ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বিস্ময়কর সংগ্রহ
এবারের গণনায় সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল বৈদেশিক মুদ্রার উপস্থিতি। দানবাক্স থেকে ১৭টি দেশের কাগজের নোট এবং আরও বিভিন্ন দেশের ২ হাজার ৬৬৭টি ধাতব মুদ্রা পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী পাওয়া গেছে ৮ হাজার ৫৭ মার্কিন ডলার, ৫৭ হাজার ৪১৪ সৌদি রিয়াল, ৩৭ হাজার ৮৭৭ ভারতীয় রুপি, ২৯ হাজার ৬৬২ মালয়েশীয় রিঙ্গিত, ১৪ হাজার ২৪০ আমিরাতের দিরহাম, ৭৬৭ কুয়েতি দিনার, ৮৮৮ ওমানি রিয়াল, ৭ হাজার ৯৭৩ কাতারি রিয়াল, ৩৩৩ বাহরাইনি দিনার, ১ হাজার ৭১৮ সিঙ্গাপুর ডলার, ১ হাজার ২২০ ব্রিটিশ পাউন্ড, ৫ হাজার ২৪৫ ইউরো, ৫৫৫ অস্ট্রেলীয় ডলার, ২৫ কানাডীয় ডলার, ৯০০ মালদ্বীপের রুফিয়া এবং ৩০৫ চীনা ইউয়ান।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এই বৈদেশিক মুদ্রাগুলো মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের দান করা। অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে তাদের আয়ের একটি অংশ এই মসজিদে দান করেন। আবার অনেকে বিদেশ থেকেই আত্মীয়দের মাধ্যমে মুদ্রা পাঠিয়ে দেন। এই মুদ্রাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ বিনিময় হার অনুযায়ী নগদায়ন করা হবে।
যেভাবে সম্পন্ন হলো ঐতিহাসিক গণনা
গত ১২ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এই গণনা কার্যক্রম চলে। জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে সিলগালা অবস্থায় সংরক্ষিত ৯টি মাঝারি আকারের প্লাস্টিক কনটেইনার এবং ৬টি সিলগালা খাম খুলে এই সম্পদ বের করা হয়।
গণনার জন্য জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ছিলেন জেলা প্রশাসনের তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও আনসার সদস্য, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং জেলা জুয়েলারি সমিতির ১০ জন অভিজ্ঞ স্বর্ণকার। তারাই প্রতিটি অলংকারের ওজন নির্ধারণ, ক্যারেট যাচাই এবং বৈদেশিক মুদ্রা গণনার কাজ করেন।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, গণনা শেষে সোনা রুপার বাজারমূল্য নির্ধারণ করে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকের মাধ্যমে ভাঙানো হবে। প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ মসজিদের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে।
পাগলা মসজিদের ইতিহাস ও নামকরণের রহস্য
পাগলা মসজিদের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো। স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও প্রবীণদের মতে, কিশোরগঞ্জ শহরের হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে একজন আধ্যাত্মিক পাগলবেশী ব্যক্তি বসবাস করতেন। তার নাম ছিল জিল্লুর রহমান। স্থানীয়রা তাকে পাগলা বলে ডাকতেন। তিনি নদীর তীরে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তার নাম অনুসারেই এর নাম হয় পাগলা মসজিদ।
আরেকটি জনশ্রুতি আছে, এই মসজিদে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়, তাই মানুষ পাগলের মতো ছুটে আসে বলেই এর নাম পাগলা মসজিদ। কারণ যাই হোক, বর্তমানে এই মসজিদ শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক আবেগের নাম।
প্রথমে মসজিদটি ছিল টিনের ঘর ও মাটির দেয়ালের। পরে স্থানীয়দের দানে এবং দানবাক্সের টাকায় এটি তিনতলা বিশিষ্ট আধুনিক স্থাপত্যে রূপ নেয়। বর্তমানে এর সৌন্দর্য ও পরিসর বাড়ানোর জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১৫ কোটি টাকা। এই কমপ্লেক্সে একসঙ্গে ৬ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারবেন।
কেন মানুষ পাগলা মসজিদে এত দান করেন
পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা হয় সাধারণত প্রতি তিন থেকে চার মাস পর পর। প্রতিবারই সেখানে কোটি কোটি টাকা পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মাত্র চার মাসে দানবাক্সে ৩২ কোটি টাকার বেশি নগদ টাকা পাওয়া গিয়েছিল, যা ছিল একটি রেকর্ড।
মানুষের এই দানের পেছনে রয়েছে গভীর বিশ্বাস। অনেকের মতে, এখানে দান করলে বা মানত করলে মনের ইচ্ছা পূরণ হয়। কেউ সন্তান লাভের আশায়, কেউ ব্যবসায় উন্নতির আশায়, কেউ রোগমুক্তির আশায় এখানে দান করেন। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষ এখানে আসেন। এটি একটি অসাম্প্রদায়িক বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এছাড়া মসজিদটি নরসুন্দা নদীর তীরে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত হওয়ায় এটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবেও জনপ্রিয়। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন এবং দান করে যান।
দানের টাকা কোথায় যায়, কীভাবে ব্যয় হয়
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এই বিপুল পরিমাণ দানের টাকা কোথায় যায়। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পাগলা মসজিদ পরিচালিত হয় জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে। দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ রূপালী ব্যাংকে মসজিদের হিসাবে জমা রাখা হয়।
এই অর্থ থেকে মসজিদের দৈনন্দিন খরচ, উন্নয়ন কাজ, ইমাম মুয়াজ্জিনদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদি পরিচালিত হয়। এছাড়া এই তহবিল থেকে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, গরিব শিক্ষার্থীদের সহায়তা, অসহায় রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা এবং জেলার বিভিন্ন ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে অনুদান দেওয়া হয়।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পাগলা মসজিদের তহবিল থেকে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত গরিব রোগীদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুদান এবং শীতার্তদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। ফলে এই দান শুধু একটি মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো জেলার মানুষের কল্যাণে কাজে লাগছে।
অতীতের নজির ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে সোনা রুপা পাওয়া নতুন ঘটনা নয়। এর আগেও বহুবার বিপুল পরিমাণ সোনা রুপা পাওয়া গেছে। তবে এবারের মতো ছয় বছর ধরে জমিয়ে রাখার পর একসঙ্গে প্রায় ২৫ কেজি সোনা রুপা গণনার ঘটনা বিরল।
এর আগে ২০২০ সালে যখন নিলাম হয়েছিল, তখন সোনার ভরি ছিল প্রায় ৬০ হাজার টাকা। এখন সোনার দাম প্রায় দ্বিগুণ। ফলে এবারের ১০৪৪ ভরি সোনার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানিয়েছেন, এবারের স্বর্ণালংকার ও রুপা এবং বৈদেশিক মুদ্রা গণনা শেষে সেগুলোর বাজারমূল্য নির্ধারণ করে নিলামে বিক্রি করা হবে। নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ এবং আগের জমা থাকা নগদ অর্থ দিয়ে পাগলা মসজিদকে একটি আধুনিক ইসলামিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বাস যখন শক্তিতে পরিণত হয়
পাগলা মসজিদের দানসিন্দুকের গল্প আসলে বাংলাদেশের মানুষের উদারতা ও বিশ্বাসের গল্প। প্রায় ২৪ কেজি সোনা রুপা এবং ১৭ দেশের মুদ্রা প্রমাণ করে যে ধর্ম, বর্ণ, দেশের সীমানা পেরিয়ে মানুষের বিশ্বাস একই সুতোয় গাঁথা।
এই মসজিদে দান করা প্রতিটি টাকা, প্রতিটি গহনা একটি প্রার্থনার প্রতীক। কেউ হয়তো তার শেষ সম্বলটুকু দান করে গেছেন সন্তানের সুস্থতার জন্য। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করে জেলা প্রশাসন যদি এই অর্থ সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণে ব্যয় করে, তাহলে পাগলা মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়, মানবতার সেবার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।